সাম্প্রতিক পোস্ট

বৃক্ষপ্রেমিক কবিরাজ রাজ ও তাঁর মহতী উদ্যোগ

নেত্রকোনা থেকে রোখসানা রুমি

কবিরাজ মো. আব্দুল হামিদ ওরফে রাজ একজন কবিরাজ (৬২)। বৈচিত্র্যময় ঔষধি গাছকে কেন্দ্র করেই তাঁর সমূদয় জীবন ও জীবিকা প্রবাহিত। তিনি গাছেকে খুবই ভালোবাসেন। তিনি একজন প্রকৃত বৃক্ষ প্রেমিক। বৈচিত্র্যময় গাছ নিয়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন স্কুলে যান, শিক্ষার্থীদের সাথে গাছ নিয়ে কথা বলেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকাল ১০:০০টা পর্যন্ত তার সময় কাটে জেলা সার্কিট হাউজের বাগানে তাঁর গড়ে তোলা ঔষধি নার্সারিতে ঔষধি গাছের যতœ করে, নার্সারিতে কাজ শেষে বিকাল ৪:০০ টা পযর্ন্ত নেত্রকোনা জয়নগর মোড়ে ‘এফিফা ভেষজ ঔষধি নার্সারি’ ভেষজ ঔষধ বিক্রি করেন। ৪:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত আবার নার্সারিতে কাজ করে সন্ধ্যা ৬:০০ টা থেকে রাত ১০:০০ টা পযর্ন্ত দোকানে ভেষজ ঔষধের ব্যবসা করেন।

43
নতুন ঔষধি গাছ দেখলেই সেগুলো তিনি সংগ্রহ করে নার্সারিতে রোপণ করেন। ভেষজ ঔষধি গাছের গুরুত্ব ও উপকারীতা সম্পর্কে তিনি বর্তমান প্রজন্মকে সচেতন করতে এ বিষয়ে বিভিন্ন স্কুলে বক্তৃতানুষ্ঠান করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শত শত ঔষধি গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেন। চলতি বৃক্ষ রোপনের মৌসুমে তিনি নেত্রকোনার ৫০টি স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আগ্রহী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫০ হাজার ঔষধি গাছের চারা বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন স্কুলে ঘুরে শিক্ষার্থীদের সচেতন করছেন এবং গাছের চারা বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন।

গত ২৭ জুন ২০১৮ নেত্রকোনা সদর উপজেলার আব্বাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভেষজ ঔষধি গাছের গুরুত্ব, বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এগুলোর ব্যবহার ও উপকারীতা সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সাথে আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২০০টি ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করেছেন মো. আব্দুল হামিদ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঔষধি গাছের চারা বিতরণ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন আব্বাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও একজন সাদা মনের মানুষ আলী উসমান। আব্বাসিয়া স্কুলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০০ জন। এবং অনুষ্ঠানে প্রায় সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকই অংশগ্রহণ করেছেন। এ বছর স্কুলটির সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রত্যেকে একটি করে ফলদ ও একটি করে ঔষধি গাছের চারা রোপণের অঙ্গীকার করেছেন।

44
কবিরাজ আব্দুল হামিদ বলেন, “আমি নেত্রকোনার সকল এলাকা ঔষধি গাছ দিয়ে ভরে দেব। আমাদের প্রয়োজনে আমাদেরকে এসব ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিনামূল্যে আমি চারা দেব। আপনারা শুধু নিজ বাড়িতে সেগুলো নিয়ে রোপণ করবেন। সকলের বাড়িতে এসব ঔষধি গাছ থাকলে বিভিন্ন রোগ-বালাই এর চিকিৎসায় এগুলো সহজে পাওয়া যাবে”। প্রবীণ শিক্ষক রেজিয়া আক্তার বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে স্থানীয় জাতের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করতে হবে।” তিনি প্রত্যেক শিক্ষার্থদের আগামী ভাদ্র মাসে গ্রামের রাস্তায় রোপণের জন্য ২৪০০ তাল বীজ সংগ্রহ করার আহবান জানান।

ভেষজ ঔষধের নার্সারি ও ভেষধ ঔষধ বিক্রির আয় দিয়ে কবিরাজ আব্দুল হামিদ বড় মেয়েকে ইঞ্জিনিয়ার (বিএসসি) ও ছোট মেয়েকে ডাক্তারি পড়াচ্ছেন। এক ছেলে প্রাইমারী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পিতার সাথে ভেষজ নার্সারি ও ভেষজ ঔষধের ব্যবসা করে। ছোট ছেলে দশম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে।

45
কবিরাজ আব্দুল হামিদ পরিবেশ রক্ষায় এবং ভেষজ চিকিৎসায় একজন নিবেদিত প্রাণ। জেলা সার্কিট হাউজের বাগানে তাঁর ঔষধি নার্সারিতে প্রায় শতাধিক প্রজাতির ঔষধি গাছ রয়েছে। নার্সারিতে উৎপাদিত চারা তিনি কখনো বিক্রি করেন না। উৎপাদিত ভেষজ ঔষধ তিনি দোকানে বিক্রি করেন এবং গাছের চারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ও আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। কবিরাজ আব্দুল হামিদের মত বৃক্ষ প্রেমিক ও ঔষধি উদ্ভিদ সংরক্ষকের এহেন মহতী উদ্যোগের ফলে একদিন সত্যি সত্যি নেত্রকোনা ঔষধি উদ্ভিদে ভরে উঠবে এবং এলাকা বৃক্ষ ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি পরিবেশ হবে নির্মল।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: