সাম্প্রতিক পোস্ট

লবণ পানি নষ্ট করলো সুপেয় পানির আঁধার

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে ফজলুল হক

‘আগে কত সুখে শান্তিতে বসবাস করে আসছিলাম আমরা। চারিদিকে ছিল মিষ্টি পানি। মিষ্টি পানির কারণে চারিদিকে ছিল সবুজের সমারোহ। সুপেয় পানির কারণে রোগবালাইও কম হতো। পানি খেয়েও তৃপ্তি পেতাম। কিন্তু ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার কারণে ঁেবড়ি বাধ ভেঙে লবণ পানি প্রবেশ করে সুপেয় পানির আঁধারগুলো নষ্ট করে দিয়ে গেছে এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ তো আছেই। আইলার পর অন্য সব ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে উঠলেও দীর্ঘ ১০ বছর পরও এখন সুপেয় পানির সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারিনি।’ এমন কথাগুলো বলছিলেন আটুলিয়া ইউনিয়নের হাওয়ালভাংগী গ্রামের মানুষেরা।
সম্প্রতি বারসিক’র সহযোগিতা আটুলিয়া ইউনিয়নের হাওয়ালভাংগী গ্রামে পানিয় জল ও এলাকার পানির পরিস্থিতি উপর লবণাক্ততার প্রভাবের তথ্য জানা, জানানো এবং সমাধানের উপায় বিষয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় একথাগুলো তারা বলেন। আলোচনা সভায় কৃষক-কৃষাণী, শিক্ষার্থী, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ ২৪ জন নারী ও ৬ জন পুরুষ মোট ৩০ জন অংশগ্রহণ করেন।


আলোচনা সভায় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় সুপেয় পানির উৎস ছিল কাছাকাছি পুকুরের পানি, পিএসএফ সমন্বিত পুকুর, টিউবওয়েল কিন্তু বর্তমানে পুকুরের পানি লবণাক্ততার কারণে পিএসএফগুলো আর ব্যবহার হয় না বললেই চলে। টিউবওয়েলেও আগের মত ভালো পানি পাওয়া যায় না। এখন শুধু বৃষ্টির পানি বড় ট্যাংকে ধরে রাখা, কিনে খাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। এছাড়া দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি পানি সংগ্রহ করতে হবে।’

শিক্ষার্থী রুবিনা খাতুন বলেন, ‘আগে তো আর সুপেয় পানির অভাব ছিল না। তখন পানির উৎসগুলো কাছে থাকায় কখনো মেটে কলসিতে, কখনো দস্তার কলসিতে বেশি সংরক্ষণ করতাম ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ে আসতাম। কিন্তু বর্তমানে সেটা আর হয় না, বৃষ্টির মৌসুমে বৃষ্টির পানি বেশি ধরে রাখি বড় ট্যাংকে, কলস, প্লাষ্টিকের পটে, ড্রামে। আমার পরিবারে পাঁচজনের জন্য দিনে শুধু খাবার পানি লাগে ২০ লিটারের মত। এখন তো খাবার পানির কিনে নিলে বাড়ি বাড়ি এসে দিয়ে যায় আর আনতে গেলে দিনে দুই তিনবার যাওয়া লাগে দূরে হওয়ায়। নারী পুরুষ উভয় মিলে সংগ্রহ করা হয় তবে নারীরা একটু বেশি করে।’

হাওয়ালভাংগী গ্রামে আলহাজ্ব মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখন তো পানির উৎস বদলে গেছে। পানির স্বাদও বদলে গেছে। আগে তো আর পানি কিনে খেতে হতো না কিন্তু বর্তমানে কিনে খেতে গেলে আনুমানিক ১৫০০-২০০০ টাকা খরচ হয় প্রতি মাসে একটি পারিবারে। এখন যে পানিটা খাচ্ছি সে পানিটা স্বাস্থ্যসম্মত না। কেনা পানিতেও বিভিন্ন মেডিসিন দেওয়া। পানি স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ার কারণে আমাশায়, ডাইরিয়া, গ্রাস্ট্রিক,এলার্জি, চুলকানিসহ নানান রোগ ব্যাধিতে ভরপুর। এলাকায় লবণ পানি চিংড়ি ঘেরের কারণে প্রাণবৈচিত্র্য কমে গেছে। কারণ তাদের চরণভূমিগুলো নেই, খাদ্যও সংকট।

অংশগ্রহণকারীরা খাওয়ার পানি সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেরা কখনো পুকুর খনন করে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে এবং বর্ষার সময় পুকুরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখাতো কিন্ত পার্শে¦ লবণ পানির চিংড়ি ঘেরের কারণে লবণ পানি প্রবেশ করে সব বৃথা হয়ে যেত। লবণ পানির প্রবেশ বন্ধ করে অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের না করে পরিকল্পিতভাবে ঘের করলে, অন্য এলাকা থেকে পাইপ লাইনের ব্যবস্থা করে পানি নিলে এবং ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের ব্যবস্থা করলে মনে হয় এলাকার পানির সমস্যা সমাধান হবে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: