অচাষকৃত উদ্ভিদ এখন চাষ হচ্ছে কৃষাণীর আঙিনায়

অচাষকৃত উদ্ভিদ এখন চাষ হচ্ছে কৃষাণীর আঙিনায়

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
যুগ যুগ ধরে নারীদের হাত ধরেই এগিয়ে চলেছে আমাদের কৃষি। সম্প্রসারিত হচ্ছে গ্রামান্তরে, দেশান্তরে। তাঁদের অনুসন্ধিৎসু চোখ সর্বদা খুঁজে ফিরে নতুন কিছু। নতুন কোনো বীজ, যার মাধ্যমে নিজের কৃষিভা-ার সমৃদ্ধ করা।
বউত্তা শাক, গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত একটি অচাষকৃত উদ্ভিদ। যেটি বিনা চাষে, অযতেœ অন্যান্য ফসলের জমিতে জন্মায়। এটি জন্মানোর সময় হলো রবি মৌসুম। এই মৌসুমে মরিচ, ডাটা ইত্যাদি ফসলের জমিতে দেখা যায়। কৃষকগণ জমির আগাছা পরিস্কার করার সময় বউত্তা শাকগুলোও তুলে ফেলে দিতেন। কিন্তু কৃষাণীরা এগুলো আলাদাভাবে সংগ্রহ করে খাবারের উপযুক্ত করে রান্না করেন। এই শাক খাবার হিসেবে ঠিক কবে থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তার সঠিক কোনো ইতিহাস না থাকলেও এর ব্যবহার বেশ প্রচলিত।


লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের দরুন হাসামপুর গ্রামের হোসনা আক্তার, পাশর্^বর্তী একটি গ্রামের আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেই বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান মরিচের জমিতে বউত্তা শাকের গাছ। এই গাছটি একটু ভিন্ন ধরণের। কারণ এলাকার স্থানীয় বউত্তা শাকের গাছ আকারে ছোট, পাতা ও ডাল সবুজ। কিন্তু এই গাছটি পুরোপুরি সবুজ নয়, ডাল ও পাতা কিছুটা খয়েরী রঙের এবং বেশ বড়। ঐ আত্মীয়ের কাছে জানতে পারেন, এটি জমিতে অন্যান্য আগাছার সাথেই গজিয়েছে। হোসনা আক্তারের এই ভিন্ন ধরণের বউত্তা শাকের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তাই তিনি সেই বাড়ি থেকে দুইটি গাছ তুলে এনে নিজের সব্জীর জমিতে রোপণ করেন।


দেখতে দেখতে গাছগুলো বেশ বড় হয়ে যায়। এক সময় ফুল ও বীজ আসে। গাছের আকার দেখে হোসনা আক্তার এর বীজগুলো সংরক্ষণ করার জন্য গাছ জমিতেই রেখে দেন। বীজ শুকিয়ে জমিতে পড়ে এবং সেখানেও আরো বউত্তা শাকের গাছ জন্মাতে শুরু করে। বীজের গাছগুলো আলাদা করে তুলে সংরক্ষণ করেন। এবং নতুন করে গজানো গাছগুলো শাক হিসেবে খেতে শুরু করেন। এটি ছিল ২০২১ সালের কথা।


এবছরই হোসনা আক্তারের বাড়িতে উক্ত ইউনিয়নের শতবাড়ির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সভায় আগত বিভিন্ন গ্রাম যেমন লক্ষীগঞ্জ, আতকাপাড়া, কান্দাপাড়া গ্রামের ৫জন কৃষাণীকে তিনি উপহারস্বরুপ একটি করে বউত্তা শাকের চারা দিয়েছিলেন। কৃষাণীরা সেই চারাগুলো নিয়ে নিজ বাড়িতে রোপণ করেন।


এই একটি করে গাছ থেকে যে পরিমাণ বীজ তাঁরা সংগ্রহ করেছেন, সেই বীজই এখন বিভিন্ন গ্রামে সম্প্রসারিত হয়েছে। আতকাপাড়া গ্রামের কৃষাণী ইয়াসমিন আক্তার। তিনি গত বছর একটি গাছের বীজ সংরক্ষণ করেছিলেন। এবছর তিনি নিজের জমিতে বপন করার পাশাপাশি আরো দুটি গ্রামে তাঁর আত্মীয় বাড়িতে বীজ দিয়েছেন। একই গ্রামের জহুরা আক্তার নিজের জমিতে বউত্তা শাকের চাষ করেছেন।


কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষাণী মালা আক্তারের বাড়িতে গত বছর যে গাছের বীজ তিনি সংরক্ষণ করেছিলেন, প্রতিবেশিরা এই ধরণের গাছ দেখে অবাক হয়ে যায়। অনেকেই নিজের হাতে গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এই গ্রামের আরেক কৃষাণী হাসিনা আক্তার। তিনি মালা আক্তারের বাড়ি থেকে সংগৃহীত বীজ এবছর চাষ করেছেন। এছাড়াও কৃষাণী মালা আক্তার নিজ গ্রামের ৭জন কৃষাণী ও পাশর্^বর্তী দুটি গ্রামের ৪জন কৃষাণীর মাঝে বীজ বিতরণ করেছেন।


হোসনা আক্তার বারসিক’কেও বেশ কিছু পরিমাণ বউত্তা শাকের বীজ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। যে বীজ এখন চাষ হচ্ছে কলমাকান্দা, মদন, জয়শিদ এবং রামেশ^রপুর গ্রামের বারসিক’র নিজস্ব জমিতে। এছাড়াও তিনি প্রতিবেশিদের মাঝেও বীজ সহযোগিতা প্রদান করেছেন।


যে কৃষাণীগণ এ বছর বউত্তা শাক চাষ করেছেন, তাঁদের সাথে আলোচনা করে জানা যায়, এই শাকের গাছটি অনেক উঁচু হয়। শাখা, প্রশাখা বেশি হওয়ায় শাক বেশি সংগ্রহ করা যায়। বীজের পরিমাণও বেশি হয়। খেতেও বেশ সুস্বাদু।
বেশি পরিমাণে বীজ হওয়া ও বীজ সংরক্ষণ করা যায় বলে এই শাক চাষের প্রতি অনেক কৃষাণীর আগ্রহ জন্মেছে। এটি চাষে আলাদা কোনো শ্রম দিতে হয়না। অন্যান্য ফসলের জমিতে বীজ ছিটিয়ে দিলেই হয়। বাড়ির আঙিনা, পুকুর পাড় এসমস্ত জায়গাতেও এটি চাষ করা যায়। তাছাড়া এতে কোনো পোকার আক্রমণও হয়না। পুষ্টিকর এই শাক বর্তমানে বাজার মূল্যের অস্থিতিশীল অবস্থায় আমাদের বাজার নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমাতে পারে। পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষাণীদের আয়ের পথ সুগম করতে পারে। পতিত জায়গাগুলোও আবাদী হয়ে উঠতে পারে।

happy wheels 2

Comments