সাম্প্রতিক পোস্ট

দর্জি কাজের মাধ্যমে জয়নাব বেগমের সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
শ্যামনগর উপজেলা কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের একজন কৃষানী জয়নাব বেগম (৩৮)। স্বামী আবু মুসা একজন টলি ড্রাইভার। পায়ের সমস্যা থাকায় কোন ভারি কাজ করতে পারেনা। নিজস্ব কোন জমি জমা নেই । প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী আবু মুসার পৈতিৃক ভিটা কালিগঞ্জ উপজেলার কালিকাপুরের গ্রামের জমি জমা বিক্রি করে দিয়ে শ্যামনগরের জয়নগর গ্রামে চলে আসেন। সেখান এসে জয়নগর গ্রামে শহীদ মোড়লের ৭ শতক জায়গা বর্গা নিয়ে ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। ৩ মেয়ে ও স্বামী স্ত্রী। বড় মেয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়ে, ২য় মেয়ে ৪ র্থ শ্রেণী এবং অন্যটি ছোট।


জয়নাব বেগমের বিয়ে হয় ছোট বেলোয়। বিয়ের পরে তাদের সংসার ভালো মতো চলতো। স্বামী আবু মুসা যা আয় রোজগার করতো তাতেই ভালোই চলত সংসার। কারণ তখন সংসারের সদস্য সংখ্যা কম ছিলো। কিন্তু যখন সংসারের সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ছিলো। স্বামীর শারীরিক সমস্যা থাকার কারণে সব ধরনের কাজ করতে পারতেন না। তাই সমিতি থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি টলি ক্রয় করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও সমিতির ঋণের সব টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। এক এনজিও থেকে নিয়ে আরেক এনজিও পরিশোধ করা এভাবে চলতে থাকে তাদের সংসার। আর এসব কিছু মাথায় রেখে সংসারের চাকাকে সচল করার জন্য জয়নাব বেগম নানান ধরনের পরিকল্পনা করতে থাকেন। কখনো বাড়িতে হাঁস মুরগি পালন কখনো বর্গা নেওয়া জমিতে কম বেশি সবজি চাষ করতে থাকেন।


তাছাড়াও জয়নাব বেগম গ্রামের রক্ষণশীল পরিবারের নারী হওয়াতে বাইরের কাজের সাথে তেমনভাবে যুক্ত হতে পারতেন না। তাই সবসময় বাড়ির মধ্যে থেকে কিছু করা যায় কিনা সে চিন্তা করতেন।


জয়নাব বেগম বলেন, ‘আমার বাড়িতে এখন ৭টি মুরগি, ৮টি হাঁস আছে। সেখান থেকে মাসে প্রায় ১ হাজার টাকার মতো আয় হয়। বাড়িতে সবজি চাষ করে পরিবারের চাহিদাও কিছটা পূরণ করছি। নিজস্ব বাড়ি না হওয়াতে তেমন ভাবে সবজি চাষ করতে পারিনা। কারণ জায়গা খুবই কম। বাড়িতে কম পরিসরের মধ্যে কিভাবে সংসারের আয় রোজগার বাড়াতে পারি তা নিযে চিন্তার শেষ ছিলো না। অবশেষে বাড়িতে বসে আয় করার একটি পথ আমার সামনে আসলো। আর তা হলো দর্জি কাজ। যেটা আমি গত ২০১৯ সাল থেকে শুরু করেছি।’


এ বিষয় জয়নাব বেগম বলেন, ‘আমরা জয়নগর গ্রামের নারীরা ২০১৭ সালের দিকে জয়নগর কৃষি নারী সংগঠন নামে একটি নারী সংগঠন তৈরি করি। সংগঠন তৈরির পর থেকে সংগঠনের মাধ্যমে সঞ্চয় জমা, ঋণ বিতরণ, বিভিন্ন বিষয় আলোচনা, বিভিন্ন মেলা আয়োজন ও বাস্তবায়নের কাজ চলমান রেখেছি। সে কাজের পাশাপাশি আমরা নারীরা আমাদের আয়বর্ধন কাজকে সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের জন্য বারসিক’র নিকট দর্জি প্রশিক্ষণ সহায়তার দাবি জানাই। সে লক্ষ্যে বারসিক থেকে আমাদের দর্জি প্রশিক্ষণ সহায়তা করে। আমরা একসাথে ২৫ জন নারী ৩ মাসে ব্যাপি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। সেই প্রশিক্ষণ মাধ্যমে কাজ শিখে আমি আমার সংসাররে আয়ে ভূমিকা রাখছি। আমি এখন শুধুমাত্র ছেলেদের শার্ট প্যান্ট তৈরি ছাড়া নারীদের সব ধরনের কাজ পারি।’


তিনি আরো বলেন, ‘আগে যেমন নিজেদের পরিবারের কাপড় বানানোর জন্য অন্যের কাছে যাওয়া লাগতো। কিন্তু এখন আর তা লাগেনা। এখন বাইরের মানুষ আমার কাছে পোশাক বানাতে আসে। এতে করে বাড়িতে বসে আমার আয়ের একটি পথ তৈরি হলো। এখন আমি প্রতিমাসে প্রায় ১৫০০ টাকার মতো আয় করতে পারছি। যা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতে পারছি। মাঝে মধ্যে ঋণের টাকাও কিছু পরিশোধ করতে পারছি। এগুলো পাশাপশি যদি পুঁজি আরেকটু বেশি হতো তাহলে কিছু শিট কাপড় তুলতে পারতাম এবং আমার এ কাজটি আরো সম্প্রসারণ করতে পারতাম। সব কিছু মিলিয়ে দর্জি কাজ করে আমি স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।’


গ্রাম বাংলার অসংখ্য নারী পরিবারের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করার জন্য নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। তেমনি একজন নারী জয়নাব বেগম। পরিবার পরিজনদের সুস্থ রাখার জন্য নানান চেষ্টা চলমান রেখেছে। তাদের মতো নারীর কাজের আগ্রহ ও উদ্দীপনাকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: