সাম্প্রতিক পোস্ট

মরণের পরও একটা ঠাঁই চাই

তানোর থেকে উত্তম কুমার

রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার মোহর গ্রামের ২২টি পাড়ার মধ্য একটি হিন্দুপাড়া। এই পাড়ায় ৮২টি পরিবারের ৩২০ জন মানুষের বসবাস করে। পাড়ায় বসবাসকারী সকলেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। গ্রামের অধিকাংশই কৃষি শ্রমিক। এই পাড়ায় স্বাস্থ্য, কৃষি, অপুষ্টি, রাস্তাঘাটসহ অনেক কিছুরই সমস্যা বিদ্যমান। তবে সবকিছুকেই ছাপিয়ে পাড়ায় বসবাসকারী সদস্যদের চিন্তার বিষয় এই পাড়ায় কোন শ্মশান ঘাট নেই। তাই প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় এলাকাবাসীকে।

কোন পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে পাড়া থেকে নিকটবর্তী শ্মশান প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে। পাড়ার কোন কোন পরিবার নিজেদের জমিতে সৎকারের ব্যবস্থা করতে পারলেও বাকি পরিবারের বাড়ি ভিটা ছাড়া কোন জমি না থাকার কারণে পড়তে হয় মহা সমস্যায়। এই সকল পরিবার অন্যের জমিতে মৃতদেহ সৎকারের জন্য জমির মালিকের মুখাপেক্ষী হতে হয়। যদিও এভাবে মৃতদেহ সৎকারে ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে নিষেধ আছে কিন্তু কোন উপায় না থাকায় বছরের পর বছর এক রকম বাধ্য হয়েই এটি করা হচ্ছে।

20161108_133331
গত সেপ্টেম্বর মাসে পাড়ার শচীন চন্দ্র দাস মৃত্যুবরণ করেন কিন্তু তাঁর পরিবারের বাড়ি ভিটা ছাড়া কোন জমি না থাকায় আর তার পরিবারের আয় সক্ষম লোক না থাকায় সারাদিন অন্যের জমিতে মৃতদেহ সৎকারের জন্য ধরণা দিতে হয়। প্রতিবেশিরা কেউ জায়গা দিতে রাজি না হওয়ায় দীর্ঘ একদিন পার করে সন্ধায় রাস্তার পাশে সৎকার করা হয়। এরকম অনেক পরিবারের বাড়ি ভিটা ছাড়া কোন জমি না থাকায় তাঁরা প্রতিদিনই চিন্তা করেন যে তাঁদের পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁরা কি করবেন? এ বিষয়ে গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি শ্রী উপেন্দ্রনাথ সূত্রধর (৬০) বলেন,“ বিষয়টি এমন রূপ ধারণ করেছে যে সাড়ে তিন হাত মাটির জন্য আগেই পাড়ার অন্যের সাথে আলোচনা করে রাখতে হচ্ছে, যাতে যাদের জমি আছে তাঁরা যেন মৃতদেহ সৎকারের জন্য জমি দান করেন”। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামের শ্রী গৌতম সূত্রধর (৩৬) বলেন “আজ থেকে পাঁচ বছর আগে শ্রীঃ লক্ষণ সূত্রধর তাঁর স্ত্রীকে সৎকার করেন নিজের ঘরের পেছনে”।

একটি শ্মশানের জন্য পাড়ার সকলে মিলে নিজেদের মধ্য অনেকবারই আলোচনা করা হয়েছে, নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। যেমন সকলে মিলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট যাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার, যাওয়া হয়েছে থানা, উপজেলা ভূমি অফিসে কিন্তু কোথায় আশানুরূপ কোন ফল পাওয়া যায়নি। এরপর গ্রামের যুব সংগঠনের সদস্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা পর্যায়ে গণ স্বাক্ষরসহ স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামের নারী পুরুষ সকলে মিলে গণসাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। এরপর যুবক ও প্রবীণদের সমন্বয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসে তা প্রদান করা হয় এবং সকল সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। এরপর নির্বাহী অফিসার তাদের আস্বস্ত করেন এবং কিছুদিন পর মোহর মৌজার ৫টি খাস জমির দাগ নাম্বার দিয়ে দেন সংগঠনের সদস্যদের। সংগঠনের সদস্যরা তা নিয়ে গ্রামের সকলের সাথে আলোচনা করেন। কিন্তু উল্লেখিত দাগ নাম্বারের মধ্য কোনটিই শ্মশান করার উপযোগী না হওয়ায় তা বাস্তবায়ন হয়নি।

বর্তমানে ১৫ শতাংশের একটি খাস পুকুরে শ্মশান করার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি যতদিন না নিজ এলাকায় শ্মশান হচ্ছে সে সময়ের জন্য মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেরা সঞ্চয় করে একটি পরিবহনের ব্যবস্থার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন তরুণরা। গ্রামের সকলের অভিমত, “একটি শ্মশান ঘাট নির্মাণ হলে আমাদের মৃত্যুর পর একটি ঠাঁই নিশ্চিত হবে। আমাদের আর মৃত্যুর পরের ঠিকানা নিয়ে ভাবতে হবে না।”

happy wheels 2
%d bloggers like this: