Posted in

অচাষকৃত উদ্ভিদ সংরক্ষণ করছেন নাজমা বেগম

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ বিভিন্ন কাজে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আসছে। আমাদের চারপাশে বাড়ির আনাচে কানাচে অবহেলা অনাদরে বেড়ে উঠেছে প্রকৃতির নানান ধরনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। প্রকৃতিতে এমন কোন উপাদান নেই যা মানুষের প্রয়োজনে আসে না। মানুষ জন্মগতভাবেই প্রকৃতির নিকট ঋণী। আর এ সমস্ত উপাদান মানুষ কখনও খাদ্য হিসেবে, কখনও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করে চলেছে। আমাদের শুধুমাত্র এ উদ্ভিদ বৈচিত্র্যগুলো চিনতে হবে, এর ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে জানতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে এর ধারণা পৌছে দিতে হবে।


কালের পরিক্রমায় আমরাও অনেকখানি এ সমস্ত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ব্যবহার ও বিকাশ সম্পর্কে পিছিয়ে আছি। দিনে দিনে যেন আমাদের মাঝ থেকে সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের গ্রাম বাংলার অসখ্য নারী পুরুষ এখনও তাদের নিজ প্রয়োজনে প্রকৃতির এসকল উপদানকে টিকেয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছে।
তেমনি একজন নারী শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের শংকরকাটি গ্রামের মেহেদী হাসানের স্ত্রী নাজমা বেগম। নাজমা বেগম নিজেই একজন ছোট খাটো কবিরাজ। চিকিৎসা কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়া নিজ গ্রাম ও বাড়ির আশপাশ থেকে সংগ্রহ করে রেখেছেন। যাতে প্রয়োজনে কোন উদ্ভিদ খুঁজে পেতে কোন সমস্যা না হয়। সেজন্য তিনি প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ নিজ বসত ভিটায় সংরক্ষণ রাখছেন।
বর্তমানে নাজমা বেগমের বসতভিটায় অচাষকৃত উদ্ভিদ খাদ্য ও ঔষধি হিসাবে পেপুল, ক্ষুদকুড়ি, আমরুল, কলমি, সাদা গাদো, লাল গাদো, বউটুনি, সেঞ্চি, কাটানুটে, আদাবরুন, তেলাকচু, থালারুটি, ঘোড়াসেঞ্চী, ঘুমশাক, ঘেটকুল, নোনা গাদো, গিমেশাক, থানকুনি,কাথাশাক,হেলাঞ্চ, কলমি (লাল সাদা), বাকসা, নিমুখা, কালোবিসারী,পাথরকুচি, হেন্না, ঝাউগাছ, তিতবেগুন, তুলসি, উলু, মিশরিদানা, ডায়বেটিস গাছ, বিভিন্ন ধরনরে কচু, ইষানমুল, শে^ত আকন্দ,দুর্বাঘাস, ঝাউগাছ, শিউলী, রঙ্গন, কানফুল, বেড়া চিতা, সেজি, গাদা ফুল প্রভৃতি উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রয়েছে।


অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কে নাজমা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন যে, ‘প্রকৃতির সকল উপদান তো দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা যে সমস্ত শাক সবজি চাষাবাদ করছি তাতে নানান ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছি। এতে করে তার পুষ্টিমান ঠিক থাকছে না। সাথে এলাকাতে লবণ পানির প্রবেশ ও বৃদ্ধির জন্য প্রকৃতিতে আর আগের মতো এসকল শাক-সবজি হচ্ছেনা। একদিকে যেমন মারা যাচ্ছে অন্য দিকে প্রাপ্তির জায়গা বিশেষ করে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। কিন্তু এসকল উদ্ভিদ বৈচিত্র্য আমাদের নানান কাজে ব্যবহার হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন যতরকমের ঔষধ খাই তা তো সব এসকল উদ্ভিদ থেকে তৈরি। আর এসকল আজাবা অচাষকৃত উদ্ভিদগুলোর কিন্তু তেমন যত্ন লাগে না। এগুলো আমাদের যেসমস্ত পরিত্যক্ত জায়গা আছে সেখানেই হয়। শুধূ একটু নজরদারী দরকার এবং মানুষকে চেনানো ও জানানোর দরকার তাহলেই না এগুলো টিকে থাকেব।’


নাজমা বেগম জানান, তিনি কবিরাজ বটে তবে আগে তেমনভাবে এগুলো খুবই কম সংরক্ষণ করতেন। যখন দরকার হতো তখন এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করতেন। কিন্তু যেদিন তিনি ধুমঘাট গ্রামে অল্পনা রানীর পরামর্শে বর্তমানে এসকল উদ্ভিদ সংরক্ষণ করেন। তিনি এখন মনে করেন তার এটা একটা পাঠশালা। এখন তাঁর এলাকার ও বাইরের মানুষ এখানে আসে এখান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়া নিয়ে যায়। এলাকার মানুষকে উদ্ভিদ চিনান এবং এর গুরুত্ব ও ব্যবহারও সকলকে অবহিত করেন। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে একটি কৃষি নারী সংগঠন তৈরি হয়েছে। যাতে এসকল উদ্ভিদ সরক্ষণ করতে পারেন এবং অন্যের পাশে থাকতে পারেন।
উপকূলীয় এলাকায় নাজমা বেগমের বাড়ি এবং তার অচাষকৃত উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ সত্যিকার অর্থেই একটি মডেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.