সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন হেলেনা আক্তার এবং তার উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব চুলা

একজন হেলেনা আক্তার এবং তার উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব চুলা

নেত্রকোনা থেকে খাদিজা আক্তার

জ্বালানি সাশ্রয় চুলা তৈরির জন্য নিজ গ্রাম ছাড়িয়ে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন এসে ভিড় করে মইনপুর গ্রামের সাদা মনের মানুষ হেলেনা খাতুনের বাড়িতে। হেলেনা মইনপুর গ্রামের বাসিন্দা। ছোট বেলায় মা-খালার কাছ থেকে শিকা চুলা তৈরি শিখে তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে অন্যদের চুলা তৈরি করে দিয়ে সহায়তা করে আসছেন।

প্রতিবছর শুকনা মৌসুমে প্রায় শতাধিক চুলা তৈরি করে নিজ গ্রাম ছাড়াও অন্য গ্রামের নারীদের বিনামূল্যে দিয়ে থাকেন তিনি। এছাড়াও তিনি আগ্রহী নারীরেকে চুলা তৈরি করা শিখিয়ে থাকেন। এ সম্পর্কে স্থানীয় শিক্ষার্থী হাসনা আক্তার বলেন, “হেলেনা বেগমের চুলাগুলো দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি পরিবেশ ও জ্বালানি বান্ধব। তিনি চুলা তৈরির সময় লাকড়ি যাতে কম লাগে সেই সাথে হাঁড়িতে কম কালি হয় এবং কম কার্বন-ডাই অক্সাইড ছড়ায়, যাতে সেই কালি ও কার্বন নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চুলা তৈরি করেন।”

11
খুব ভালো ছাত্রী হওয়ার পরেও নিজের ইচ্ছার অমতে বাল্য বিবাহের শিকার হন হেলেনা। শিক্ষা জীবনে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া’র জীবনী যাকে সবসময় প্রেরণা যুগিয়েছে, সেই হেলেনা খাতুন নিজেই বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে পারিবারিক, সামাজিক ও পারিপার্শিকতার কারণে। বিয়ে হেলেনার জীবনে প্রধান বাধা হলেও ছেলে বেলা থেকে বেগম রোকেয়ার আদর্শে নিজের সামাজিক মুক্তি এবং সমাজ ও মানুষের জন্য কিছু করার, পারিবারিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে পড়ালেখার গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং বিয়ের পড় প্রথম সন্তান গর্ভাবস্থায় এসএসসি পাশ করেন, পরবর্তীতে সংসারের শত বাধা পেরিয়ে এইচএসসি ও বিএ পাস করেন। এ সম্পর্কে হেলেনো খাতুন বলেন, “এ শিক্ষা আমাকে আমার পরিবারের নিজের মত করে একটি স্থান তৈরি করে দিয়েছে, আমার পরিবারের অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখন আমি নিয়ে থাকি এবং সামাজিক বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারি।”
হেলেনা খাতুনের তিন সন্তান- দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তিন সন্তানই শিক্ষার্থী, বড় মেয়ে অনার্স পড়ছে, ছোট মেয়ে এস.এস.সি পরিক্ষার্থী, ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র।

অল্প বয়সে সন্তানের মা হয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সামাজিক অসমতাগুলো তিনি বুঝতে পারেন। গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মূল কারণ হিসেবে তিনি দিনের বেশির ভাগ সময় অস্বাস্থ্যকর রান্না ঘর ও চুলা থেকে অধিক পরিমাণ নির্গত ধোঁয়াকে দায়ি করেন। তাই তিনি এমনভাবে একটি চুলা তৈরি করেন যাতে, ধোঁয়া কম হয় ও জ্বালানি সাশ্রয়ী। সেই সাথে রান্নার বাসনপত্র এবং ঘরের চাল কালো ও নষ্ট না হয় না। হেলেনা তার নিপুন হাতের ছোয়াতে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে যে চুলাটি আবিষ্কার করেন তা ‘নৌকা চুলা’ নামে এলাকায় খবই পরিচিত।
সামাজিক অসমতা দূর করে দরিদ্র দলিত পরিবারগুলোর প্রতি সবসময় রয়েছে হেলেনার উদার দৃষ্টি। তিনি গ্রামের পাশে কলোনী পাড়ার হিন্দু ও মুচি পরিবারগুলোর সুখে দুঃখে তাদের পাশে ছুটে যান সহায্যের হাত বাড়িয়ে।

12
গ্রামের দরিদ্র নারীদের আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে যুক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাড়িতে হাঁস মুরগি পালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎসাহ প্রদানসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় আর্র্থিক সহায়তা করে থাকেন হেলেনা খাতুন। যে কোন সামাজিক কাজে উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এলাকার সকলের অতি পরিচিত ও প্রিয়। প্রতিবছর নিজ উদ্যোগে কিশোরীদের বিনোদনের জন্য গ্রামে বন ভোজন ও খেলাধুলার আয়োজন করে থাকেন। নিজ গ্রামের মানুষের বিভিন্ন রোগবালাই ও এর প্রতিকার/প্রতিরোধ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, প্রবীণদের স্বাক্ষর শেখানো, গ্রামের ছেলে-মেয়েদের স্কুলগামীকরণের জন অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করেন। গ্রামের শিশুদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের জন্য তিনি নিজ বাড়িতে ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র খুলে শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

সব কিছুকে ছাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলার জন্য হেলেনা এখন সকলের পরিচিত ও প্রিয় ব্যক্তি। প্রতিবছর আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক লোক হেলেনার চুলা তৈরি পদ্ধতি দেখার জন্য ছুটে আসেন তার বাড়িতে। ২০১৭ সালে বারসিক’র উদ্যোগে মালনী ঋষি পাড়ার দলিত ঋষি সম্প্রদায়ের নারীরা হেলেনা খাতুনের চুলা পরিদর্শন করে চুলা তৈরি ও ব্যবহার কৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। হেলেনা খাতুন তাদেরকে নৌকা চুলা তৈরির কৌশল শিখিয়ে দেন, এ চুলা মাটিতে গর্ত করে বা শুকনা মৌসুমে তোলা চুলা (স্থানান্তর/বহনযোগ্য) হিসেবে ব্যবহার করা যায়। চুলা তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে হেলেনা খাতুন বলেন,“নৌকা চুলা নিচের অংশ আগে তৈরি করে কিছুটা শক্ত হওয়ার পর উপরের অংশ তৈরি করতে হয়। চুলা মাঝের অংশ এবং উপরে হাড়ি বসানোর সময় আগুনের শিখা যাতে বাইরে না বের হতে পারে এবং কালিতে যাতে হাড়ি কালো না হয় সে বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি করতে হয়। এ চুলায় খুব কম লাকড়ি/পাতা ও ভূষি দিয়ে রান্না করা যায়।”

প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে গাছ কাটা ও নতুন নতুন একক পরিবার সৃষ্টির ফলে প্রতিবছর জ্বালানি সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। আগামী প্রজন্মের এ সংকট মোকাবেলায় তার চুলা তৈরির চর্চাটি যাতে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠে সেই লক্ষ্যে তিনি স্থানীয়ভাবে এ বছর ২০ জন নারী ও কিশোরীকে চুলা তৈরির পদ্ধতি হাতে কলমে শিখিয়েছেন ধলাই নদীর পাড়ে বসে। হেলেনা খাতুন শুধু এতেই ক্ষান্ত হননি, নিজের উদ্যোগে গ্রামে নারীদের জন্য আয়োজন করেন জ্বালানিবান্ধব চুলার প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতায় ১২ জন নারী মোট ৯ ধরণের মাটির তৈরি ৫০টির বেশি চুলা প্রদর্শন করে।

গ্রামের নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশ দূষণ রোধে জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলা তৈরি ও অন্যদের বিতরণ, গ্রামীণ নারীদের আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে উৎসাহিতকরণ এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করে নারীদের দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে হেলেনা খাতুনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান সমাজে হেলেনা খাতুনের মত উদ্যোগী নারী প্রতিটি গ্রামে খুবই প্রয়োজন। এসব হেলেনা খাতুনদেরকে তাদের অবদানের মর্যাদা প্রদান করা হলে তারা আরও উদ্যোগী হয়ে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। গ্রামের অন্য নারীরাও যদি হেলেনা খাতুনের ন্যায় পরিবার ও সমাজের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক আয়বৃদ্ধির জন্য সামর্থ অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করে তাহলে পরিবার ও সমাজে তাদের যেমন মর্যাদা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে তেমনি তাদের ক্ষমতায়ন হবে এবং তারা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: