সাম্প্রতিক পোস্ট

জেন্ডার বিশ্লেষণ ও নারীর ব্যয় সাশ্রয়ী ভূমিকা

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
বারসিক’র উদ্যোগে সম্প্রতি রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জেন্ডার বিশ্লেষণ বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা। উক্ত কর্মশালায় নেত্রকোণা অঞ্চলের সকল কর্মকর্তা, মাঠসহায়কগণ এবং নেতৃত্বস্থানীয় নারীগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রথমদিকে বারসিক’র পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস কর্মশালার লক্ষ্য ও উদ্যেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। পরবর্তী পর্যায়ে পরিচিতি পর্ব ও দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালা শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় অংশগ্রহণকারীগণ নিজেদের মতো করে জেÐার এবং লিঙ্গ সম্পকে পার্থক্য তুলে ধরেন। এ পর্যায়ে বলা হয় যে, লিঙ্গ হচ্ছে জন্মগত ও প্রাকৃতিকভাবে নারী পুরুষের পরিচয়। আর জেন্ডার হচ্ছে নারী পুরুয়ের সামাজিক পরিচয়, সামাজিকভাবে গড়ে উঠা নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক।


আলোচনার এক পর্যায়ে যৌতুক, বাল্য বিয়ে ইত্যাদি বিষয়গুলোও উঠে আসে এবং অংশগ্রহণকারীগণ বিশ্লেষণ করেন যে এই বিষয়গুলো হচ্ছে সামাজিক এবং জেন্ডারের ফলাফল। কারণ সমাজ মনে করে নারী দূর্বল, কিছুই করতে পারেনা এবং পুরুষের চাইতে পিছিয়ে আছে। তাই তাঁকে যৌতুক বা অর্থের বিনিময়ে পুরুষের সমান হতে হবে। মূলত নারীদের পিছিয়ে থাকা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণ।


একটি পরিবারের ব্যবস্থাপনায় কত ধরণের কার্যক্রম সম্পাদিত হয় এ নিয়ে অংশগ্রহণকারীগণ মতামত প্রদান করেন। এই কাজগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, নারী করেন ১৯ ধরণের এবং পুরুষের কাজ ১৩টি। এই কাজের প্রেক্ষিতে আরো দেখা যায়, নারীরা বৈচিত্র্যময় কাজ করেন। নারীর কাজ চলমান, ঘূর্ণায়মান। কিন্তু পুরুষের কাজ ঐচ্ছিক। পুরুষরা ইচ্ছা করলেই কোনো কাজ সময়মতো করতেও পারে আবার নাও করতে পারে।


নারীদের কাজের ফলে একটি পরিবার ব্যয় সাশ্রয়ী হতে পারে এবং লোকায়ত চর্চা ও বৈচিত্র্য সুরক্ষা পায়। নারী যেহেতু বাড়িতে থাকে এবং তাঁর কাজের সকল উপাদান বাড়ি বা পরিবেশকেন্দ্রিক তাই তিনি পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করেন না। অন্যদিকে পুরুষের কাজ বাইরের তাই তাঁর কাজের ফলে এ ধরণের কোনো পরিবর্তন আসেনা। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় যেমন যন্ত্র চালিত কৃষি, রাসায়নিকের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে পরিবেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু নারী বাড়িতে থেকে কাজ করেন, পরিবারের সকলের চিন্তা করেন বলে ধোঁয়ামুক্ত চুলা ব্যবহার করেন।


নারী সৌন্দর্য্যপ্রিয়। তাই বাড়ির আঙিনায় ফুল, ফলের গাছ রোপণ করেন। অন্যদিকে পুরুষেরা অর্থের চিন্তা করে বিদেশি গাছ রোপণ করেন। আবার নারীগণ বাড়ির আঙিনায় সব্জী চাষ করে বীজ সংরক্ষণ করেন। কিন্তু পুরুষেরা বাজারের বীজ দিয়ে জমি চাষ করেন, যা পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।


পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র বিষয়েও আলোচনা হয়। এখানে বলা হয় যে, পুঁজিবাদীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। উন্নয়নের সাথে পুঁজিবাদকে যুক্ত করতে গিয়ে নারীর জ্ঞানকে এখন বাজারমূখী করা হচ্ছে। যে কারণে উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীর কাজ বাদ পড়ে যাচ্ছে। ফলে হারাচ্ছে মানুষের জ্ঞান, সম্পর্ক এবং সকল ধরণের বৈচিত্র্য। বাজার যত উন্নত হবে, নারীর কাজ তত হারিয়ে যাবে এবং কমে যাবে লোকায়ত চর্চা।


উক্ত কর্মশালায় বৈচিত্র্য ও এর সাথে নারীর সম্পর্ক, ইকোসিস্টেম, সিডও সনদ, সমতা ও সাম্যতা, জেন্ডার চাহিদা ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা হয়। নারীদের উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে হলে আমাদের প্রথমে জেন্ডার চাহিদা নিরুপণ করতে হবে। জেন্ডার বাজেটিং, পরিকল্পনা করে কার্যক্রম সম্পাদন ইত্যাদিও প্রয়োজন।


নারীকে অগ্রণী ভূমিকায় নিয়ে আসতে হলে এড্ভোকেসি ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয়। একজন নারী কিভাবে তাঁর অধিকার আদায় করতে পারে সে বিষয়ে তাঁদের সহযোগিতা করতে হবে। কর্মশালায় অধিকার আদায়ের বিভিন্ন বিষয়/ধাপ নিয়েও আলোচনা করা হয়।


বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আজ আমাদের দেশের নারীগণ বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে বাইরের পৃথিবীতে বিচরণ করতে শিখেছেন। কিন্তু কোথাও একটা ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। যেটা গলিয়ে আজও নারীরা বের হতে পারছেন না। যে কারণেই প্রয়োজন হয় জেন্ডার বিষয়ক আলোচনা। নারী যতই ঘরের কাজে পটু বা তাঁর ব্যয় সাশ্রয়ী ভূমিকা থাকুক বা অর্থ উপার্জনের সাথে যুক্ত থাকুক না কেন পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র যতদিন তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না করবে ততদিন নারী থেকে যাবে উন্নয়নের অন্তরালে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: