সাম্প্রতিক পোস্ট

এই শহরে আমরা শরণার্থী

রাজশাহী থেকে অমিত সরকরা
জায়েদা দেওয়া (৭০+) রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাট ডাঙ্গড় গ্রামে বৈবাহিক সূত্রে খাস জমিতে বসবাস ছিলো। স্বামী এলাকায় কৃষি শ্রমিকের কাজ এবং জাহেদা অন্যর বাড়িতে কাজ করে সংসারের খাবার জোগান দিতেন। ছেলে মেয়ে হওয়ার পর সংসারে ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়েনি। তাই আজ থেকে ২০ বছর আগে জাহেদা দেওয়ার স্বামী শহরে চলে আসেন রিকসা চালিয়ে সংসারের খরচ যোগানের জন্য। এরপর জায়েদা দেওয়া তার স্বামী ও মেয়ের বসবাস শুরু হয় রাজশাহীর নামোভদ্রা বস্তিতে। জাহেদা দেওয়ার এখন স্বামী নেই এলাকার প্লাষ্টিক কুড়িয়ে খাবার যোগান হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে জন্ম মোঃ মিলনের। মিলনের বাবা মানুষের জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে পরিবারের খাবার যোগান দিতেন। মিলনের বাবা মারা গেলে মিলন ও তার ভাই দুজন মিলে জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষাবাদ করে জীবিকা র্নিবাহ করতেন। দিনকে দিন এলাকার পানি সংকট ও ধান বা মাঠ ফসল উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও নানামূখী সংকটের কারণে জমির মালিক তার জমিতে পেয়ারা বাগান করার সিদান্ত নেন ফলে মিলনের কাজ হারিয়ে যায়। আজ থেকে ৫ বছর আগে মিলন তার পরিবার নিয়ে রাজশাহী শহরের স্টেশন পাড়া বস্তিতে এসে উঠেন। মিলন এখন রিকসা চালিয়ে সংসার চালান।

এছাড়া কাঞ্চন খাতুন (৭০+) গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থেকে,মোঃ কাছের উদ্দিন (৭৫+) মোঃ মাহান (৮৫),মোঃ ওবাইদুল (৬৫+) এরা সবাই নীলফামারী জেলা থেকে রাজশাহীর নামো ভদ্রা বস্তীতে বসবাস শুরু করেন অজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে। তাঁরা সবাই ছিলেন এলাকার কৃষি শ্রমিক। বছরের প্রায় ছয় মাস বন্যার কারণে এলাকায় কাজ থাকতোনা। তাই জীবিকার টানে সবাই আজ রাজশাহীর নামো ভদ্রা বস্তিতে। কেউ প্লাস্টিক কুড়িয়ে বা কেউ রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৩০ বছর ধরে। নামো ভদ্রা বস্তিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আশা প্রায় ২০০ পরিবার বসবাস করেন। বর্তমানে তারা সবাই রাজশাহীর ভোটার কিন্তু একটি পরিবারেও নেই সরকারের বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড নেই, বিদ্যুৎ এর আলো নেই সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।


২০০০ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ৫৫/৭৬ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী জুন মাসের ২০ তারিখ বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। এখানে উল্লেখ্য ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর নানান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে শরণার্থীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু তখন পর্যন্ত শরণার্থী বলতে কি বুঝায়,শরণার্থী কারা, তাদের অধিকার কি কি এবং তাদের আশ্রয় প্রদানকারী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি এবং নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব কর্তব্য কি হবে তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত আন্তর্জাতিক কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা বা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য কোনও সনদ ছিল না। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের অধিবেশনে জাতিসংঘের একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হিসেবে Office of the United Nations  High Commissioner for Refugees (UNHCR) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী the UN Refugee Agency হিসেবে পরিচিত। এ UNHCR এর কার্যক্রমকে একটি আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের আওতায় আনার জন্য ১৯৫১ সালে একটি আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন (১৯৫১ Convention relating to the Status of Refugees) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের শরণার্থী সনদ হিসেবে পরিচিত। এ সনদের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০০ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আরেক অধিবেশনে পরের বছর থেকে অর্থাৎ ২০০১ সাল থেকে জুন মাসের ২০ তারিখ বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাবস্থায় ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন জাতিসত্তা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্ম ,এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি পৃথিবীর দেশে দেশে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং ক্রমবর্ধমান হারে অপশ্চিমা দেশগুলোর পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। ফলে শরণার্থী সমস্যা একটি অন্যতম আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে হালের পৃথিবীতে হাজির হয়েছে।

এতো গেলো এক দেশ থেকে আরেক দেশে বাসস্থান হারা মানুষের আশ্রয়নের কথা। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর বিলাসিতা, উন্নয়নের নামে পরিবেশের উপর অবাদ হস্তক্ষেপের ফলে জলবায়ুর অসাভাবিক পরিবর্তনের ফলে অউন্নয়ন নি¤œ আয় ও ঘনবসতির দেশ গুলোর গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষগুলো সব থেকে বেশি ক্ষতির সম্মখিন হচ্ছে। জলবায়ু পরির্বতনের ফলে অনাবাদী জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে মাঠ ফসল চাষাবাদে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে চাষাবাদে পরিবর্তন হওয়া, অতি বন্যা, অতি খরা, সামাজিক ও পারিপার্শিক বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়াসহ নানামুখি সমস্যা সৃষ্টির ফলে গ্রামিণ প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের কর্মসংস্থান ও বাসস্থান হারিয়ে জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেরে শহরে এসে বাসস্থান তৈরি করছেন।


জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের এক দিকে হিমালয় পর্বত আর অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর হওয়ার কারণে একদিকে হিমালয় পর্বতের বরফ গলে বন্যা হচ্ছে অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণ পানি এসে ফসল ও বাসস্থানের ক্ষতি করছে ব্যাপকভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক মানুষ তাদের কর্মসংস্থান ও বাসস্থান হারিয়ে এলাকা স্থানান্তরিত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি, শীতকাল কমে যাওয়া অতিরিক্ত কোয়াশা,অসময়ে কোয়াশা পানির অভাব সহ নানা ধরনের দূর্যোগ বেরে যাওয়ায় এই অঞ্চলে অনাবাদী জমির পরিমাণ দিনকে দিন বাড়ছে। মানুষ মাঠ ফসল চাষাবাদে আর্থিক ক্ষতির সম্মুক্ষিন হওয়ার কারণে এখন বিভিন্ন ফলের বাগান তৈরি করছেন। এর ফলে চাষাবাদের সাথে যুক্ত মানুষগুলো তাদের কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। ইনকাম সোর্স কমে যাচ্ছে। এছাড়াও সামাজিক ও রাজতৈকি সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষ তাদের জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকে চলে আসছেন। পরিবর্তন ঘটছে তাদের ঠিকানা ও পেশার। অনেকেই জীবিকার টানে পাড়ি দিচ্ছেন দূর দূরান্তের দেশে। বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরির্বতনের ফলে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তÍ হওয়া মানুষগুলো আজ রাজশাহী শহরের কোন না কোন বস্তির বাসিন্দা। আবার অনেকেই বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়ে প্রবাস জীবন যাপন করছেন। শহরের বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট ঘরে অনেক মানুষের বসবাস তাদের পানি বিদ্যুৎ,পয়োঃনিষ্কাশন সুযোগ সুবিধা কম। এবং অতন্ত ঘন বসতির ফলে জায়গা, পানিসহ নানা বিষয় নিয়ে একে অপরের সাথে নানা ধরনের দন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। নিজ দেশেই এই মানুষগুলো বঞ্চিত মৌলিক অধিকার থেকে।

সুতরাং আজ আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে এসব অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের একটা মানুষের মতো জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার। রাষ্ট এই মানুষগুলোর জন্য কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন বা জাতিসংঘ এই মানুষগুলোকে উদ্ভাস্তু বা অভ্যন্তরীন শরণার্থী হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে কিনা? বা আন্তর্জাতিক সুনিদিষ্ট কোন আইন বা নীতিমালা আছে কিনা না থাকলে তা তৈরি ও প্রকাশ করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘বস্তি শুমারি ও ভাসমান লোক গণনা -২০১৪’ শীর্ষক শুমারী থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুসারে দেশে মোট ২২ লাখ বস্তিবাসীর বসবাস। প্রধানত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান হারানো প্রাকৃতিক দূর্যোগে বাসস্থান ধ্বংস ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বৃদ্ধির ফলে লাখ লাখ কর্মহীন মানুষ বেঁচে থাকার অবলম্বনের আশায় মেট্রোপলিটন সিটিগুলোতে এসে বস্তিতে বা ভাসমান ছিন্নমূল মানুষ হিসেবে ফুটপাত বা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে বা নিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন সীমাবদ্ধ থাকে সংবাদপত্রে নিউজ বা টিভি মিডিয়ায় এক দেড় মিনিট এর নিউজে সীমাবদ্ধ। আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু সমস্যায় বাসস্থান হারা মানুষগুলোর সমস্যা নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা পৌছে দেওয়া যেত। বস্তিবাসীর বর্তমান অবস্থা তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার কী কী ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ মানুষ কিভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এর জন্য দায়ী জলবায়ুর মাত্রাতিরিক্ত পরিবর্তন তা বাংলাদেশ বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: