একটি চুলা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমাতে অবদান রাখছে

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে শহিদুল ইসলাম

ভূমিকা
লাল গেরুয়া রঙ্গের মাটি আর উঁচু-নীচু ঢেউ খেলানো মাঠসহ বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলটি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এই বরেন্দ্র অঞ্চল খ্যাত রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও শ্রেষ্ঠ উপজেলা পর্যায়ে জয়িতা মোসাঃ কবুলজান (৫০)। তিনি লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত। স্বামী একজন কৃষক, তাঁর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। কবুলজান লোকায়ত জ্ঞান ব্যবহার করে মাটি দিয়ে উন্নত চুলা আবিষ্কার করেছেন। তিনি গ্রাম কিংবা শহরের মানুষের পরিবারের উপযোগিতা, ঘরের আয়তন এবং সকল ধরনের চাহিদা বিবেচনায় মাটির তৈরি উন্নত পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করেন। জ¦ালানি ও আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী এই মাটির চুলা তিনি নিজের উদ্ভাবনী জ্ঞান দিয়ে তৈরি করেছেন। এখনো তিনি সময়কাল, পরিস্থিতি ও উপযোগিতা বিবেচনায় প্রয়োজনমতো এই চুলার রুপান্তর ও উন্নয়ন করেই চলেছেন। যার ফলে এই চুলার কদর গ্রাম থেকে গ্রামে সম্প্রসারিত হয়েছে। এমনকি শহরের প্রান্তিক মানুষগুলো তাঁর এই অধিক জ¦ালানি সাশ্রয়ী ধোঁয়ামুক্ত চুলা ব্যবহার করছেন। তিনি এই চুলার নাম দিয়েছেন “পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা”।

শুরুর কথা
কবুলজান বেগম বলেন, ‘রান্না করতে চোখে ধোঁয়া লাগে, ঘরের চালা নষ্টসহ পরিবারের সকলের ধোঁয়ার কারণে শ^াসকষ্ট এবং নানা রোগবালাই লেগেই থাকতো। আবার অনেক পরিমাণে লাকড়ি (জ¦ালানি) লাগতো।” ধোঁয়াবিহীন চুলার সন্ধান এবং এই সমস্যার সমাধানে তিনি প্রথমে পরীক্ষামূলক মাটি দিয়ে একটি চুলা তৈরি করেন, যার একটি ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া উপরের দিকে তুলে দেয়া হয়। একটি পাইপের মাধ্যমে এই কালো ধোঁয়া উপরে উঠে, যার প্রান্তে থাকে একটি ক্যাপ। এই ক্যাপের মধ্যে ধোঁয়ার কালো আবরণ (কার্বন) গুলো আটকে যায়। এভাবে তিনি ধীরে নিজের বাড়িতে চুলাটির উন্নয়নকাজে মনোযোগ দেন। একসময় চুলাটি ভালো ফলাফল দিতে শুরু করে। জ¦ালানিও কম লাগে আবার কালো ধোঁয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তিনি এই কাজ প্রথম শুরু করেন ২০১৩ সালে। এভাবে তাঁর বাড়িতে এমন একটি চুলার ব্যবহার দেখে গ্রামের নারী ও পুরুষ অনেকে এই চুলার তৈরির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রথমদিকে তাঁর নিজের গ্রাম হরিদেবপুরের মধ্যে এই চুলার ব্যবহার বেড়ে যায়। কবুলজান বেগম বলেন, ‘সেসময় বন্ধুচুলা নামে একটি চুলা বিক্রি হতো অধিক দামে। কিন্তু গ্রামের মানুষের আর্থিক অভাবের কারণে সেই চুলা ক্রয়ক্ষমতা ছিলোনা।’ যার ফলের তিনি খরচবিহীন শুধু মাটি আর বাড়ির ধানের কুড়া তুষ দিয়ে এই চুলা তৈরি করেন। একই সাথে তিনি এই চুলা তৈরির পদ্ধতি গ্রামের নারীদের শেখান, যাতে তাঁরা নিজেরাও তৈরি করতে পারেন।

বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে কবুলজানের উন্নত চুলা
গ্রামের মানুষের রান্না-বান্নার প্রধান মাধ্যম হলো চুলা। মাটির তৈরি নানা ধরনের চুলাতেই তাঁরার রান্নার কাজ করেন। আর জ¦ালানি হিসেবে স্থানীয় উপকরণগুলোই বেশি ব্যবহার করে থাকেন। এসকল চুলার বেশিরভাই মাটির তৈরি অনুনন্নত চুলা। উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ২০১৪ সাল থেকে লোকায়ত জ্ঞানে উন্নত চুলা আবিষ্কারক কবুলজানের উন্নত চুলা বিভিন্ন গ্রামের নারীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সহযোগিতা করে। এর ফলে তাঁর এই উন্নত চুলার ব্যবহার বরেন্দ্র অঞ্চলে দিনে দিনে বেড়েছে। তাঁর কাজটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এ কাজটি গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তানোর উপজেলার ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে আগ্রহী নারীদের নিয়ে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি ও ব্যাবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাগঞ্জসহ আশপাশের জেলার গ্রামগুলোতে। বারসিক এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি প্রশিক্ষণ ও শিখন অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। যার ফলে এখন গ্রামে গ্রামে নারীদের মধ্যে এই জ্ঞান এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একজন থেকে আরেকজন শিখে নিয়ে এই উন্নত চুলার তৈরি ও ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পর্যন্ত রাজশাহী ও চাঁপাইনবাগঞ্জ জেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ১৯০টি গ্রামে এই পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার সম্প্রসারণ হয়েছে এবং ১০ হাজারের বেশি উন্নত চুলা পরিবারগুলো ব্যবহার করছেন।

কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা এখন গ্রাম থেকে শহরে
কবুলজানের জ¦ালানি সাশ্রয়ী ও কম কার্বণ নিঃসরণকারি পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা এখন শুধু গ্রামেই নয়, শহরের প্রান্তিক মানুষগুলোও তাঁদের পরিবারে এই চুলার ব্যবহার করছেন। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনসহ আশপাশের উপজেলার পৌরসভা যেমন পবা, তানোরে এই চুলার সম্প্রসারণ হযেছে। রাজশাহী শহরের বস্তি পর্যায়ে ভূমিহীন প্রান্তিক মানুষগুলো জ¦ালানির প্রধান উপকরণ ঝুট বা কাঠের লাকড়িসহ টায়ার টিউব এমনকি বিভিন্ন ধরনের পরিত্যাক্ত পলিথিন ব্যবহার করে থাকেন। খোলা এবং অনুন্নত চুলাতে এসব জ¦ালানি দিয়ে রান্না করার ফলে দূষিত ধোঁয়ায় তাঁদের রোগবালাই বাড়ে। এমন অবস্থায় কবুলজানের উন্নত চুলার শিখন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলে এই চুলা এখন শহরের মানুষও ব্যবহার করছেন। রাজশাহীর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবারের মধ্যে এই পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার ব্যবহার হচ্ছে। উপযোগিতা এবং সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে দিনে দিনে এই চুলার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে শহরের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে।

শতভাগ উন্নত চুলা ব্যবহারকারি গ্রামে রূপান্তরিত
শুধু কয়েকটি পরিবার নয়, এখন শতভাগ উন্নত চুলা ব্যবহারকারি গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে দু’টি গ্রাম। ধারাবাহিকভাবে উন্নত চুলার সুবিধা পাওয়ায় তা গ্রামের প্রতিটি পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেরা আগ্রহী হয়ে এই চুলা তৈরি করে নিচ্ছেন বা নিজেরা তৈরি করছেন। পরিবেশবান্ধব চুলার উদ্ভাবনকারি কবুলজান বলেন, “ আমার স্বপ্ন এই তানোর উপজেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের সকল গ্রামের সকল পরিবার পরিবশেবান্ধব চুলা ব্যবহার করবেন।” তাঁর এই স্বপ্œের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বারসিক এই ব্যয়সাশ্রয়ী পরিবশেবান্ধব চুলার সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ২০১৮ সালে কবুলজানের নিজের হরিদেবপুর গ্রামটিকে শতভাগ উন্নত চুলা ব্যবহারকারি গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেন। সেসময় হরিদেবপুর গ্রামটিকে কম কার্বণ নিঃসরণকারী, ব্যায় সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা ব্যবহারকারি গ্রাম ঘোষণা করেন তানোর উপজেলার নির্বাহী অফিসার মুহাঃ শওকাত আলী। হরিদেবপুর গ্রামটিতে বর্তমান ৫৭০টি পরিবার প্রায় সকলেই কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা ব্যবহার করেন। অন্যদিকে একই কাজের ধারবাহিকতায় ২০২২ সালে তানোর পৌরসভার ৪৩০টি পরিবার নিয়ে গুবির পাড়া গ্রামটিকে শতভাগ পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা ব্যবহারকারি গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেন বর্তমান তানোর উপজেলার নির্বাহী অফিসার পংকজ চন্দ্র দেবনাথ। বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের এই উন্নত চুলার ব্যবহার দিনে বেড়েই চলেছে।

কবুলজানের উন্নত চুলায় নারীর কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি
কবুলজান নিজে চুলা তৈরি করে দেন এবং অন্যকেও এই চুলা তৈরি করতে শেখান। অনেক সময় তিনি চুলা তৈরি করে দিয়ে সম্মানিও পেয়ে থাকেন। একই সাথে যাদেরকে এই চুলা তৈরি করা শিখিয়েছেন তারাও তাঁদের গ্রামে বা পাশের গ্রামে এই চুলা তৈরি করে দিয়ে আয় করছেন। চুলা তৈরির সম্মানী হিসাবে নিজে আয় ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে চুলা তৈরিতে দক্ষ কারিগর তৈরিতেও সহায়তা করছেন। পর্যবেক্ষণে জানা যায়, নিজে গ্রামে ২জন নারীসহ পাশর্^বতী উপজেলা ও গ্রামগুলো প্রায় ৬ জন নারী এই উন্নত চুলা তৈরি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রভাব
প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং সাক্ষাতকারের মাধ্যমে জানা যায়, কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা ব্যবহার এবং তৈরির কারণে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রাথমিক এক গবেষণায় দেখা যায়, একটি কংক্রিটের উন্নত চুলা কিনতে খরচ পড়ে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা। কিন্তু কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা তৈরিতে কোন ধরনের খরচ পড়েনা বা কম লাগে। এই চুলা তৈরিতে যেসকল উপকরণ ব্যবহার করা হয় তা পরিবারগুলোতেই পাওয়া যায়। মাটি, কাঁদা, ধানের কুড়া-তুষ ব্যবহার করা হয়। যা কিনতে কোন টাকা বা আর্থিক খরচ লাগেনা। একটি কংক্রিটের পাইপ তৈরি বা কিনতে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাগে। আর মাটির ক্যাপ নিজেরা তৈরি করে নিতে পারে বা কিনতে খরচ মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা। চুলা তৈরিতে আর্থিকভাবে কম খরচে এবং স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করার ফলে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে সাশ্রয় হচ্ছে। অন্যদিকে চুলা ব্যবহারকারির তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, একটি সাধারণ ও খোলা-অনুন্নত চুলায় রান্না করার জন্য লাকড়ি (জ¦ালানি) বেশি লাগে। বিপরিতে উন্নত চুলায় একইরকম বা লাকড়ি কম লাগে। তথ্যসংগ্রহের মাধ্যমে জানা যায়, এককেজি চাল রান্না করতে সাধারণ চুলায় ৪ কেজির একটু কম বা বেশি লাকড়ি লাগে, সে তুলনায় পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলায় এক কেজি চাল রান্না করতে ৩ কেজি বা তার কম লাগে। এক মণ লাকড়ির দাম ২৫০ টাকা করে। সেই তুলনায় দেখা যায়, সাধারণ বা খোলা চুলায় এক কেজি চাল রান্না করতে খরচ পড়ে ২৫-২৭ টাকা। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলায় রান্না করতে খরচ পড়ে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ টাকা। এর ফলেও আর্থিকভাবে সাশ্রয় হয়। জানা যায়, পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা ধোয়াবিহীন হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যা হতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। রান্না ঘর, বাড়ির পরিবেশ ও ব্যবহৃত রান্না তৈরির উপকরণের স্থায়িত্ব বাড়ছে। চুলা তৈরি করতে গিয়ে এবং এটি শেখাতে যেয়ে নারীদের একটা সভা হচ্ছে। নারীরা পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে জানতে পারছে। তারা এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। জ্বালানিবান্ধব চুলা তৈরি করে ব্যবহার করায় পরিবার এবং সমাজে নারীদের একটা সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে তৃণমূল নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবার পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলায় রান্নার ফলে ঘর বাড়ি এবং রোগবালাই কম হওয়ার ফলে এর জন্য চিকিৎসাবাদ খরচ লাগেনা। সার্বিক দিক বিবেচনায় দেখা যায়, উন্নত চুলায় রান্নার ফলে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন ব্যবহারকারি, যা নারীর আর্থসামজিক উন্নয়নে বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করছে।

গ্রাম থেকে বৈশ্বক সংকট সমাধানে অবদান
বর্তমান পৃথিবী এক গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। সারাবিশ্বে আজ জীবাশ্ম জ্বালানি বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো প্রথম পর্যায়ে স্থাপন করা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু পারিবারিক চর্চা এবং বিশেষত রান্নার কাজে কিছু পরিবর্তন অধিক জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারে, যা পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কম জ্বালানিনির্ভর চুলা তৈরি এবং ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি গ্রামীণ দরিদ্র নারীরাই স্থাপন করতে পারেন এবং আশেপাশের পাড়া-প্রতিবেশীদের শেখাতে পারেন। দেখা যায়, এই কম জ্বালানিনির্ভর চুলা ব্যবহার করে গ্রামীণ নারীরা কেবলমাত্র পরিবারের খরচ কমিয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছেন না; তারা একটি দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। সামগ্রিকভাবে দেখলে গ্রামীণ নারীদের এই কম জ্বালানিনির্ভর চুলা ব্যবহার বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। কবুলজানের কর্মকান্ডের বিশেষ গুরুত্ব হচ্ছে তিনি কম জ্বালানিনির্ভর সাশ্রয়ী বন্ধু চুলার আদলে স্থানীয় উপকরণ মাটি, গোবর, খড় ধানের তুষ দিয়ে তৈরি ও স্থানীয় জ্বালানি খড়, গরুর গোবরের ঘুটা, লাকড়ি ব্যবহার উপযোগী চুলা তৈরি করছেন। স্থানীয় উপকরণে তৈরি তাই এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবহারকারী নিজেই করতে পারে। তার এই চুলা তিনি পাড়া প্রতিবেশী সকল নারীদের বিনামূল্যে শিখিয়ে দিচ্ছেন। এতে জ্বালানি খরচ অনেক কম, কম ধোঁয়া হয়, রান্না দ্রুত হয় এবং নিরাপদ। এতে জ্বালানি খরচ কম লাগে, নারীদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কর্মকান্ডটির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র নারীর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব চর্চার ভেতর দিয়ে জ¦ালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করবার প্রস্তুতি গ্রহণ এবং এর ভেতর দিয়ে দেশের উন্নয়নে নারীদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণকে বাড়ানো। অন্যদিকে কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার ব্যবহারের কারণে বৈশি^কভাবে কার্বণ নিঃসরণ কমাতে বিশেষভাবে অবদান রাখছে। কারণ প্রতি পরিবারে এই কম জ্বালানিনির্ভর চুলা ব্যবহার কম কার্বন উদগীরণ ঘটাচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি চুলা অনেক অবদান রাখছে।

কবুলজানের উন্নত চুলা পরিবেশ প্রাণপ্রকৃতি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবাদন রাখছে
কবুলজানের উন্নত চুলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আশপাশে থাকা সহজপ্রাপ্য সকল প্রকার জ¦ালানি ব্যবহার করা যায় বা জ¦ালানির ধরণ অনুযায়ী এটি ডিজাইন করে বানানো হয়। কিন্তু প্রচলিত বন্ধু চুলায় শুধু কাঠ বা গোবরের ব্যবহার করতে হয়। কাঠ সংগ্রহ করতে যেমন বৃক্ষ কর্তন করতে হয় যা পরিবেশের জন্য সুখকর নয়। অন্যদিকে গোবর বেশি ব্যবহারের ফলে তা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনা। কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলায় সকল ধরনের জ¦ালানি ব্যবহার করার ফলে জ¦ালানি হিসেবে শুধু কাঠ বা গোবরের ব্যবহার ও নির্ভরতা কমেছে। তুলনামূলক বৃক্ষ কর্তন কমবে যা প্রাণ প্রকৃতি সুরক্ষায় অবদান রাখবে। অন্যদিকে গোবর সার জমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসাথে এই উন্নত চুলায় রান্নায় ধোয়া কম হওয়ার কারণে এবং তাড়াতাড়ি রান্না হওয়ায় কম কার্বন নিঃস্বরণ হচ্ছে যা পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখছে। বাড়ির পরিবেশ ঠিক থাকার কারণে ধোয়াজনিত কারণে পরিবারের সদস্যদের অসুখ কম হচ্ছে। তাই এই চুলা ব্যবহারের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধোয়া কম হওয়ার কারণে রোগবালাই কম হচ্ছে। আশপাশের পরিবেশ প্রতিবেশও ভালো থাকছে।

উন্নত চুলার পাশাপাশি কবুলজান কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবদান রাখছেন
বৈশ্বিক মহামারি করোনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্যোগে কবুলজানের অবদান অনন্য এবং একই সাথে তিনি সংকটকালিন কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায়ও অবদান রাখছেন। তাঁর নিজের বাড়িটিকে একটি সবুজ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি বাড়ি হিসেবে তৈরি করেছেন। সারাবছর তিনি বিভিন্ন দেশীয় জাতের শস্য ফসলের চাষাবাদ করেন এবং বিভিন্ন দেশি জাতের সবজি উৎপাদন করেন। একইসাথে বীজ উৎপাদন করে সেগুলো পাড়া প্রতিবেশি এবং যেসকল গ্রামে চুলা তৈরি করতে যান সেখানে এই বীজগুলোও বিনিময় করে থাকেন। তাঁর নিজের বাড়ির সকল পাশেই শোভা পাচ্ছে ঔষধিসহ নানা জাতের দেশীয় ফল ও অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। সুনসুনি, গীমা,সানচি, কলমী, কানসিসা, হেলেঞ্চা, বথুয়া, থানকুনির মতো অচাষকৃত খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদসহ মৌসুমী শাকসবজি ও ঔষধি দুধরাজ, কুচ, তুলসী, ঘৃত কাঞ্চন, পাথরকুচি, গুইয়া বাগুন, গুইয়া রসুন, চন্দন, শতমূল, নীল কন্ঠ, সাদা কন্ঠ, যষ্টিমধু, তালমিছরী,মহাতিতা, সাদা কুচকরির মতো ঔষধি গাছ দিয়ে বাগান তৈরি করেছেন।


তাঁর নিজের বাড়িটিকে একটি ‘বীজবাড়ি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রায় ১১৫ ধরনের শাকসবজি, ঔষধি, লতাপাতা এবং শস্য ফসলের বীজ দিয়ে তৈরি করেছেন বীজবাড়ি। সেখান তিনি বীজ বিনিময় করে থাকেন। মহামারি করোনার সময়ে যখন চারিদিকে লকডাউন, কৃষক বীজ কিনতে পারেনা বা বীজ নেই, তখন গ্রামের নারীরা তাঁর বীজবাড়ি থেকে বীজ নিয়ে শাকসবজি উৎপাদন করেছেন। মহামারি করোনার সময় তিনি নিজ গ্রামসহ আশাপাশের গ্রামগুলোতে প্রায় ১০৫০ জন নারী ও পুরুষের মধ্যে নানাজাতের সবজি বীজ বিনিময় করেছেন। তিনি তাঁর গ্রামটিতে নারীদের নিয়ে একটি সংগঠনও তৈরি করেছেন। যেখানে নারীর অধিকার, কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

উপসংহার
করোনা মাহামারি ও বৈশি^ক যুদ্ধবিগ্রহসহ নানা সংকটে বর্তমান বিশ^। একদিকে জ¦ালানির অপ্রতুল্যতা, অধিক কার্বন নিঃসরণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংকটের দিকে এগুচ্ছে বিশ^। এমন পরিস্থিতিতে কবুলজানের মতো একজন উদ্ভাবনী নারীর দৃষ্টান্ত অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে তিনি জ¦ালানি সংকট মোকাবেলাসহ পরিবেশ প্রতিবেশ এবং স্থায়িত্বশীল কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবদান রাখছেন। উন্নয়ন যখন নিজের আশপাশের উপকরণ বা নিজের আয়ত্বের মধ্যে থাকে সেই উন্নয়ন অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্থায়িত্বশীল হয়। কবুলজানের পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার ব্যবহার যেমন গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে তেমনি একটি উন্নত চুলার ব্যবহারের কারণে কম কার্বণ নিঃসরণ হওয়ার ফলে বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অসামান্য অবাদান রাখছে। অন্যদিকে বাংলাদেশর গ্রামীণ জনগোষ্টীর স্থািয়ত্বশীল উন্নয়নে বিশেষভাবে অবদান রাখছে।

happy wheels 2

Comments