সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাদের অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল ও আল ইমরান

বাংলাদেশের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলা বিশ্বপরিচিত। প্রাকৃতিক দূর্যোগ-বন্যা, জলোচ্ছাস, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন এ উপজেলার নিত্যসঙ্গী। এছাড়াও, উপজেলায় লবণ পানির দুর্যোগ প্রতিনিয়ত ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে। আর দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্টীর পুনর্বাসনের জন্য সরকারি ও বেসরকারীভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে । তার মধ্যে বাস্তভিটা বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে খাস জমিতে পুনর্বাসন একটি অন্যতম উদ্যোগ।

pic-1
উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ইউনিয়ন দূর্যোগ ব্যবস্থপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পূর্নবাসনের জন্য ২০০২ সালে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চুনা নদীর চরে পানখালী ও বুড়িগোয়ালিনী গ্রাম সংলগ্ন স্থানে ২টি আশ্রয়ন প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ২০০৮ সালের দিকে। নৌবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে বুড়িগোয়ালিনী ব্যারাক ১০টি বেডে ১০টি করে ১০০ পরিবার এবং পানখালী ব্যারাকে ৪টি বেডে ৪টি করে ৪০টি পরিবারের জন্য বন্দাবস্ত করা হয়। যা স্থানীয়ভাবে ব্যারাক নামে পরিচিত। ২০০৯ সালের সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্টীদেরকে উক্ত আশ্রয়ন প্রকল্প দুটিতে পূনর্বাসন করা হয়। আশ্রয়ন প্রকল্প তৈরি এবং আইলা পরবর্তী পুনর্বাসনের সময় থেকে আশ্রয়ন প্রকল্প দুটি ছিল ধুধু মরুভূমির মতো। কোন গাছ-গাছালি ও গৃহপালিত প্রাণীও ছিল না।

pic-2
এরপর ২০১১ সালে বুড়িগোয়ালিনী এবং ২০১৪ সালে পানখালীতে বারসিক, কৃষক ও বনজীবী সমন্বয়ের প্রতিনিধি দল ধারাবাহিকভাবে সরকারীভাবে পুর্নবাসিত ব্যারাক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের সাথে আলোচনা করে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী তাদের বসতভিটা ও বসতভিটার চারিধারে কৃষি কাজ ও বনায়ন করার জন্য উক্ত প্রতিনিধি দলের কাছে দাবি জানান। আর সেখান থেকে বারসিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে আশ্রয়ন প্রকল্প দুটি সবুজায়ন হয়। আশ্রয়ন জনগোষ্ঠী তাদের জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়নে ব্যারাকে বছরব্যাপী সবজি চাষ, বিভিন্ন ফলের গাছ লাগানো, বনায়ন তৈরি, প্রাণী সম্পদ পালন, পুকুরে মাছ চাষসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ ও সেবা আদায়ে সক্ষম হয়ে উঠেছেন। নিজেদের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও শক্তিশালী করার জন্য নিজেরা সংগঠন তৈরি করেছেন এবং সে সংগঠনের মাধ্যমে সঞ্চয় জমা রাখা, ঋণ প্রদান, নিজেদের সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রেখে চলেছে।

pic-3
ধারাবাহিকভাবে ব্যারাক জনগোষ্ঠী ব্যারাকের সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার, উপজেলা প্রশাসন এবং সংসদ সদস্যের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। এ বিষয়ে আশ্রয়ন জনগোষ্ঠী রুহিত দাস সরদার, আকতার আলী, তপন মন্ডলরা বলেন যে, কৃষি উপযোগী পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকার মান উন্নয়ন হয়েছে অনেকটা। এখন তারা বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল, মাছ খেতে পারছেন। নিজেরা প্রাণী সম্পদও পালন করতে পারছেন। নিজেদের সমস্যা সমাধানে ভুমিকাও রাখছেন। এতে করে তাদের খাদ্য চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। নিজেদের সমস্যা চিহ্নিত করে কিভাবে তা সমাধান করা যায় সে বিষয়ে তারা সচেতন। বিগত কয়েক বছর ধরে তারা ব্যারাকের সার্বিক উন্নয়ন যেমন: ব্যারাকের ঘর, ল্যাট্রিন, পুকুরের পাড়, সুপেয় পানির ফিল্টার, যোগাযোগের রাস্তা সংস্কার, ঘরের দলিল তৈরি, বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তি, পুকুরে মাছ চাষ, সংগঠনের ঘর তৈরির জন্য প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেন। যার মধ্যে কিছু কিছু সমস্যা সমাধান হয়েছে।

pic-4

আশ্রয়ন জনগোষ্ঠী অন্যদের মধ্যে থেকে কৃষাণী কৌশল্যা মুন্ডা, সুপদ মন্ডল, সুফিয়া বেগম, মোমিন গাজিরা জানান, তাদের অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল যে তাদের ব্যারাকে একটি ক্লাব ঘর থাকবে সেখানে তারা একসাথে বসবেন, বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও বিচার সালিশ করবেন, বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে তারা অবসর সময় কাটাবেন। সাথে এটিকে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলবেন। যেখানে তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করবে। বিভিন্ন জায়গায় আলোচনায় তারা এ দাবিটি করতেন। তারা আরও জানান, বিগত কয়েকবছর ধরে তাদের ব্যারাকের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের নিকট ধরাবাহিক আবেদন ও যোগাযোগ করে আসছেন। তার মধ্যে সংগঠনের বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য। অবশেষে তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।

উপজেলা দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগ এবং ত্রাণ ও দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আশ্রয়ন প্রকল্প দুটিতে ভিন্ন ভিন্ন দুটি কমউিনিটি সেন্টার গত জুলাই ২০১৮ তে শুরু হয়ে নভেম্বরে শেষ হয়। গত ২০ নভেম্বর ২০১৮ প্রকল্প দুটির উদ্বোধন এবং দায়িত্ব হস্তান্তর করেন সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুজন সরকার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম খানসহ স্থানীয় সুশীল সমাজের লোকজন।

pic-5
উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনায় উদ্বোধকবৃন্দ বলেন, ‘এই কমিউনিটি সেন্টার এই আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর, এটি তাদের একটি সম্পদ এবং এখানে তারা যে সংগঠন করেছে তার কাজ করতে পারবেন। সাথে সাথে এটি সংরক্ষণ এবং কিভাবে এটাকে জন উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে সে জন্য বারসিককে সার্বক্ষণিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার আহবান জানাই।’ আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসকারী রুহিতদাস সরদার, আক্তার আলী এবং আশুলতারা বলেন, ‘আমাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পথ প্রদর্শক হলো বারসিক। আমাদের আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর এ সমস্যা সমাধানে অবদান রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও বারসিককে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।”

উপকূলীয় এলাকায় দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানের এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডকে আরো বেশি জনউদ্যোগমূখী করা প্রয়োজন। তাহলেই জলবায়ু পরিবর্তন-প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা পূনঃগঠন উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরো টেকসই করা সম্ভব হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: