সাম্প্রতিক পোস্ট

লোক সংগীত ও হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর

মানিকগঞ্জ থেকে রাশেদা আক্তার

“লোক সংগীত ও হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর” শ্লোগানকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন এর আয়োজনে মানিকগঞ্জে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২৭ দিনব্যাপী লোক সংগীত ও হাজারী গুড় মেলা ২০১৭। পহেলা ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে লোক সংগীত সন্ধা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক নাজমুছ সাদাত সেলিম আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলার উদ্বোধন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৫ ডিসেম্বর’ ২০১৭ বারসিক সাংস্কৃতিক দল লোক সংগীত পরিবেশন করে।

24824344_1121415204655804_1299051483_n
মানিকগঞ্জ জেলার ঐতিহ্য ‘লোক সংগীত’ যা চর্চা করার মধ্য দিয়ে লোকশিল্পীরা আজও এই গানকে টিকিয়ে রেখেছেন। এখনো গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন সময় বিশেষ করে শীতকালে লোক সংগীত, জারি, সারি গানের আসর জমে উঠে। শীতকাল এলে যে বিষয়টি আরো সবাইকে মনে করিয়ে দেয় তাহলো শীতের বিভিন্ন পিঠা-পুলি, পায়েস। আর এই পিঠা-পুলি, পায়েস তৈরিতে ব্যবহৃত হয় খেঁজুরের গুড়। সেদিক থেকে ঝিটকার হাজারী গুড় সকলের কাছেই পরিচিত ও সমাদৃত।

শোনা যায়, একসময় ব্রিটেনের রানী পায়েশ খেতে চেয়েছিলেন। তখন রানীর জন্য এই মানিকগঞ্জের ঝিটকার হাজারী গুড় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পায়েস রান্না করার জন্য। ব্রিটেনের রানী সেই পায়েস খেয়ে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। শুধু ব্রিটেনের রানীই নন এমন আরো অনেকের কাছেই হাজারী গুড়ের বেশ সমাদর ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে খেঁজুরের গুড় তৈরির মূল উপাদান খেঁজুরের রস বিলুপ্ত হয়ে যায়। কারণ খেঁজুরের রস পাওয়ার জন্য প্রয়োজন খেজুরের গাছ। কিন্তু খেজুর গাছের সংখ্যাও আজকাল অনেক কমে গেছে। আগে শীত কাল এল গ্রামে গ্রামে সারা পড়ে যেত খেঁজুরের রস খাওয়ার। গাছীরা সারি সারি খেঁজুরের গাছে রসের হাড়ি বেঁধে দিত। কাক ডাকা ভোরে উঠে সেই রস পেড়ে জ্বাল করে তৈরি করতো গুড়। বর্তমানে যেমন খেঁজুরের গাছের সংখ্যা কমেছে ঠিক তেমনিভাবে গাছীরাও আজ আর খেঁজুর গাছ কাটতে চায়না। তারা বলেন, “২/৪ টি গাছ কেটে এখন আর লাভ হয়না। তাছাড়া আগে রস করার জন্য আমন ধানের নাড়া ব্যবহার কর হতো। এখন আমন ধান চাষ কমে যাওয়ায় নাড়া পাওয়া যায়না। তাই গুড় করিনা। কিছু গাছ কাটি কাঁচা রস বিক্রি করার জন্য। এতে লাভও বেশি হয়।”

24891730_1121415214655803_145554371_n

মানিকগঞ্জের ঐতিহ্য এই লোক সংগীত ও হাজারী গুড় বিশ্ব দরবারে আবার সকলের কাছে তুলে ধরার জন্য মানিকগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জেলা ব্র্যান্ডিং বিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে মানিকগঞ্জ’কে ব্র্যান্ডিং করা হয় “লোক সংগীত ও হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর”। এই ব্র্যান্ডিং কমিটিতে বারসিক’ কে সদস্য হিসাবে যুক্ত করা হয়। বারসিক জেলা ব্র্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসাবে যুক্ত হওয়ার পর থেকে জেলা প্রশাসন ও বারসিক যৌথভাবে খেঁজুরের বীজ বপন কর্মসূচি করে যাচ্ছে হাজারী গুড় বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য। সেই সাথে লোক সংগীত উৎসব। জেলা ব্র্যান্ডিং প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তারই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত লোক সংগীত ও হাজারী গুড় মেলায় বারসিক’কে আমন্ত্রণ জানালে বারসিক সাংস্কৃতিক দল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।

মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর ও সিংগাইর কর্মএলাকার বারসিক সাংস্কৃতিক দলের ১৩ জন শিল্পী ৫ ডিসেম্বর’ তাদের লোক সংগীত পরিবেশন করেন। ১ ঘণ্টা ৩০মিনিটের আয়োজনে শিল্পীরা গানের মাধ্যমে দর্শকদের আনন্দ প্রদান করে। পাশাপাশি লোক সংগীত চর্চার মাধ্যমে এই গানকে টিকিয়ে রাখতেও ভূমিকা রাখছেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জের স্থানীয় সরকার প্রধান আব্দুল মতিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, (সার্বিক), মো. বাবুল মিয়া, বিভিন্ন কমিশনার (সাধারণ, রাজস্ব), বারসিক কর্মী, সমাজ সেবা কর্মকর্তা, মিডিয়া কর্মী, এনজিও প্রতিনিধিসহ সাধারণ জনগণ।

24989540_1121415247989133_1922071779_n

গান মানুষকে আনন্দ দেয়। গান মানুষের মনের খোরাক জোগায়। আমাদের দেশে আজও মানুষ লোক সংগীত, জারি-শারি গান ধারণ করে চলেছেন। মানুষের এই ধরনের গান শোনার আগ্রহ ও মানসিকতা এবং শিল্পীদের এই গান চর্চার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবে আমাদের লোক সংগীত। “লোক সংগীত ও হাজারী গুড়, মানিগঞ্জের প্রাণের সুর” ব্র্যান্ডিং বিশ্বের সবার কাছে পরিচিতি পাবে তার আপন মহিমায়, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: