সাম্প্রতিক পোস্ট

লক্ষ্মী রানীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম

লক্ষ্মী রানীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম

সাতক্ষীরা থেকে চম্পা রানী মল্লিক

স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সুখ পাখিটি ধরতে কার না মন চায়! মন চায় সকলের। কিন্তু সবাই কি পারে? না! কেউ কেউ বৃথা চেষ্টাই করে মাত্র। জানে বৃথা, তবুও হারায়না আশা, তাই করে যায় সুখের জন্যে অনবরত প্রচেষ্টা। তেমনি একজন সফল সংগ্রামী নারী লক্ষ্মী রানী (৩৫)।

1 (1) (3)

উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ধল (হরিনগর) গ্রামে জন্ম নেওয়া লক্ষ্মীর বাবার ছিল অভাবের সংসার। তাই তার পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। বাবা মায়ের সাথে খাটাখাটনি করতে দিন চলতে থাকে তাঁর। সুখের আশায় বাবা দশ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে লক্ষ্মীকে বিয়ে দিলেন পাশের গ্রামের ফনির ছেলে শিশিরের সাথে। স্বামী শিশির ঠিকমত কাজ করতেন না। এভাবে চলতে চলতে সংসারে দুটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বেড়ে যায় সংসারে আরো চাপ। তব্ওু শিশিরের স্বভাবের কোন পরিবর্তন হয় না। মেয়ের সুখের কথা ভেবে এত কিছুর পরও লক্ষ্মীর বাবা তাদের সংসারে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাবা লক্ষ্মীকে বুঝিয়ে বলত, মা ধৈর্য্য ধরে স্বামীর সংসারে থাক, একদিন সুখ ফিরে আসবে। সবদিক বিবেচনা করে লক্ষ্মী সংসার নামক সম্পর্কের বেড়াজালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। তাই সবাইকে আপন ভেবে এবং স্বামীর দেওয়া কষ্টকে উপেক্ষা করে সংসারে টিকে থাকে। সংসারের সকল কাজ করার পাশাপাশি সবাইকে দেখাশুনাসহ বাড়িতে তিনি কিছু হাঁস, মুরগি ও ছাগল পালন শুরু করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ছিল না কোন বিশ্রাম। শুধু তাই নয়, অনেক রাত পর্যন্ত খেজুর পাতার পাটি বুনতেন। এভাবেই ঘুরতে থাকে জীবনের চাকা।

1 (2) (3)

একজন গ্রামীন নারী এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো কখনো যে তিনি নিজেও অসুস্থ হতে পারেন এটা তার সংসারের কেউ ভাবে না। তিনিও যে একজন মানুষ এবং তার প্রতিও যে সংসারের অন্যদের মানুষদের একটা দায়িত্ব আছে এই চিন্তা করা হয় না। আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে তখন, যখন একবেলা খাবার কম পড়ে, বড় কোন মাছ রান্না হলে, এবং অসুস্থ হলে। সংসারের একজন নারী পিছিয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সংসারে নারী বেশিক্ষণ শুয়ে থাকবে না এটা একটা উদাহরণ।

আজ থেকে ১৪ বছর আগে। তাদের দুই সন্তানের বয়স যখন ২ ও ৪ বছর তখন লক্ষ্মীর স্বামী কাজের কথা বলে বাইরে যান এবং একটি নারীকে বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করেন। এ খবর শুনে লক্ষ্মীর শশুর শোকে কিছুদিনের মধ্যে মারা যান। একদিকে শশুরের মৃত্যু অন্যদিকে স্বামী হারানোর বেদনায় নিজেকে টিকিয়ে রাখা আর যেন কোনভাবে তার জন্যে সম্ভব হচ্ছিল না। পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারছিলেন না। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মী সংসারের হাল ধরার জন্য দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। দুই সন্তান ও বৃদ্ধ শাশুড়িকে বাঁচাতে এই ছাড়া তাঁর আর কোন পথ ছিল না। মাত্র ১৫ শতক বসতভিটা ছাড়া আর কোন জমি তাদের নাই। সেখানে মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ করে পরিবারের কিছুটা চাহিদা পূরণ করেন।

1 (3) (2)

বর্তমানে ২ ছেলে ও বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন। পুরুষের মত বিভিন্ন কাজ করে আয় রোজগার করেন। মনের অদম্য সাহস দিয়ে জয় করে নিছেন সকল দুঃখ কষ্ট। দুর করেছেন সংসারের অভাব। হাসি ফুটিয়েছেন শাশুড়ি ও সন্তানদের মুখে।

সমাজে নারীদের জন্য লক্ষ্মী রানীর সংগ্রাম একটি উদাহরণ। সমাজ বা পরিবারে নারীদের নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। তাহলে সমাজে নারীরা উন্নয়নের মূলধারায় আরো ভালোভাবে যুক্ত হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: