সাম্প্রতিক পোস্ট

আদিবাসী মাতৃভাষার স্বপ্নবীজ

:: মো. এরশাদ আলী, গবেষক লেখক::

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী শিক্ষার্থী, ভাষা গবেষক, সাংবাদিক, সমাজ নেতৃত্ব পর্যায়ের অধিবাসীদের অব্যক্ত কথা এবং স্বপ্ন নিয়ে নিন্মের লেখাটি তৈরি হয়েছে:

বৃহৎ জাতির পরিমন্ডলে বিশেষ করে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষায় কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি বাংলাদেশের প্রচলিত জীবনাচরণ ও সংষ্কৃতির কোন উপাদানের সাথেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংষ্কৃতির কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। একেবারে ভিন্ন স্বকীয়তা নিয়ে আদিবাসীদের অবস্থান বাংলাদেশে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা পোশাক আশাক, ভাষার ক্ষেত্রে রয়েছে নিজস্বতা, রয়েছে নিজস্ব প্রথা, আইন কানুন যা পূর্বেও যেমন ছিল এখনও সেই স্বকীয়তা নিয়ে টিকে রয়েছে। আদিবাসী শব্দ ভান্ডার থেকে ক্রমে শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। মূলত পরিবেশ-প্রতিবেশ ও সংষ্কৃতির মিথস্ক্রিয়াই এর জন্য দায়ী। প্রেক্ষাপটে যুক্তিটা হচ্ছে আদিবাসী মাতৃভাষা রক্ষার জন্য, চর্চার জন্য, উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা সরকারিভাবে যথাপোযুক্ত কোন ব্যবস্থা অতীতে সেভাবে নেওয়া হয়নি। বর্তমানেও ধীর গতিতে এর উন্নয়ন এগিয়ে যাচ্ছে।

বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রভাবিত সংষ্কৃতির বলয়ের মধ্যে এবং তাদের সাথে বসবাস, চাষবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা গ্রহণসহ দৈনন্দিন সকল কার্যক্রমসহ প্রচলিত রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে আদিবাসীদের নিজস্ব মাতৃভাষা দিন দিন তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক আদিবাসীরই নিজেদের ভাষা ও বর্ণমালা থাকা স্বত্ত্বেও চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ভাষা গবেষক খেই সু প্রু (খোকা) মারমার ভাষ্য মতে, সুদুর অতীতকাল থেকেই আদিবাসীদের নিজেদের ভাষায় শিশু শিক্ষা লাভের জন্য কোন ব্যবস্থা ছিল না। যদিওবা ধর্মীয় উপাসানলায় ভিত্তিক কিছু চর্চা বিদ্যমান ছিল কিন্তু সেটা ছিল শুধুমাত্র ধর্ম চর্চা ও লালন-পালনের জন্য। উপাসনালয় ভিত্তিক এই চর্চা ছেলেদের মধ্যেই বেশি দেখা যেত। সুদূর অতীতকাল থেকেই মেয়েদের ধমীর্য় উপাসনালয়ে গিয়ে ভাষা শিক্ষা করার অধিকার বা পারিবারিক ইচ্ছা তেমন ছিল না আর বর্তমানে তো সেটা সম্ভবই নয়। তাই দেখা যায় যেটুকু ভাষা চর্চার আগ্রহ দেখা গেছে তাও ছেলেদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেপ্রু চাই মারমা বাবু বলেন, ‘আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, রয়েছে বর্ণমালা। ক্ষেত্রবিশেষে আমরা আমাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশুনার করতে চাইলেও তা করতে পারি না বা করতে চাই না। কারণ আমরা ছোটবেলা থেকে যদি বাংলায় অভ্যস্ত না হতে পারি তবে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশুনা করতে পারবো না’। সারাদিনে ধরে নিচ্ছি আদিবাসী একজন শিশু ১০০টি শব্দ ব্যবহার করে সেখানে অন্ততঃ ৪০টি শব্দও যদি তার নিজের ভাষায় ব্যবহার করতো তবে মনে হয় আদিবাসী ভাষাগুলো টিকে থাকতো। এভাবেই নিজেদের ভাষার চর্চা বাড়ানোর প্রতি জোড় দিয়ে এই কথাগুলো বলছিলেন বান্দরবান সরকারি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লালচুং বম। রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে প্রত্যেকটি আদিবাসী শিক্ষার্থীকেই বেশ কষ্ট করতে হয়। খুব কষ্ট করেই বাংলা শিখতে হয়। কষ্ট করে যেন অনুজদের বাংলা শিখতে না হয় সেই ক্ষেত্রে রেপ্রু চাই মারমা বাবুর পরামর্শ হলো- প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদিবাসী বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক। ফলে নিয়োগকৃত এলাকার ছাত্ররা অনেকাংশেই ভালো করবে কারণ তারা বাংলায় পড়তে ভাষাগত দূর্বলতায় ভোগলে তা ওই শিক্ষকের কাছে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে পারে খুব সহজেই। পরে ওই শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে সহজেই সেই বাচ্চাটি বাংলাকে রপ্ত করে ফেলতে পারবে।

রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাস বাংলা এবং ক্ষেত্রবিশেষ ইংরেজি মাধ্যম হওয়ার কারণে কষ্ট হলেও আদিবাসী বাচ্চারা রাষ্ট্রীয় সিলেবাস রপ্ত করে নিচ্ছে। বাংলা রপ্ত এমনভাবেই করছে যে এখন আর নিজের ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করার পরে দেখা যাচ্ছে অনেকেই তা বুঝতে পারছে না। ঠিক একইভাবে দেখা যায় জন্মের পর থেকে নিজের ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত হওয়ায় হঠাৎ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলায় শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে, বাংলা বুঝতে না পেরে অনেকেই পড়াশুনা ছেড়ে দিচ্ছে। বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে তা আদিবাসী শিশুদের উপযোগী নয়। তবে ভালো লাগার খবরটা হলো সরকার ‘শিশু শিক্ষা আইন ২০১৪’ পাস করেছে যেখানে আদিবাসীদের বহুভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সিলেবাসগুলো এমনভাবে তৈরি হচ্ছে তা যেন মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে হয়। এই আইনে আরও বলা হয়েছে আদিবাসী এলাকার জন্য আলাদা বই তৈরি করা হবে এবং এর পাশাপাশি নিজস্ব ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।

যে সব আদিবাসী শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব এলাকায় পড়াশুনা করছে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং তারা নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষাও শিখছে। পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে একসাথে বসবাস করতে করতে তারা অন্য ভাষা যেমন বাংলা, ইংরেজি এবং অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষায়ও পারদর্শী হচ্ছে। কিন্তু যে সব আদিবাসী ছেলেমেয়ে ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনা বা অন্য কোন কারণে সম্প্রদায়ের বাইরে বিশেষ করে শহরে চলে আসছে ,তারা একটা পর্যায় গিয়ে বাংলা, ইংরেজি এবং অল্প পরিমাণে নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছে। এর বড় কারণ শহরে যাদের সাথে বসবাস করছে তারা বাংলায় কথা বলছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় অধিক পরিমাণে ইংরেজি এর ব্যবহারের ফলে এই দুই ভাষায় পারদর্শী হয়ে যাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নিজের ভাষায় কথা বলার মানুষের অভাবে নিজের ভাষা ভূলে যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র পাই মং মারমা বাবু ভাষার আগ্রাসন প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যারা পড়াশুনা বা অন্য কোন কারণে দীর্ঘদিন হলো শহরে বসবাস করছি তাদের ক্ষেত্রে ভাষার আগ্রাসন বেশি দেখা দিচ্ছে। নিজের ভাষায় কথা বলা বা ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পায় না। বুঝে উঠতে পারি না কোন শব্দ ব্যবহার করবো।” আদিবাসী পরিবারগুলোতে বাংলার প্রভাব এমন পর্যায়ে চলে গেছে এখন আদিবাসী বাবা মা তাদের সন্তানদের নাম বাংলা সংষ্কৃতির সাথে মিল করে রাখছে। যদিও এই সংখ্যা খুব বেশি না তবে সার্টিফিকেট থেকেও আদিবাসী নাম হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। ভাষা গবেষক খেই সু প্রু (খোকা) মারমার প্রাথমিক গবেষণায় উঠে এসেছে, যে সব আদিবাসী ছেলে বা মেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বাব-মা’র কাছে থেকে পড়াশুনা করেছে তাদের শব্দ ভান্ডারে মাতৃভাষার শব্দ ভান্ডার বেশি। যত উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে যাচ্ছে, অন্য ভাষার সাথে সংমিশ্রণ ঘটছে তত বেশি মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। খোকা মারমার সাথে তাল মিলিয়ে খুমিদের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট লেলুং খুমি বলেন, আদিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনাচরণ, সংষ্কৃতি, ধর্মীয়বিধি ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব গিয়ে পড়েছে আদিবাসীদের শব্দ ভান্ডারেও। তবে এই প্রভাব শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামে কম পরিলক্ষিত হয়।

ভাষার সাথে বাজার ব্যবস্থা বা দেশের অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ জ্যোতি চাকমা বলেন, যে ভাষায় কথা ও কাজ করলে আয় হবে বা জীবনযাপনের পথ সুন্দর হবে মানুষ সেই ভাষার প্রতি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। এই ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষাগুলো পিছিয়ে পড়ছে। আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থায় যারা বেশি ভালো বাংলা ও ইংরেজি জানে তারা চাকরি কিংবা অর্থনৈতিক অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হচ্ছে বেশি।” অর্থ্যাৎ দেখা যাচ্ছে ভালো বাংলা বা ইংরেজি জানা আদিবাসীরা অন্যান্যদের থেকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকছে। প্রসঙ্গক্রমে পাই মং বাবু বলেন, আমরা যারা শহরে বসবাস করি এবং নিজের কর্মজীবন নিয়ে বেশি ভাবি তারা বাংলাদেশে খুব বেশি চল আছে এমন ভাষায় নিজেকে রপ্ত করে তুলছি কারণ আমরা নিজের ভাষার থেকে কর্মজীবনকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করছি।” বর্তমানে শহরে বাস করে এমন আদিবাসী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে কোন বিদেশি ভাষার মিশ্রণ না করে শুদ্ধভাবে মাতৃভাষার চর্চা করছে। বর্তমান সময় মানুষ খুব বেশি প্রভাবিত হয় মিডিয়ার দ্বারা। বাংলদেশের বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তুলনায় আদিবাসীদের ভাষা খুব কম ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো যদিও চেষ্টা করে আদিবাসীদের ভাষা ও সংষ্কৃতি রক্ষার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান, গবেষণাধর্মী লেখা ও অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য কিন্তু মালিকানা এবং সংখ্যাধিক্য বাঙালি থাকার কারণে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে অনুষ্ঠানগুলো প্রচার হয় না। এক্ষেত্রে অনেকের মতো পাই মং মারমা বাবুর দাবি, আদিবাসীদের ভাষা সমৃদ্ধ করার জন্য আদিবাসীবান্ধব মিডিয়া চালু করা উচিত। আদিবাসীদেরকে একটা প্লাটফর্ম দেওয়া উচিত যেখানে তারা নিজেদের অংশগ্রহণে নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠান তৈরি ও প্রচার করবে।

পাশাপাশি দু’টি সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে একসাথে বসবাস করতে থাকলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই এক ধরনের মিথষ্ক্রিয়া হবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। ভাষার মিথষ্ক্রিয়াও এর বাইরে নয়। তবে জনসংখ্যায় বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এমনটি কম ঘটেছে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে দেখা যায় বড় সম্প্রদায় সাধারণত ছোটদের উপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করে পরিবর্তনের জন্য। পার্বত্য জেলার প্রেক্ষাপটে চাকমা, মারমা এবং বম ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের ভাষায় তেমন কোন মিশ্রণ ঘটেনি বরং তাদের ভাষা অন্য ছোট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষায় মিশে যাচ্ছে। মারমা ভাষার মিশ্রণ প্রসঙ্গে রেপ্রু চাই মারমা বাবু তার মতামত প্রদান করে বলেন, মারমা ভাষায় অন্য সংষ্কৃতিক প্রভাব কিছুটা কম তবে আধুনিক যুগের বিভিন্ন প্রভাবে যেমন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনি মিডিয়া, আকাশ সংষ্কৃতির প্রভাবের কারণে নিজস্ব সংষ্কৃতির মধ্যে বিজাতীয় সংষ্কৃতির মিশ্রণ ঘটে যাচ্ছে। তবে এটাও ঠিক যে, আমাদের জানার পরিমাণটাও বাড়ছে। আমরা নিজের ভাষার পাশাপাশি প্রয়োজনের তাগিদে যখন বাংলা অথবা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করছি তখন আমাদের অজান্তেই বা ব্যবহারের আধিক্যের কারণেই নিজের ভাষায় বাংলা ও ইংরেজি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে। এই ধরনের মিশ্রণ বেশি দেখা যাচ্ছে যারা পড়াশুনা বা অন্য কারণে শহরে বসবাস করে তাদের মধ্যে। অন্যদিকে যারা গ্রামে বসবাস করে তাদের মধ্যে বাংলা বা ইংরেজির চেয়ে পার্শ্ববর্তী সম্প্রদায়ের ভাষার একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে কিছু অব্যয় শব্দ যেমন সুতরাং, এবং, তথাপি এই ধরনের শব্দ আলাদাভাবে মারমা ভাষায় অন্যভাবে ব্যবহার হয় না। এ প্রসঙ্গে একটু ভিন্নভাবে মতামত তুলে ধরেন সিংপ্রাত ম্রো, পাশাপাশি বসবাস বা ব্যবসার জন্য বাঙালিরাও ম্রো ভাষা রপ্ত করছে। ক্রামাদি ম্রো পাড়ায় আসা-যাওয়া করে এমন অনেক বাঙালির শব্দ ভান্ডারেও ম্রো ভাষা ঢুকে যাচ্ছে। আবার একইভাবে ম্রোদের ভাষায়ও বাংলা শব্দ ঢুকে যাচ্ছে।”

অন্যান্য ভাষাভাষি (বাঙালি ভাষাভাষি) জাতিগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এর ফলে আদিবাসী এলাকার নাম এর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অর্থ্যাৎ নামের ক্ষেত্রে বাঙালিকরণ হচ্ছে প্রতিনিয়তই। তবে এই বাঙালিকরণটা জোর করেই হচ্ছে এমন নয়। আদিবাসীরা যেহেতু বাংলা খুব একটা বুঝতে বা বলতে পারে না ফলে বাজারে বা বাইরে কোথাও গিয়ে এলাকার নাম বা নিজের পরিচয় ভাঙা বাংলা ভাষায় দেবার সময় অন্যরা বিশেষ করে বাঙালি বাবুরা অপভ্রংশকেই নিজের মতো করে নামগুলো উচ্চারণ করে নেয়। বাংলাদেশে বসবাস করে বাংলা ভাষা না জানলে জীবনই চলবে না। আর তাছাড়া বাইরে গিয়ে নিজেদের ভাষায় কোন শব্দ উচ্চারণ করলে বাঙালিরা আমাদেরকে হেয় করে দেখে। অনেকটা আক্ষেপের স্বরেই এই কথাগুলো বলছিলেন গোংগুড়া মধ্যম পাড়ার চিং মাং খিয়াং। নাম বা স্থানের পরিবর্তনের আরেকটি সাধারণ কারণ হিসেবে গবেষণাটিতে উঠে এসেছে তা হলো বিজাতীয় আকাশ সংষ্কৃতি।

তবে স্থানের এবং মানুষের নামের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধর্মও একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা মত প্রকাশ করে বলেন, কোন কোন আদিবাসী প্রথমে সনাতন ধর্মলম্বী ছিলেন তখন তাদের নামকরণগুলো ছিল হিন্দু ধর্মানুসারে। পরবর্তীতে বিভিন্ন পালাবদলে সেই আদিবাসীদের মধ্যে কেউ খ্রীস্টান হয়েছে ফলে তাদের নামের ক্ষেত্রেও খ্রীস্টানাইজেসন ঘটেছে।” পাশাপাশি পরিবেশগত একটি বিষয় সামনে নিয়ে আসেন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ভাষা গবেষক সত্যহা পাঞ্জি ত্রিপুরা। তিনি বলেন, আমার ছোট বেলায় আমার চারপাশে যে সব প্রকৃতির উপাদান দেখেছি। বাবার সাথে জুমে যাওয়ার পথে যে সব গাছ, পশু পাখি দেখেছি তা এখন আর দেখা যায় না। একটি উপাদান না দেখা গেলে বা দীর্ঘ দিন ঐ উপাদানটি সম্প্রদায়ের সংর্স্পশে না থাকলে সেই উপাদনটির নাম ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।” এ প্রসঙ্গে আরও একটি সমসাময়িক উদাহারণ তুলে ধরা যেতে পারে। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা যখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে তখন তাদের বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত ড্রেসটি পরে যেতে হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে যে ঐতিহ্যবাহী ড্রেসটির সাথে সে পরিচিত ছিল সেটি আর পড়তে পারছে না। এভাবে ঐ নির্দিষ্ট ড্রেসটি হয়তো একসময় তার ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাবে। এমনকি নামও হারিয়ে যেতে পারে। অর্থ্যাৎ বলা যায় নির্দিষ্ট ভাষা থেকে নির্দিষ্ট নামটিও হারিয়ে যায়। সত্যহা পাঞ্জি ত্রিপুরা নিজ ভাষায় অন্য ভাষার প্রভাব সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেন। তার মতে ‘প্রভাবটা হলো এমন যে বান্দরবানের সবচেয়ে জনসংখ্যা বেশি মারমাদের। সুতরাং সবচেয়ে বেশি সংখ্যক জনগোষ্ঠীর লোকজনের সাথে দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য অপেক্ষাকৃত কম জনসংখ্যার আদিবাসীদের সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা রপ্ত করতে হচ্ছে। আবার যখন বাঙালিরা অত্র এলাকাতে অনুপ্রবেশ করতে লাগলো তাদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যসহ অন্যান্য কাজ এবং পাশাপাশি সরকারি সকল কাজ করার জন্য বাংলাটাও শিখতে শুরু করলো আদিবাসীরা। এভাবেও দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো ভাষার চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের ভাষায় বড় ধরনের একটা মিশ্রণ ঘটে যাচ্ছে’। গোংগুড়া মধ্যম পাড়ার চিং মাং খিয়াং এর মতো সকল আদিবাসীরই হয়তো খারাপ লাগে যখন অফিস আদালতে গিয়ে নিজের ভাষায় মত প্রকাশ বা ভাব প্রকাশ করতে না পেরে সঠিক বিচার বা সুবিধা পায় না। তখন তাদের মনে হয় যদি এখানে আমাদের সম্প্রদায়ের কেউ থাকতো তবে সহজেই নিজের কথাগুলো বলতে পারতাম।

আদিবাসী ভাষার উন্নয়নের জন্য সরকার যে সকল পদক্ষেপ নিচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। একজন পাহাড়ের আদিবাসী রেপ্রু চাই মারমা বাবু এর মতো সকল আদিবাসীরাই স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন শিক্ষার জন্য যেমন বিভিন্ন বোর্ড (যেমন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড) বোর্ড গঠন করেছে ঠিক তেমনি আদিবাসী ভাষা বা শিক্ষার জন্য আলাদা আদিবাসী শিক্ষা বোর্ড গঠন করবে। বৌদ্ধ ধর্মালম্বী আদিবাসীদের প্যাগোডোতে নিজ নিজ ভাষায় পড়াশুনা ও চর্চার ব্যবস্থা চালু হয়েছে বা হচ্ছে। প্যাগোডার পুরোহিতরা নিজস্ব মাতৃভাষা রক্ষার জন্য কাজ শুরু করেছে প্যাগোডো ভিত্তিক এই কার্যক্রম মাতৃভাষা উন্নয়নে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয়। পাহাড়ের সকল আদিবাসীই স্বপ্ন দেখে পার্বত্য শান্তি চুক্তির যে দাবিগুলো ছিলো সেগুলো বাস্তবায়িত হলে ওই এলাকার মাতৃভাষায় শিক্ষার স্বপ্নটাও বাস্তবায়িত হবে; তা আশাই করা যায়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: