Posted in

সবুজ পৃথিবী সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য শক্তি

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত ও বিশ্বব্যাপী অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নবায়নযোগ্য শক্তি। নবায়নযোগ্য শক্তি হল সেই শক্তি যা বারবার ব্যবহার করা যায়, শক্তিকে নতুনরূপে ব্যবহার করা যায়, ব্যবহারে একবারেই নিঃশেষ হয়ে যায় না। পরিবেশগত বিপর্যয়ের হাত থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষা তথা জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে সকল দেশ। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানী মজুদ আছে তা নিঃশেষ হবে একদিন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে গ্রীন হাউস নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে; প্রভাব পড়ছে পরিবেশের উপর। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় ও নানাবিধ উন্নয়ন দুর্যোগের পাশাপাশি বিশ্ব আজ জলবায়ু সংকটেরও মুখোমুখি। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর সভ্যতা এবং উন্নয়ন আজ নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে। এ অবস্থায় প্রকৃতির একজন সদস্য হিসেবে, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে আরো বেশি যত্নশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে আমাদের; নিতে হবে বাস্তবমূখী নানা ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা।
সবুজ পৃথিবী সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানী (1)
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। আর এই শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে আমাদের চলমান বিশ্ব পুরোটাই নির্ভর করে চলছে জীবাশ্ব জ্বালানির উপর যেমন মাটির নিচের গ্যাস, কয়লা, পেট্রোল ও ডিজেলের উপর। এই জীবাশ্ব জ্বালানিও আজ নিঃশেষ। তাহলে পৃথিবী চলবে কীভাবে? জীবন কী থমকে যাবে? সংকটের পর সংকট। মানুষ বিকল্প খুঁজছে। একটা ভালো কোনো সমাধান চাইছে। আর তাই পৃথিবীর সর্বত্র নবায়ানযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে জোরেসোরে।
পৃথিবীতে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে উন্নত দেশেগুলো অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ইউরোপের জার্মানির দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় তারা বছরে মোট যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে তার শতকরা ৩০ ভাগের বেশি আসে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে। এই নবায়নযোগ্য শক্তিগুলোর উৎসের মধ্যে রয়েছে সৌর শক্তি, বাতাস ও বায়োগ্যাস। চির শান্তির দেশ নরওয়ে তার পুরো শক্তির চাহিদা প্রায় নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে সরবরাহ করে থাকে। আইসল্যান্ডও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে তার শতকরা প্রায় ১১.৪ ভাগ আসে বায়ু শক্তি থেকে। ইউরোপের ডেনমার্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০৫০ সালে তাদের যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন তার সবটাই নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদন করবে।
সবুজ পৃথিবী সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানী (2)
পানি, বাতাস, আলো এরকম কতকিছুই শক্তির উৎস হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানির খাতগুলোকেই আজ ‘সবুজ জ্বালানি’ হিসেবে আলোচিত। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯% জ্বালানির সরবরাহ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আর বাকী চাহিদা মেটানো হয় তরল জ্বালানি, কয়লা এবং জলবিদ্যুৎ থেকে। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশভাগ মাত্র ০.৫%। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৫  সালের মধ্যে ৫% এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০% জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হবে। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি, ২০০৯ সালে অনুমোদন প্রদান করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানির কার্যকারিতা উন্নয়ন ও ব্যবহার বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে ১০ ডিসেম্বর ২০১২ সালে সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি আইন পাস করা হয়, যা ২০২০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ৫% থেকে ১০% এ উন্নীত করতে নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখবে।

সবুজ পৃথিবী সুরক্ষায়
গত কয়েক বছর ধরে সরকার, এনজিও, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশে সৌরশক্তি বা সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারে অনেক এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের যে সকল জনপদগুলো অফগ্রীড এলাকায় অবস্থিত সেসকল এলাকায় সোলারের ব্যবহারের মাত্রা দিনকে দিন এগিয়ে চলেছে। দেশে প্রতিমাসে প্রায় ৬৫ হাজার নতুন সোলার হোম সিস্টেম বসানো হচ্ছে, যার সুবিধা ভোগ করছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ। সম্প্রতি গ্রীন অফিস হিসেবে স্বীকৃতি পেল বাংলালিংক। ওয়াল্ড লাইফ ফান্ড ফর নেচারের (ডব্লিউডব্লিউএফ) একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা বন সংরক্ষণ ও পরিবেশের ওপর মানুষের বিরূপ প্রভাব কমাতে কাজ করে। মুঠোফোন অপারেটর বাংলালিংক ২০১৬ সালে ৪৪ শতাংশ কাগজের ব্যবহার কমিয়েছে এবং ১৯ শতাংশ অপচয় রোধ করেছে। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্টেশনারি দ্রব্য ব্যবহার করার পাশাপাশি একবার ব্যবহার করা যায় এমন দ্রব্যের ব্যবহার কমিয়েছে ৭৫ শতাংশ। যে কারণে ডব্লিউডব্লিউ কর্তৃক গ্রিন অফিস স্বীকৃতি পায় বাংলালিংক। তথ্যসুত্র-প্রথম আলো।

পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, বনজ সম্পদ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে অবশ্যই আমাদের জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যহারের মাত্রাকে কমাতে পারি। সবুজ পৃথিবী সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের বাংলালিংক এর মত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে নিতে হবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারিক মাত্রাকে কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাত্রাকে বৃদ্ধি করা হলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অবদান রাখবে, সুরক্ষিত হবে পরিবেশ, গড়ে উঠবে সবুজ পৃথিবী।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.