সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রকৃতি রক্ষায় যুব সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র প্রয়াস

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি আজ সারা বিশ্বে অন্যতম আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সারা দুনিয়া আজ মহা সংকটে। স্থানীয় এলাকার কৃষক-কৃষাণী, সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ সকল মানুষের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন হলো আবহাওয়ার উল্টাপাল্টা আচরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে কৃষি পরিবেশ, প্রতিবেশ, কৃষি ব্যবস্থাপনা, জীবন-জীবিকা, প্রাণবৈচিত্র্য আজ বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মানুষসহ সকল প্রাণীর রোগবালাই দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে প্রাণবৈচিত্র্যও দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে বা অভিযোজন করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তাই নেত্রকোনা অঞ্চলের বিভিন্ন যুব, কিশোর-কিশোরী ও কৃষক সংগঠন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ব্যক্তি বৃক্ষ রোপণ, বৈচিত্র্যময় বৃক্ষের চারা বিতরণসহ বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এসব জনসংগঠনগুলো স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে এবং নিজস্ব অর্থায়নে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে অভিযোজনের চেষ্টা করছে।

নেত্রকোনা অঞ্চলের সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের বালুয়াকান্দা ও দরুনবালি গ্রামের এমনই তিনটি যুব ও কিশোরী সংগঠন রক্তের বন্ধন যুব, অক্সিজেন যুব ও ফুল-পাখি কিশোরী সংগঠন। ‘রক্তের বন্ধর’ যুব সংগঠনের মোট সদস্য সংখ্যা ২০ জন এবং সদস্যদের প্রায় সকলেই শিক্ষার্থী। সংগঠনের বেশ ক’জন সদস্য প্রবাসী। এসব প্রবাসী সদস্যরা এলাকার উন্নয়নে সংগঠনটির গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে অক্সিজেন যুব ও ফুল-পাখি কিশোরী সংগঠনের সকল সদস্যই শিক্ষার্থী। এলাকা পরিবেশ সুরক্ষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণাসহ সংগঠনগুলো সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে। সংগঠনের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে ছোট ছোট সহযোগিতা দিয়ে অন্যদেরকে এলাকার উন্নয়নে ও সমাজের উন্নয়নে উদ্ধুদ্ধ করে আসছে। সংগঠনের সকল সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের সাথে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সহযোগি মনোভাব, যতœশীলতার মতো গুণাবলী গড়ে ওঠে। কাইলাটি ইউনিয়নের প্রায় সকল গ্রামে বৈচিত্র্যময় ফলদ গাছের সংখ্যা বিভিন্ন কারণে দিন দিন কমে যা্েছ। ফলে এলাকার শিশুসহ কিশোর-কিশোরী, যুব, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধি জনগোষ্ঠী পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা বাজার থেকে বৈচিত্র্যময় ফল কিনে খেয়ে শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু শহরাঞ্চলের ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী মূলত স্থানিয় ফলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাজারে দেশিয় ফলের যোগান কম থাকায় জনগোষ্ঠীকে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত ফলের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর এসব আমদানীকৃত ফল বেশি দিন সংরক্ষণের জন্য ও আগাম পাঁকানোর জন্য রাসায়নিক পদার্থ কার্বাইড ব্যবহার করায় সেগুলো জনস্বাস্থ্য তথা প্র্াণী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দেশীয় ফলের যোগান কম ও মূল্য বেশি হওয়ায় দেশিয় ফলের প্রতি সাধারণের আগ্রহও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামে ঔষধি গাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় স্থানীয় চর্চাগুলো কমে যাচ্ছে। গ্রামের লোকেরা নিরুপায় হয়ে সাধারণ রোগবালাই থেকে রক্ষায় বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা একদিকে ব্যায়বহুল, অন্যদিকে মানহীন ঔষধ কিনে সাধারণ জনগোষ্ঠী প্রতারিত হচ্ছে। এসকল বিষয় উঠে আসে কাইলাটি ইউনিয়নের মৌজেবালি দাখিল মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিষয়ভিত্তিক বৃক্ততামালায় আলোচকদের আলোচনায়।
বক্তৃতামালায় আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন উক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক, কৃষক সম্পদ ব্যক্তিসহ বারসিক ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধি। এলাকায় বৈচিত্র্যময় ফলের গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ‘রক্তের বন্ধন যুব সংগঠন, অক্সিজেন যুব সংগঠন ও ফুল-পাখি কিশোরী সংগঠনের সদস্যরা এলাকার সকল বাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, বাজারের পতিত জায়গা, গোরস্থান ও রাস্তার ধারে বৈচিত্র্যময় ঔষধী উদ্ভিদ, ফলদ ও কাঠ জাতীয় গাছের চারা রোপণের করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংগঠনগুলো তাদের গৃহীত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে বৈচিত্র্যময় গাছের চারা সহযোগিতার জন্য তাই বারসিক’র এবং মাদ্রসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও অধ্যক্ষ আব্দুল কাদির এর সাথে সাথে যোগাযোগ করে। তিনটি সংগঠনের সদস্যরা প্রত্যেকে ১০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে এবং বারসিক’র সহায়তায় মোট ৮০টি চারা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে এলাকার সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বসতভিটায় রোপণের জন্য ৩২টি চারা বিতরণ করে এবং মাদ্রাসার ক্যাম্পাসে ৪৮টি চারা রোপণ করে। মাদ্রাসার পক্ষ থেকে গাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপকরণ (বাঁশ ও সূতা) সহযোগিতা দেওয়া হয়। এলাকার পরিবেশ ও সমাজের উন্নয়নে যুব ও কিশোরী সংগঠনের এ ধরণের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে এলাকার ভবিষ্যত প্রজন্ম যেমন প্রকৃতির সাথে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে, তেমনি তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং পাখিসহ প্রাণের খাদ্য ও বাসস্থানের সংস্থান হবে। অন্যদিকে গ্রামের জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে ভেষজ উদ্ভিদ সহজলভ্য হবে।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বক্তৃতামালায় মৌজেবালি দাখিল মাদ্রাসা’র শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সকলকে সবুজের কাছাকাছি থাকতে হবে। এলাকার সকল শিশুদেরকেও প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। আর এজন্য আমাদের সকলকে বেশি বেশি করে বৈচিত্র্যময় গাছ (ফলজ, ঔষধি ও বনজ) রোপণ করতে হবে।’ তিনি বক্তৃতামালায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সাথে এলাকায় কুড়িয়ে পাওয়া বা প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি এসব খাদ্য উদ্ভিদের গুণাগুণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, আমাদের সকলকে নিজ দেশকে, দেশের প্রকৃতিকে ভালোবাসতে ও চিনতে হবে। মানুষ প্রকৃতি থেকে যত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তত বেশি নিজেরা বিপদাপন্ন হয়ে পড়ছে এবং প্রকৃতিকেও বিপন্ন করে তুলছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার প্রাকৃতিক জগতকে ভালোবাসতে, রক্ষা করতে, প্রকৃতির সাথে মানুষের পারস্পারিক ও আন্তঃনির্ভরশীলতা বিষয়টি বোঝাতে হবে, তবেই তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি প্রেম ও ভালোবাসা জাগবে। তারাও প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে এগিয়ে আসবে এবং প্রকৃতির সকল উপাদান সুরক্ষিত হবে। মানুষসহ সকল প্রাণের জন্য পৃথিবী হবে নিরাপদ।
বক্তৃতামালা অনুষ্ঠানের মূল আলোচক হিসেবে কৃষক আবুল কালাম তার আলোচনায় শিক্ষার্থীদেরকে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা, গাছের সাথে মানুষের, পাখির ও অন্যান্য প্রাণীদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আন্তঃনির্ভরশীলতার বিষয়টি তুলে ধরে নিজ নিজ বাড়ি ও এলাকার পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষ রোপনেণ উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি সকল ধরণের প্রাণী, পাখি, ফুল ও ফলের গাছ লাগানোর জন্য শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন। তিনি বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২২ এর প্রতিপাদ্য বিষয়ের সাথে সূর মিলিয়ে বলেন, ‘প্রকৃতি বাঁচলে আমরাও বাঁচবো, আসুন আমরা প্রকৃতি প্রেমী মানুষ’র মতো করে প্রকৃতিকে বাঁচাই, আমরাও বাঁচি।’


রক্তের বন্ধন যুব সংগঠনের প্রতিনিধি মোঃ ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে প্রতিবছর গাছ লাগাতে হবে। একটা গাছ কাটলে আমরা ৪টি করে গাছ লাগাবো। গাছ আমাদের প্রকৃত বন্ধু। তিনি অংশগ্রহণকারী নবম শ্রেণীতে ৪০ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরকে পরিবেশ সুরক্ষায় শপথ বাক্য পাঠ করান। অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থী ‘আমরা সকলে গাছ লাগাবো, নিজ নিজ এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সুন্দর রাখব’ বলে শপথ গ্রহণ করে।
বক্তৃমালা শেষে যুব ও কিশোরী সংগঠনের সদস্যরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে মাদ্রাসার ক্যাম্পাসে ৪৮টি ঔষধি ও ফলের চারা (নিম-২০ ও কাঁঠাল-২৮) রোপণ করেন এবং এলাকায় রোপণের জন্য সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩২টি ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করে।
আমরা মানুষরা কথায় কথায় শুধু নিজেদের ধৈর্য্যরে কথা বলি, কিন্তু কখনো প্রকৃতির ধৈর্য্যরে কথা ভাবিনা। প্রকৃতিরও যে ধৈর্য্য আছে এবং একসময় প্রকৃতির ধৈর্য্যের বাঁধও ভেঙ্গে যেতে পারে, প্রকৃতিও যে কোন একসময় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে সে বিষয়টি কখনো আমরা আমলে নিইনা। তাই প্রকৃতিকে প্রাকৃতিক রেখে আসুন আমরা সবাই মিলে ঔষধি, ফলদ, বনজ গাছ লাগাই ও পরিবেশ বাঁচাই। তবে অবশ্যই গাছ রোপণের সময় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, যে গাছটি আমি বা আমরা রোপণ করছি সেগুলো পরিবেশবান্ধব নাকি আগ্রাসি, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় কতটুকু সহায়ক। আগ্রাসি হলে অবশ্যই আমরা সেগুলোকে পরিহার বা বর্জন করবো। গাছ রোপণের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার দিব স্থানীয় জাতগুলোকে। কারণ স্থানীয় জাতের গাছগুলো জন্য তেমন যতœ ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয়না। স্থানীয় জাতের গাছগুলোর অনেক ডালপালা ও পাতা থাকায় পরিবেশের জন্য উপকারী এবং বিভিন্ন প্রাণীর জন্য নিরাপদ আবাসস্থল। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এসব স্থানীয় জাতের গাছপালা যেমন সংরক্ষিত হবে তেমনি আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতিও সুরক্ষিত হবে। সাফল্য পাবে যুব, কিশোরী ও শিক্ষার্থীদের গৃহীত উদ্যোগ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: