সাম্প্রতিক পোস্ট

দেবী! তুমি সর্বভুতে

দেবী! তুমি সর্বভুতে

সিলভানুস লামিন

ভূমিকা
সন্তান লালন পালন, পরিবারের সদস্যদের সার্বিক দেখভাল, রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালির অনেক কাজই নারী একা সম্পাদন করেন। পারিবারিক ব্যবস্থাপনার কাজটি নারীরা অত্যন্ত সুনিপুনভাবে সম্পাদন করেন। এটি একটি বড় দায়িত্বও বটে। অথচ এই মহান দায়িত্ব ছাড়াও নারীদের আরও বর্ধিত কিছু দায়িত্ব পালন করে যেতে হয় নিরন্তরভাবে। এসব বর্ধিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নারীরা অর্থনীতিতে, পরিবেশ সুরক্ষায় ও পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রেখে চলেছেন। বিশ্বের কমবেশি প্রায় প্রতিটি দেশেই নারীরা খাদ্য উৎপাদন, পশু পালন ও পরিচর্যা, পরিবারের জন্য খাদ্য, পানীয় ও জ্বালানি যোগান দেওয়া, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করেন, গৃহস্থালীর বিভিন্ন কাজ সম্পাদন এবং সন্তান ও বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন ও দেখভালের মাধ্যমে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। এভাবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নারীরা তাদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পাদন করে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

বর্তমান এই লেখাটি নারীদের সেই বর্ধিত কাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

খাদ্য উৎপাদক
উন্নয়নশীল দেশে বেশির ভাগ নারীই খাদ্য উৎপাদন করেন। বলা যায়, পৃথিবীর অর্ধেক খাদ্যের উৎপাদক হচ্ছেন নারী। Female Farmers-1প্রাত্যহিক কাজের অংশ হিসেবে নারীরা খাদ্য-শস্য ব্যবস্থাপনা এবং গৃহপালিত পশু পালনের সঙ্গে জড়িত। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, নারীর হাত ধরে কৃষির আর্বিভাব ঘটে। বৈচিত্র্যময় শস্য-ফসল আবাদের মাধ্যমে নারীরা কৃষিক্ষেত্রে শুধু বৈচিত্র্যই নিয়ে আসেনি বরং মানুষের স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্যব্যবস্থারও সূচনা করে। নারীরা তাদের লোকায়ত জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে জৈব কৃষি পরিচালনা করে। আইএলও’র, ২০১০ সালের পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে ৬০৮ মিলিয়ন পুরুষের পাশাপাশি ৪২৮ মিলিয়ন নারী কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত। নারীরা বীজ সংরক্ষণ করে, অচাষকৃত উদ্ভিদের যতœ করে, পরিবারের জ্বালানি সংগ্রহ করে, পশুপালন করে, সন্তান লালন-পালনসহ নানান কাজের সাথে জড়িত থেকে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা পালন করেন।

বীজ সংরক্ষক
আমরা জানি আধুনিক কৃষির আবির্ভাবের পর থেকে বাজারে বিভিন্ন প্যাকেটে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়।20170926_115420কৃষকদের নানাভাবে ফুসলিয়ে, লোভ দেখিয়ে এসব বীজে চাষাবাদ করার জন্য অনুপ্রাণীত করা হয় এবং কৃষকরা এক সময় এসব বীজে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এসব বীজে চাষাবাদ করা হলে পরবর্তী বছরের জন্য বীজ সংরক্ষণ করা যায় না বলে বীজের ওপর কৃষকের যে অধিকার সেটি স্বাভাবিকভাবেই হাতছাড়া হয়। কিন্তু গ্রামীণ জীবনে এমন অনেক নারী রয়েছেন যারা বাজারের এসব বীজের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে অবিরামভাবে বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছেন। স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চার মাধ্যমে তাঁরা শুধু কৃষিবীজ সংরক্ষণই করেননি বরং পরিবেশ-প্রতিবেশকে সুরক্ষা করেছেন কৃষিক্ষেতে রাসায়নিক সার, বিষ ও কীটনাশক ব্যবহার না করে।

প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা শাকসবজি সংগ্রাহক ও যত্নকারী 
গ্রামীণ জীবনে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা কুড়িয়ে পাওয়া শাকসবজির ওপর নির্ভর করেন। যাঁরা কুড়িয়ে

Female Farmers-4পাওয়া শাক-সবজির ওপর নির্ভর করেন তারা জানেন কীভাবে এসব শাকসবজি যত্ন নিতে হয়; কীভাবে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মাঠ-ঘাট-জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা অচাষকৃত এসব উদ্ভিদগুলোকে সংরক্ষণ ও বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে নারীরা প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে রেখেছেন বড় ভূমিকা। নারীরা মাঠ-ঘাট জঙ্গল থেকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের শাকসবজির লতাপাতা সংগ্রহ করেন। খুড়াকাটা, খুরি, এলেঞ্চা, পালই, খেতাবুরি, কলম, বৈথা, কচু, ঢেকী, লাউ, কুমরা, দলকলস, বেহুর গুডা, নিমপাতা, সজনা, হিজগাডু, আলু, চুকাই, মেদী, মানকচু, দুধকলস এরকম অনেক জাতের শাকসবজি সংগ্রহ করেন। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হচ্ছে নানাভাবে।

ঔষধি গাছ-গাছড়া সংরক্ষক ও ব্যবহারকারী
আমাদের চারপাশে জন্মানো প্রত্যেকটি বিভিন্ন বনজ গাছেরই রয়েছে ঔষুধি গুণ। স্মরাণাতীতকাল থেকে মানুষ গাছের এই গুণাগুণ উদ্ভাবন করেছে এবং বিভিন্ন রোগবালাই নিরাময়ের জন্য এগুলোকে ‘পথ্য’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। গাবুরার লবনাক্ত পরিবেশে ফরিদার উদ্যোগ (3)ওই সময় থেকে বিভিন্ন গাছের ফুল, ফল, ছাল, পাতা, মূল, শেকড় প্রভৃতি অংশ বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকে এই ভেষজ চিকিৎসা ধরে রেখেছেন এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। লোকায়ত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এখনও অনেক নারী লোকজ চিকিৎসা প্রদান করে যাচ্ছেন। তাঁরা তুলসি, ক্ষুদক্যাইসে, থানকুনি, কুলাফিনারি, বাওলা, পেপুল, কলমিলতা, নিম, দুঃখেলতা, শংখুনিলতা জহরবাত, আদাবেরুন উদ্ভিদ ব্যবহার করেন মানুষ ও পশুর রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করেন। যেকোনও রোগের চিকিৎসায় রোগ নির্ণয়, গাছ নির্বাচন, পরিমাণ, মাত্রা, পরিচর্যা এবং গাছের ওপর অগাধ বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই বিশ্বাস নারীদের রয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী পেশার ধারক ও বাহক
আমাদের দেশে এমনও অনেকে আছেন যারা হাজারো কষ্ট-বেদনা, অভাব-অনটনের মাঝেও বাপ-দাদার আমলের পেশাকে ধরে রেখেছেন। picঐহিত্যবাহী এসব পেশা টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে এসব মানুষ কেবল জীবিকার্জনই শুধু করছেন না; সাথে সাথে পরিবেশ, অর্থনীতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ পেশা সংস্কৃতির সুরক্ষা ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কোন কোন নারী বাঁশ বেতের আদিপেশা, কোন কোন নারী সরিষার ঘানি টানার আদিপেশা, কোন কোন নারী সেলাইয়ের আদিপেশা, কোন কোন নারী স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চার আদিপেশা এখনও টিকিয়ে রেখেছেন। এভাবে বৈচিত্র্যময় শস্য-ফসল আবাদের মাধ্যমে নারীরা কৃষিক্ষেত্রে শুধু বৈচিত্র্যই নিয়ে আসেনি বরং মানুষের স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্যব্যবস্থারও সূচনা করেন।

জ্বালানি সংগ্রাহক
গ্রাম বাংলার একটি পরিবারকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউ স্বীকার করবেন গ্রামীণ পরিবারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় একজন নারীর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। Cooking Fuel-1সন্তান লালন-পালন, রান্না করা, গবাদিপশুর পরিচর্যা, প্রকৃতি থেকে মাছ-শাক-পানি-জ্বালানি-ঔষধি লতাপাতা সংগ্রহ করা, ফসলের ক্ষেত পরিচর্যা ও ফসলবীজ সংরক্ষণ, হস্তশিল্পের নানান কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে পরিবারের সামগ্রিক উন্নয়নে গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা প্রধান। পরিবারের জ্বালানি চাহিদা পূরণে নারীরা গোবর থেকে মশাল, ঘুটি, চেলি, গোল তৈরি করেন। এসব জ্বালানি তৈরির জন্য পাটকাঠি, তাল-নারিকেলের ডাল, খেঁজুর গাছের পাতা এবং কাঠের সাথে মিশিয়ে এসব জ্বালানি তৈরি করেন। নারীরা তাদের লোকায়ত জ্ঞানের মাধ্যমে এসব জ্বালানি সামগ্রী তৈরির মাধ্যমে পরিবারের জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করেছেন।

সর্বস্তরেই নারীর পদচারণা
নারীদের কাজের পরিধি ব্যাপক। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অফিস-আদালতে স্বীয় সক্ষমতা ও মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।28053561_1160770927386898_495752033_nদেশের রাজনীতি ও সমাজসেবায় নারীদের পদচারণাও উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, স্পিকার একজন নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী একজন নারী। কোন কোন কর্পোরেট অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তাও নারী। এভাবে যদি বিশ্লেষণে যাই তাহলে দেখতে পাবো আমাদের প্রিয় দেশের অগ্রগিত ও উন্নয়নের পেছনে নারীর বিশাল অবদান রয়েছে। খেলাধুলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নারীরা আর পিছিয়ে নেই। অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করলে নারীরা আরও অনেকক্ষেত্রেই তাদের মেধা, প্রতিভা ও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেন।

অথচ নারী এখনও বঞ্চিত, নির্যাতিত…
খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ রক্ষা, কৃষির স্থায়িত্বশীল উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার পরও নারীরা এখনও বঞ্চিত, নির্যাতিত ও অধিকারহীন। নারীরা এখনও ধর্ষণের শিকার হয়, ধর্ষণের পর তাদের হত্যা করা হয়। নারীরা এখনও যৌতুকের জন্য নির্যাতিত হন, নির্মম অত্যাচারের শিকার হন। নারীরা এখনও এসিড দগ্ধের শিকার হন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়নের আনাচে-কানাচে অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে-যদিওবা গণমাধ্যমে এগুলোর বিবরণ আমরা কম পাই।

অন্যদিকে কৃষি জমি মালিকানা, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, কৃষিঋণ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও নাগরিক সেবা ও সুযোগপ্রাপ্তিতে নারীদের প্রবেশাধিকার খুবই কম। ক্যামেরুনে নারীরা কৃষিসংশ্লিষ্ট মোট শ্রমের ৭৫%ই দিয়ে থাকলেও কৃষিজমির মালিকানায় তাদের অভিগম্যতা মাত্র ১০%; ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও কম। IFAD এর প্রতিবেদন অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গ্রামীণ নারীদের ভূমির মালিকানার হার ২%ও কম। ভূমির মালিকানায় অধিকারহীনতার কারণেই নারীরা অনেক সময় ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে যার প্রভাব পড়ে তাদের অর্থনৈতিক জীবনেও। এছাড়া ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির বেলায়ও নারীরা পিছিয়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভূমি মালিকানা জরুরি। কিন্তু যেহেতু নারীদের ভূমি মালিকানা লাভের হার কম সেহেতু ঋণ প্রাপ্তিতেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারীরা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়।

এই বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা।” দিবসের প্রতিপাদ্য কোনভাবে সফলভাবে প্রায়োগিক হবে না যদি নারীর কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া না হয় এবং বিভিন্ন সংঘটিতত নারী নির্যাতন, শোষণ ও হয়রানি বন্ধ করার উদ্যোগ সফলভাবে গ্রহণ করা না হয়। আমরা মনে করি যেহেতু সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমানতালে অবদান রেখেছেন; কোনও কোনও ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি অবদান রেখেছেন। তাই নারীদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করতে হবে; গ্রামীণ নারীসহ নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধু দিবসের পালনের মধ্য দিয়ে নয়; বাস্তবসম্মত উপায় বের করে নারীদের সব ধরনের সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই না সুষম উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: