Posted in

প্রতিভাবান ড্রামস বাদক আব্দুল বারী

নওগাঁ থেকে নজরুল ইসলাম তোফা 

পৃথিবীতে যুগে যুগে কিছু মানুষের সৃষ্টি হয়েছে, তাদের অধিকাংশই কোটি কোটি টাকায় ভোগ-বিলাস, ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি নিয়ে জীবন স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু এমন কিছু বিকল্প চিন্তা চেতনার মানুষকে খোঁজে পাওয়া যায়, জীবনে কোন কিছুর মোহ নেই, নেই ন্যুন্তম মনের ইচ্ছা পূরণের উচ্চাকাঙ্খা। জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার উদ্দেশ্য অতীব ক্ষীন। অর্থের লোভ না থাকলেও প্রয়োজন আছে পেটে ভাতে বেঁচে থাকার অধিকার। কিন্তু উপার্জনের আদৌ কোনোই পরিকল্পনা নেই, এমন একজন প্রতিভাবান, সরল, কোমল মনের ছোট্ট মানুষ, শুধুই দেখে রঙিন স্বপ্ন, চরম আশা আশঙ্কা মিউজিক নিয়ে। মিউজিক জগতে বহুগুণের অধিকারী মানুষটির রয়েছে সবাইকে অবাক করে দেওয়ার মতোই প্রতিভা। মিউজিকের প্রতি নেশাটা নিত্য দিনের জীবন সঙ্গী। নাম তার মো: আব্দুল বারী।

নওগাঁ জেলার মান্দা থানায় তেরো নম্বর কশর ইউনিয়নের পাঁজর ভাঙা গ্রামে নিজ পিতা-মাতা, সহধর্মিণীসহ এক পুত্র সন্তান নিয়ে তার বসবাস। গ্রামের সহজ, সরল মানুষের কাছে গান ও মিউজিক বাজানোটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ছেলে মেয়েরা তার কাছে মিউজিকের সঙ্গে কিভাবে গান করতে হয় তা শিখে নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তথা গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দর্শকদের বিনোদন দিয়ে থাকে। মিউজিক প্রেমী আব্দুল বারী তাদের সহযোগী হয়েই সকল অনুষ্ঠানে মিউজিক বাজায়। অনেক মিউজিক বাজাতে পারে। যেমন: হারমোনিয়াম, ড্রামস, কঙ্গো, জুড়ি, ফুলোট এবং আঁড় বাঁশি। তার মধ্যে ড্রামস মিউজিকই উপস্থিত দর্শকদের মাঝে বাজিয়ে বেশ আনন্দ পায়। তার প্রিয় মিউজিকসহ অন্যান্য মিউজিক নিয়ে নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বায়না যায়।

2017-03-12-19-51-31-062

তরুণ প্রজন্মের প্রতিভাবান তারুণ্যের প্রতীক, স্বল্পভাষী, মিউজিক ম্যান আব্দুল বারী অল্প বয়সেই জয় করেছেন অসংখ্য শ্রোতা ও দর্শকের হৃদয়। এখন তার বয়স প্রায় সাতাশ আটাশ হয়তো হবে। ছাত্র জীবনের শুরুতেই তার জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর আঁধার, পড়াশোনা হয়নি তার। সঙ্গীত, নৃত্য, বিভিন্ন মিউজিকের সাথে সখ্যতায় ছোটবেলা কাটে। নিজস্ব স্টাইল বজায় রেখে মিউজিক বাদ্যে আত্মবিশ্বাসের সাথেই কাজ করে। জেনে নিই এমন ছেলেটির করুন কাহিনীর আদ্যোপান্ত।

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই তার বেড়ে ওঠা নয়। বাবার নাম মো. কমর উদ্দিন শাহানা তিনি একজন গুণী মৌলবী। মা মোছা: মনোয়ার বেগম একজন পর্দাশীল গৃহিণী মহিলা। বাবা মিউজিক অনুরাগী না হলেও বংশে তার দাদা ছিল কবি গানের সরদার অর্থাৎ ছন্দের গায়ক। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত মো. আব্দুল বারীকে তার বাবা ধরে বেঁধে জোরপূর্বক লেখাপড়া শেখাতে পেরেছেন। পরিবারের কেউ ভাবেনি তিনি প্রফেশনালি ড্রামস বাদক হয়ে লেখাপড়ার পাঠ চুকে দিবেন। ইচ্ছে ছিল ছেলে বড় হয়ে সমাজের আর দশটা ছেলেদের মতো চাকরি করবেন। কিন্তু বাল্য বয়সে মস্তিষ্কের কোষে কোষে গেঁথে গেল যাত্রা দলের গান, যাত্রার নৃত্য এবং যাত্রার মিউজিক। সব কিছু ছাপিয়ে যাত্রার যে ড্রামস মিউজিক তা নিয়ে মাতিয়ে তোলেন মন্ত্রমুগ্ধ বাদ্যের ঢংঙে।

তরুণ বয়সে নিজ গ্রামের স্কুলে প্রতি বছর যাত্রা নাটকে নারী চরিত্রের পাঠ গাওয়া ও নাচনেওয়ালী মেয়ে নিয়ে আসতো। আব্দুল বারী শৈশব থেকেই তাদের সঙ্গে একই ভঙ্গিতে নাচনেওয়ালী সঙ্গে নাচতো এবং দর্শক নারী-পুরুষের নৃত্যে বেশ মজা নিতো। গায়ক হিসেবে তার পরিচয় যতটা না ছিল তারচেয়ে নাচ ও মিউজিক বাজানোর পরিচিতি অনেক উর্ধ্বে ছিল। মিউজিক বাজানো অভিজ্ঞতা তার দেখে দেখে শেখা। তেমন কোন উস্তাদ গুরু ছিলো না, বলতে গেলে নিজস্ব প্রতিভা তার। তবে বাড়ির পাশে একজন দক্ষ প্রবীণ ব্যক্তি উত্তর খুব সুন্দর হারমোনিয়াম ও অর্গান বাজাতো। তার সঙ্গে আব্দুল বারীর উঠা বসা হতো। উত্তম নামের ব্যক্তি এমন প্রতিভা দেখে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেত। বলা যায় অল্প বয়সে কচি মেধার ছেলেটিকে এমনভাবে সঙ্গে না নিয়ে ঘুরলে হয়তো জীবনে শিক্ষা-দিক্ষার দ্বার প্রান্তে পৌঁছাতে পারতো না।

আব্দুল বারী কাঁচা বুদ্ধিতে উত্তমের সঙ্গী সাথী হয়ে দূরদূরান্তের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতো এবং বিভিন্ন মিউজিক বাজিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিত। আর এসব কারণেই শ্রী উত্তম কুমার প্রয়োজনের তাগিদে মো. আব্দুল বারীকে ব্যবহার করতো। ব্যতিক্রম চিন্তা ধারার ছোট্ট ছেলেটি উত্তমের ডাকে স্কুল ফাঁকি দিয়ে বিয়ে-বাদি, কিচ্ছা-কাহিনী, যাত্রা-পাটি এবং স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে নৃত্য করা ও মিউজিক বাজানোর কাজে দূরদূরান্তে চলে যেতো। স্কুল শিক্ষক তার বাবাকে জানালেন আপনার ছেলে স্কুলে আসেনা। স্কুল কর্তৃপক্ষ এমন অনিয়মিত ছাত্র। বাবা নিরুপায় হয়ে ছেলেকে নিয়ে কি করবেন? পরে চিন্তা করে স্থির করলেন চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে একটি ছেলে হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি  হলে মন্দা হয় না। যথারীতি সেখানে আব্দুল বারীকে ভর্তি করিয়েও মিউজিক বাজানোর পোকা থেকে সরাতে পারেননি। মনে ভর করে থাকা ড্রামস মিউজিক, তাই ড্রামস ভেবে মো. আব্দুল বারী বাজিয়ে ফেলতো ওজুর বদনা, পানির কলস এবং  খাবার প্লেট-বাটি। ছাত্রদের কাছে বাজিয়ে আনন্দ করতো এবং নাচতো। প্রতিদিনের এমন আচরণে তার উস্তাদ চরম বেত্রাঘাত করলে সেখান থেকে বাড়ি পালিয়ে আসে। দু’তিন বার পাঠিয়েও তাকে মনস্থির করাতে পারেনি।

 2017-03-12-19-36-52-567

আব্দুল বারী অল্প সময়ের মধ্যে যাত্রা দলের মেয়েদের নৃত্য গুরু হয়ে উঠে। সেখানেই থাকতে থাকতে যাত্রার সব মিউজিক যন্ত্র বাজনো পুঙ্খানুপুংখ শিখে ফেলে। বিশেষ করে যাত্রার মিউজিকের মধ্যে ড্রামস বাজানোর পারদর্শীকতায় অতুলনীয় ছিল। যেখানেই যাত্রাদল ভাড়া যেতো সেখানেই মেয়েদের সঙ্গে চলে যেতো। কারণ তাদের গুরু ড্রামস না বাজালে মেয়েরা নাকি নাচতে পারতো না। এমন প্রতিভাবান ছেলের সন্ধান অনেক খোঁজাখুঁজি পর মিলে। বাড়িতে জোর করে ধরে এনেও এ জগৎ থেকে তাকে সরিয়ে রাখতে পারেননি তার বাবা।

মো. আব্দুল বারী প্রতিভাবান। মিউজিক মিশ্রণ করে শ্রুতিমধুর বাদ্যে বাজিয়ে তিনি শ্রোতা, দর্শনের মন জয় করেছেন। প্রশিক্ষণ পেলে তিনি এই কাজে আর পারদর্শী হবেন। কোন সুহৃদ ব্যক্তির সান্নিধ্য ও সহযোগিতা পেলে মো. আব্দুল বারী আরও সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।

 

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.