সাম্প্রতিক পোস্ট

ঘূর্ণিঝড় ফণি এবং আমাদের প্রস্তুতি ও আশঙ্কা

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

আমার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ৯নং বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দূর্গাবাটি গ্রাম। এই গ্রামে আমার জন্ম। গ্রামটি খোলপেটুয়া নদীর পাশে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেড় মিনিটে রাস্তা ওঠা যায়। আর এ ওয়াপদা রাস্তার ওপাশে নদী। আমাদের ইউনিয়নটি শ্যামনগর যে ১২টি ইউনিয়ন আছে তার মধ্যে খুবই দুর্যোগপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের গ্রামটিতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আমার বয়স এখন ৩৪ বছর ৫ মাস। আর সেই ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি নদীর পাশ দিয়ে বড় বড় চর এবং সে চরে অনেক বড় বড় বন ছিলো, যে বনে ছিল বিভিন্ন ধরনের সুন্দরবনের গাছ গাছালি। যতই দিন যাচ্ছে ততই নদী ভাঙতেই আছে। চর কমতে শুরু করেছে বনায়ন প্রায় শেষ পথে। যে চরে আমরা নেমে প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট হেটে তারপরে নৌকায় উঠতে হতো। সে চরে এখন নামতে ২ মিনিট সময় লাগে।

pic-1
বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দূর্যোগের কারণে আমাদের এ পরিণতি। আমার চোখের সামনে নদী ভাঙনে আমাদের এখানকার মানুষের হাজার হাজার বিঘা জমি নদীর মধ্যে চলে গেছে। তারপরও আমরা ও আমাদের এলাকার মানুষ এখানে বসবাস করি। আমার পরিবারসহ আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অধিকাংশ এই নদীর পাশে তাদের বসবাস। আমার চোখের সামনে ১৯৮৮ সালের ঝড় দেখেছি, তারপর ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে দেখেছি সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু ও মোরাকে। এছাড়াও দেখেছি বিভিন্ন সময়ের কালবৈশাখী ঝড় এবং বর্ষাকালে নদীতে প্রবল জোয়ার ও ঢেউ। যাতে নদী ভাঙন হয়ে আমাদের এলাকা প্লাবিত হতো। আমাদের ইউনিয়ন বা আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুসের প্রধান পেশা হলো মাছ চাষ। ধনী, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র সকল পরিবারে নদী থেকে লবণ পানি উঠিয়ে চিংড়ি চাষ করেন এবং নদীতে রেণু পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। যখন কোন বন্যা বা নদী ভাঙন হয়ে প্লাবিত হয় তখন সব চিংড়ি ঘেরগুলো একাকার হয়ে যায়। প্রতিনিয়িত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা করে আমরা এখানে টিকে আছি।

বিগত দিনের ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের কথা স্মরণ করলে ১৯৮৮ সালের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর উপকূলীয় এলাকায় খুলনা ও বরিশালে আঘাত হানে। সাতক্ষীরা জেলায় তেমন কোন ক্ষয় ক্ষতি হয়নি ফলে সে সম্পর্কে ধারণাও কম আমার। এরপর ২০০৯ সালে ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা যার অধিকাংশটায় আমাদের সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এটা আমার মনের কোনে সারাজীবনের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আইলার সময় কিন্তু তেমন কোন সংকেত আমরা পাইনি বা যেটুকু পেযেছিলাম সেটাকে কোন গুরুত্ব দিইনি। যে এরকম তো সব সময় হয় রাস্তা ভেঙে যায়। পানি উঠে ঘের ভেড়িবাঁধ সব ডুবে যায় আবার কিছুদিনের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ হয়। সব কিছু ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আইলায় যে পানি প্রবেশ করেছে এবং জোয়ারের যে উচ্চতা সকালে হালকা হালকা বৃষ্টি নামতে দেখি তা আজও ভুলতে পারিনি।

pic-2
সে সময় দেখেছি যতই বেলা বাড়তে থাকে ততই যেন নদীতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একপর্যায়ে ভেড়িবাঁধের যে স্থানগুলো দূর্বল ছিল সে স্থানগুলো ভাঙতে শুরু করে এবং গ্রামের মধ্যে বসতভিটায়র আঙিনাসহ বসত ঘরে পানি উঠতে থাকে। আমি তখন বারসিকে কাজ করি। আইলায় দু’এক জায়গায় রাস্তা ভাঙার খবর পেয়ে বাড়িতে ফোন দিই মাকে এবং গ্রামে আরো কয়েকজনকে। যে রাস্তাগুলো ঝুকিপূর্ণ এবং দুর্বল ছিলো সেসব জায়গায় কাজ করতে শুরু করি। কিছুক্ষণ পরে মায়ের ফোন পাই। মা কান্নাকাটি করছে আর বলছে বাবা আমাদের যা কিছু ছিল ঘরবাড়ি সব চোখের সামনে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তো আর কিছু থাকলো না। মাকে বললাম আগে তোমরা নিরাপদে থাকো। যা যাচ্ছে জীবনে বেঁচে থাকলে আবার সবকিছু তৈরি করতে পারবো।
আইলা দিনের বেলায় হওয়াতে মৃত্যুর হার একটু কম হয়েছে। সবাই বেলায় বেলায় অনত্র্য সরে যেতে পেরেছিল। কিন্তু আইলায় আমারসহ আমার এলাকায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো কাঠিয়ে ওঠা যায়নি। শুধু মানুষ না, পশু ও প্রাণীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। পুরো পরিবেশ ছিল হুমকির মুখে। আইলা পর থেকে এখনো শ্যামনগরে ভাড়া বাসায় থাকি। গ্রামের বাড়িতে ঘর করেছি। সরকারি ও নিজ সহায়তায় সেখানে মাঝে মধ্যে যাই। বাবা-মা সেখানে থাকে। এরপর বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ হয়েই চলেছে যেমন ২০১৩ সালে ১৬ই মে মহাসেন, ২০১৫ সালে ৩০ জুলাই কোমেন, ২০১৬ সালে ২১ মে রোয়ানু এবং ২০১৭ সালে ৩০ মে মোরা ঘূর্ণিঝড়। আর এ সব ঘূর্ণিঝড়ে সরকারি ও বেসরকারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ ও সর্তকতা মেনে চলেন এবং বিভিন্ন ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। একই ভাবে বর্তমান সময়ের আলোচিত বিষয় ঘূর্ণিঝড় ফণী। সপ্তাহব্যাপী আলোচিত এ ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে গত ২ মে থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে আসছে। পূর্বাভাসে বলা হয়, ৩ মে রোজ শুক্রবার দুপুর নাগাদ ভারতের উপকূলে আঘাত হেনে অতিক্রম করতে পারে এ ঘূর্ণিঝড় এবং তা শুক্রবার সন্ধ্যার দিক বাংলাদেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চল খুলনাসহ তৎসংলগ্ন এলাকায় আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। উপকুলীয় এলাকায় আগে আঘাত হানবে যার ঝলোচ্ছাসের উচ্চতা হবে ৫-৬ ফুট উচ্চতায়। যা গত ৪৩ বছরের সব থেকে বড় ধরনরে ঘূর্র্ণিঝড় বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।

এতথ্য পাওয়ার সাথে সাথে ২ মে, নিজ নিজ পরিজনদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করি এবং সতর্ক থাকার কথা জানাই। সবাইকে বলি যে, আজকালের মধ্যে আমাদের এখানে আইলার থেকে আরো বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হতে পারে। এখন ৭নং বিপদ সংকেত চলছে। তখন অফিসের একটি স্কুল প্রোগ্রামের জন্য মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ধানখালী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে অফিসের অন্য সহকারীদের সাথে ছিলাম। মনস্থির করলাম যে, প্রোগ্রামটি শেষ হলে নিজ গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ অফিসের সহকর্মী বাবলু জোয়ারদার জানান যে, ঢাকা অফিস থেকে পাভেল পার্থদা মেইল করেছে এবং ফোন করেছে ৩-৫ তারিখ পর্যন্ত আমাদের সকলের ছুটি বাতিল। অফিসে দ্রুত বসতে হবে এবং ঘূর্নিঝড় ফণী বিষয়ে অফিস স্টাফ ও যুব টিমেরা মিলে কি উদ্যোগ নেওয়া যায় সে বিষয়ে জরুরী সভা করতে হবে। এরপর বাড়িতে বাবাকে ফোন দিই যে, মাসহ অন্য কেউ যদি আসতে চায় তাদের নিয়ে শ্যামনগরে বাসায় আসতে বলি। পাতাখালী বোনের বাড়িতেও ফোন দিই। তাদেরকেও জানাই শ্যামনগরে আসার জন্য।

pic-3
বাবা ও বোন জানান যে, তাদের ওইখানে কেই কোথাও যায়নি তাই তারাও কোথাও যাবে না। গ্রামেই থাকবে। আমি তাদের বলি, ‘তোমরা বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে থাকো।’ তাদের শুনে মনে হলো তারা অবস্থান করছেন একেবারে নদীর গায়ে। আছে ভাঙনের মধ্যে অথচ তারা ভয় পায়নি। এরপর ২ মে বিকাল থেকে বাড়িতে ও এলাকার মানুষের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ রাখি এবং অফিসের সহকর্মী, যুব টিম ও জনসংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে যাই এবং মোবাইলের যোগাযোগের মাধমে মানুষকে তথ্য দিয়ে সজাগ রাখার চেষ্টা করেছি। সবসময় মনের মধ্যে এমন হচ্ছিল যে, বড় কোন দুর্ঘনা যেন না ঘটে। ঈশ্¦রের কি কৃপা শুধুমাত্র হালকা বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় ফনী আমাদের এলাকা থেকে বিদায় নিলো। সব মিলিয়ে উপকূলীয় এলাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলাকার যুব সমাজসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের আন্তরিকতা ও নিবিড় যোগাযোগ ও স্বতঃস্ফুর্ত সর্তকতা ও পূর্ব পরিকল্পনা ছিল খুবই ভালো। রাতারাতি অনেক পরিবারকে সাইক্লোন সেল্টার আশ্রয়সহ তাদের থাকা ও খাবার বন্দোবস্ত করতে সক্ষম ছিলাম আমরা। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রস্তুতি এবং আগাম পূর্বাভাসের কারণে আইলার মতো এত ক্ষতির সন্মূখীন হয়নি গ্রামের মানুষ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: