সাম্প্রতিক পোস্ট

যত্নে নোনা পানিতেও ফসল ফলে

সাতক্ষীরা থেকে মফিজুর রহমান ও বাবলু জোয়ারদার

1মাটি কেবল মাটি নয়, মাটি কৃষকের তার প্রাণ। লবণাক্ত পরিবেশে কৃষিকাজ করে টিকে থাকার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকেরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের রমজাননগর ইউনিয়নের গ্রাম সোরা। সোরা গ্রামজুড়ে রয়েছে অসংখ্য চিংড়ি ঘের আর চারিধার সবই প্রায় লবণাক্ত। কৃষিজমির মাটিও হয়ে পড়েছে লবণাক্ত। চাষের জন্য মিষ্টি পানির অভাবে কৃষকেরা দিন দিন কৃষি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এর মাঝেও কেউ কেউ লবণ পানিতে টিকে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এমনই একজন ব্যক্তি সোরা গ্রামের মোস্তফা সরদার যিনি লবণ পানির সাখে মিষ্টি পানি মিশিয়ে সবজি চাষ করছেন যা ওই অঞ্চলের মধ্যে দৃষ্টান্ত।

3
মোস্তফা সরদার এলাকার পানজেগানা পুকুর থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করে লবণ পানির সাথে মিশিয়ে সবজি ক্ষেতে প্রয়োগ করেন। তিনি পানি মেশানোর পর মুখে দিয়ে পরীক্ষা করেন। সবজি চাষের উপযোগী মনে করলে তখন সেটা সবজি গাছে ব্যবহার করেন। তিনি যখন মেশানো পানি ব্যবহার করছেন তখন সেটা লবণ পানি মাপার মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায় ৭.১ পিপিটি। প্রথমে বীজ রোপণের পর নাড়া দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তারপর নাড়ার উপর পানির ছিটে দেওয়া হয়। ২/৩ দিন পরপর পানির ছিটা দিতে হয়। পানিতে লবণের মাত্রা বেশি থাকায় অল্প পরিসরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বেশি পানি দিলে সবজি গাছ মারা যাবে। লবণাক্ততার কারণে সোরা গ্রামের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে দিন দিন মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে।

১৯৮৮ সালের দিকে এলাকায় ব্যাপক হারে চিংড়ি ঘের শুরু হওয়ার ফলে কোন কৃষিজমি না থাকায় বাড়ির পার্শ্বে পুকুর কেটে বসতভিটায় মাটি ভরাট করে সবজি চাষ শুরু করেন রমজাননগর ইউনিয়নের সোরা গ্রামের মোস্তফা সরদার। তিনি বলেন, “ঘের শুরু হওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির চারদিকে লবণ পানির ঘের হওয়ার ফলে পুকুরের পানিতেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকে।” তিনি আরও বলেন, “বসতভিটার যে অংশে সবজি চাষ করতাম সেটি নিচু হওয়ায় ঘেরের লবণ পানি ঢুকে সব সবজি নষ্ট হয়ে যেত। তখন বসতভিটায় পুকুর কেটে মাটি ভরাট করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাটি উঁচু করে সবজি চাষ শুরু করি।”

মোস্তফা সরদার বলেন, “শুকনা মৌসুমে পানির অভাবে সবজি চাষ করা যেত না। তখন আমি পানজেগানা পুকুর থেকে মিষ্টি পানি এনে ড্রাম ভর্তি করে রাখি। তারপর মিষ্টি পানির সাথে লবণ পানি মিশিয়ে সবজি চাষ শুরু করি। দুই কলস মিষ্টি পানির সাথে এক কলস লবণ পানি মিশিয়ে সবজি চাষ করি।” তিনি আরও বলেন, “কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত লবণ পানির সাথে মিষ্টি পানি মিশিয়ে সবজি চাষ করি। বর্তমানে আমার বসতভিটায় সারাবছর ঢেঁড়ষ, পুইশাক, ঝিঙ্গে, লাউ, ডাটাশাক, বেগুন, সরিষা, বীটকপি, ওলকপি, হলুদ, ঝাল, লালশাক, মূলা, পালংশাক, টমেটো, মৌরী, তরুল, কুশি, ওল, কচুরমুখী, বরবটি, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া চাষ করি।”
তিনি জানান, কদবেল, নিম, সজিনা, বাবলা, ছবেদা লবণে ভালো হয়। কিন্তু পেঁয়ারা, আম গাছের শিকড় মাটির নীচে যাওয়ার ফলে বড় হয়ে গাছগুলো শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। লবণ পানির ঘের শুরু হওয়ার ফলে জাতিগত পেশা কৃষি বিলুপ্ত হতে চলেছে । 4

একমাত্র মিষ্টি পানি সংরক্ষণই স্থানীয় মানুষের বসতভিটার মাটি নোনামুক্ত করা সম্ভব। লবণাক্ত পরিবেশে কৃষি কাজ করে টিকে থাকার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলেছেন। সম্মিলিত উদ্যোগে মানুষের স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী কৃষি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারলে, তাদেরকে আর কাজের জন্য গ্রাম ছাড়তে হবে না। মারাত্মক লবনাক্ত মাটি-পানি ও পরিবেশ মোকাবেলা করে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে মানুষের স্থানীয় “নোনা মাটি ব্যবস্থাপনা” জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একটি সফল উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কোন অঞ্চল লবণাক্ত দূর্যোগের শিকার হলে স্থানীয় জনগণের এই অভিজ্ঞতা অনেক বেশি শিক্ষনীয় হতে পারে। মোস্তফা সরদার তাঁর এ উদ্যোগের মাধ্যমে সেটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: