সাম্প্রতিক পোস্ট

গাছে গাছে ঝুলছে কেওড়া, জনমনে খুশির জোয়ার

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

উপকূলীয় প্রতিবেশীয় ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টির একটি সফল উদ্যোগ ও শ্রেষ্ঠ উদাহরণ শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়ীয়া চুনা নদীর চর বনায়ন। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নদী ভাঙন রোধ, জ্বালানি সংকট নিরসন, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সবুজ বেষ্টনী তৈরি তথা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশের উপকূলীয় নদীর চরে প্রতিবেশীয় বনায়ন জরুরি। তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে সমাজ ও দেশ অনেকাংশে সুরক্ষা পাবে। তালবাড়ীয়া চুনা নদীর চর বনায়নের মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী সবুজ বেষ্টনী ও জীব-বৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন। স্থানীয় জনউদ্যোগে সৃষ্ট এই বনায়নের মধ্যে কেওড়া গাছে ঝুলছে স্বুস্বাদু এই ফল।

গাছে গাছে ঝুলছে কেওড়া, জনমনে খুশির জোয়ার (3)

দেশের দক্ষিন পশ্চিম উপকুলীয় সুন্দরবন বিধৌত সাতক্ষীরা জেলার উপকুলীয় শ্যামনগর উপজেলার ১০নং আটুলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়ীয়া গ্রামটি জনবহুল ও সুপ্রাচীন। চুনা নদীর তীর ঘেষা গ্রামটির নানামুখী সমস্যার মধ্যে নদীভাঙন এ এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। নদী ভাঙন রোধ, নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, জ্বালানি সংকট নিরসন ও পরিবেশ/প্রতিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় তালবাড়িয়া, গাইনপাড়া ও মাগুরাকুনী গ্রামের স্থানীয় জনগণ, বারসিক, উপজেলা সামাজিক বনায়ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার এর যৌথ সমন্বয়ে নদীর চরে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সমন্বিত আলোচনা, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ২০১২ সালের জুন মাসে প্রায় ২ কিলোমিটার (মাগুরাকুনী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে গাইনপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত) চুনা নদীর চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন করা হয়। উপজেলা সামাজিক বনায়ন অধিদপ্তরের “উপকূলীয় এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ও বাঁধ সংলগ্ন চর বনায়ন শীর্ষক প্রকল্প” এর আওতায় পর্যায়ক্রমে ৮৮,৮৮০টি ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা (কেওড়া, গোলপাতা, বাইন, কাঁকড়া ও গরান) সহযোগিতা করেন।

গাছে গাছে ঝুলছে কেওড়া, জনমনে খুশির জোয়ার (1)

তালবাড়ীয়া গ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ১০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত উপজেলা সামাজিক বনবিভাগের দাতিনাখালী ম্যানগ্রোভ নার্সারি থেকে এসকল চারা সংগ্রহ করেন। বারসিক’র ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন ও সহযোগিতার আওতায় বনায়নের প্রথম পর্যায়ে বেড়ার জন্য প্রয়োজনীয় (ফাঁস জাল, গরানের খাদি, বাঁশ, সুতা,) উপকরণ সহায়তা করে। সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত আলোচনার ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে ম্যানগ্রোভ বনায়নটি গড়ে তোলা হয়। তালবাড়ীয়া গ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠী নদীর চর বনায়নে বীজ ও চারা রোপণ, পরিচর্যা, বেড়া সংস্কার ও বনায়ন রক্ষনাবেক্ষণ এর সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করেন বলেই তাদের সমন্বয়ে তালবাড়ীয়া চর বনায়ন সুরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বিভিন্ন প্রজাতির বীজ সংরক্ষিত বনায়নের মধ্যে রোপণসহ নিবিড় পরিচর্যা ও কঠোর রক্ষণাবেক্ষনের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয়রা। এছাড়া ওই এলাকার তিনটি গ্রামের ১২০টি পরিবারের প্রতিটি পরিবার ২০০ টাকা করে সংগ্রহ করে একটি তহবিল সংগ্রহ করে বনায়ন সুরক্ষায় সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

বাগানের অধিকাংশ গাছ কেওড়া। স্থানীয় উদ্যোগে সৃষ্ট ম্যানগ্রোভ বনায়নের কেওড়া বাগানের প্রতিটি কেওড়া গাছে কেওড়া ফল ধরায় জনমনে খুশির জোয়ার দেখা দিছে। বাগানের বয়স চার বছর অতিবাহিত হওয়ায় গাছগুলো একদিকে যেমন বড় হয়েছে অপরদিকে তেমন প্রায় প্রতিটি গাছে গাছে ঝুলছে এই জনপ্রিয় ফল।

গাছে গাছে ঝুলছে কেওড়া, জনমনে খুশির জোয়ার (2)

কেওড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও অতিজনপ্রিয় একটি ফল। বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস উপকূলবাসীর প্রতিটি বাড়িতে এ মৌসুমি ফলে ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। কাচা, সেদ্ধ করে, তরকারি রান্না করে, ডালের সাথে, টক রেঁধে, অম্বলসহ নানাভাবে খাওয়া যায় এটি। প্রাকৃতিক এই কেওড়া ফল থেকে উপকূলীয় মানুষের মধ্যে আচার তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। টক, ঝাল মিষ্টি স্বাদের আচার, জেলি, চকলেট, নোড়াসহ নানা আইটেম বানিয়ে রেখে দেন সারাবছর খাওয়ার জন্য। স্বাদে ও গুণে অনন্য এই ফল বনজীবীরা মহাঔষধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটাই একমাত্র উপকারী টক ফল যা কিনা নানাভাবে খাওয়ার উপযোগি।

বনায়ন সুরক্ষা কমিটির আব্দুল মালেক বলেন, “আমাদের একটা পার্টের বনায়নের কেওড়া কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে বিক্রয় করে আমাদের ক্যাাশে টাকা জমা করব। গতবার বেশি ফলন পাইনি, তবে এবার গাছে গাছে বেশ কেওড়া ধরেছে।”

জনউদ্যোগে সৃষ্ট নদীর চরের বনায়ন স্থানীয়দের জন্য সুফল বইতে শুরু করেছে। একটি উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরি হওয়াতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষায় অবদান রাখছে। একইসাথে বনায়নের কেওড়া ফল স্থানীয়দের পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: