সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাগো বসার সময় নাই, আমাদের গরু আছে

মানিকগঞ্জ থেকে ঋতু রবি দাস
‘আমাগো বসার সময় নাই, কাজ কইরাই সারতে পারিনা আবার বসার সময় পামু কই’? -এই কথাগুলো বলেছেন মানিকগঞ্জ শহরস্থ পৌরসভাধীন জয়নগর মাঝিপাড়া গ্রামের অঞ্জনা রাজবংশী। এ কথাগুলো ওই এলাকার ৯০% নারীদেরই কথা।
কাজের সূত্রে যেদিন প্রথম জয়নগর যাওয়া হয়, কোন নারীদেরই বাসায় পাওয়া যায়নি। সময়টা ছিল তখন দুপুর একটা থেকে দু’টার সময়। প্রথমে যার বাড়িতে যাওয়া হয়, তার নাম হল সুশীল রাজবংশী (৫০) এবং স্ত্রীর নাম অঞ্জনা রাজবংশী (৪৩)। সুশীল রাজবংশীর সাথে কথা বলে গ্রামের লোকজনের বিষয়ে মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করি। সেই দিনই অঞ্জনার সাথে সারা পাড়াটা ঘুরে বেড়াই। অবাক করা বিষয়টি হলো কোন নারীদেরই বাসায় পাওয়া গেলো না। আমি একটু কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তাঁর বাড়িতে কাউকে দেখছি না, সবাই কোথায়? তিনি বললেন, ‘এই পাড়ার সব নারীরা মাঠে কাজ করেন, শুধু আমি বাদে, তোমার কাকা আমাকে মাঠে কাজ করতে দেন না। আমি বাড়িতেই গরু পালি আর তোমার তিনি (অঞ্জনার স্বামী) মাঠ থেকে ঘাস নিয়ে আসেন।’


এভাবেই দিন যত বাড়তে থাকে, জয়নগর আসা যাওয়াও বাড়তে থাকে। মাঝিপাড়া এলাকাটা একটু বিচ্ছিন্ন। কালীগঙ্গার কোলঘেঁষেই তাদের বসতি। এখানে প্রায় ৮৬টি ঘর আছে রাজবংশীরা। সেখানে বেশির ভাগই পরিবারে গরু ও ছাগল আছে। তাছাড়া জয়নগর রাজবংশী পাড়ায় গেলে একটা জিনিস সবার নজর কাড়বে আর সেটা হলো প্রত্যেকের বাড়িতে কম হলেও একটি করে ফুলের গাছ রয়েছে।


সকালেই সবাই দুপুর এবং সকালের খাবার রান্না করে নেন। পুরুষরা সবাই সকালে খেয়েই যার যার মত করে কাজে চলে যান। আবার কেউ কেউ নদীতে মাছ ধরতে যান। তারপর শুরু হয় নারীদের কাজ। কর্মব্যস্ত নারীদের মধ্যে একজন হলেন ভারতী রাজবংশী (৩৮)। তাদের এখন মোট ৪টি গরু এবং ২টি ছাগল আছে। সকালে কোনমতে নাশতা করেই তিনি এবং তাঁর শ^াশুড়ী মাঠে বেড়িয়ে যান ঘাস আনতে। গ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে ৪টি গরু এবং ছাগলের জন্যে ঘাস আনেন। দুপুর একটার মধ্যে বাড়িতে এসে খেয়েই গরু এবং ছাগলের পিছনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। তাছাড়া বাড়ি থেকে একটু দূরেই তাদের জমি বর্গা নেওয়া আছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সবজি তারা উৎপাদন করেন। এইবার তারা মরিচ লাগিয়েছিলেন এবং ভালো ফলনও হয়েছিল।
ওই গ্রামের প্রায় প্রতিটি নারীই প্রতিদিন নানা কর্মব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটান। এই গ্রামের প্রত্যেক নারীরাই দশভুজার রূপ! তারা এক হাতেই সব সামাল দিচ্ছেন। তাই তো তাদের বসার সময় নেই। নারীদের এই কাজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরুষের তুলনায় তারা কোন অংশে কম নয়; বরং অনেকক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষের চেয়েও বেশি কাজ করেন। তবে তাদের কাজ কখনও মূল্যায়ন করা হয় না। ঘরবাড়ি সামাল দিয়েও নিজের সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলছেন। তাই প্রত্যেক নারীই হচেছন দেবীর রূপ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: