Posted in

বিলুপ্তির পথে বাঙালির ঐতিহ্যবাসী গৃহস্থালী উপকরণ ‘গাইল সেপাট’

নেত্রকোনা থেকে সুয়েল রানা
বাঙালির গৃহস্থালী ও কৃষিজ সংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ একদা ছিল ঐতিহ্যপূর্ণ। আশির দশকেও শস্য চাষে আমাদের দেশের সকল এলাকায় কাঠের লাঙ্গল-জোয়াল, মই, জমির আগাছা নির্মূলে কাঠের বিন্দা (নিড়ানি) এবং মালামাল পরিবহনে গরু ও মহিষের গাড়ির প্রচলন ছিল। ধান ভানা ও চালের গুড়ি তৈরির জন্য কাঠের ঢেঁকি এবং কাঠের গাইল সেপাট ব্যবহারের প্রচলন ছিল গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে। কালক্রমে অধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং শিল্প বিপ্লবের ফলে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগতে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থালী ও কৃষিজ সংস্কৃতিতেও। গ্রামে পৌছে যায় কলের লাঙ্গল নামে পরিচিত পাওয়ারটিলার ও ট্রাক্টর, বাজারে বাজরে স্থাপিত হয় চালের কল। ফলে গ্রামীণ গৃহস্থালী কাজ ও কৃষিজ সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কাঠের লাঙ্গল, মই, বিন্দা তথা গরু দিয়ে হাল চাষ। বিলুপ্ত হতে থাকে ধান ভানা ও চালের গুড়ি তৈরির গ্রামীণ উপকরণ গাইল সেপাট-এর। বিংশ শতাব্দীর গ্রামাঞ্চলে সকল ধরণের উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষ সকল ক্ষেত্রে যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রজন্মের নিকট প্রচীন গ্রামীণ গৃহস্থালী ও কৃষিজ উপকরণ একেবারেই অপরিচিত। নতুন প্রজম্মের এমনও অনেক ছেলে-মেয়ে রয়েছে যারা ঢেঁকিতে/ গাইল সেপাট দিয়ে ধান ভানা বা চালের গুঁড়ো তৈরি করতে দেখেনি। দেখেনি কাঠের লাঙ্গল-জোয়াল ও মই দিয়ে জমি চাষ করতে এবং কাঠের বিন্দা দিয়ে জমির আগাছা নিড়ানো। আগামী ১৫-২০ বছর পর হয়তো বাঙালির এসব প্রাচীন কৃষিজ উপকরণ পুরোপুরি গ্রামাঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সকল ক্ষেত্রে শতভাগ স্থান পাবে আধুনিক যান্ত্রিক উপকরণ। আর প্রাচীন উপকরণগুলোর স্থান হবে জাদুঘরে। মোবাইল ফোন প্রযুক্তি সবকিছুকে যেন আরো কাছে নিয়ে এসেছে। গ্রামের জনগোষ্ঠীকে এখন ধান ভানা বা চালের গুঁড়ি করতে বাজারে যেতে হয়না। এক্ষেত্রে মোবাইল বা ভ্রাম্যমান চলের কল বা গুড়ি তৈরির কল/মেশিন সেবা দিয়ে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। মোবাইল ফোনে কল করলেই যথা সময়ে বাড়ি ভ্রাম্যমান মেশিন পৌছে যাচ্ছে ঘরে এবং মূহুর্তেই কাজ করে দিচ্ছে। এতে সময় ও শ্রম উভয়ই সাশ্রয় হচ্ছে।

গ্রামীণ গৃহস্থালী ও কৃষি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উন্নত হলেও বিলুপ্ত হচ্ছে এগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাঙালির শত শত বছরের ঐতিহাসিক সং¯ৃ‹তি। ঢেঁকিতে বা গাইল সেপাট দিয়ে ধান ভানা ও চালের গুঁড়ি করার সময়ে গ্রামীণ নারীরা যেসব সংস্কৃতি ধারণ/চর্চা করত (গান, কিচ্ছা, হাস্তর ইত্যাদি) জমি চাষ করতে গিয়ে কৃষকদের ধারণ/চর্চাকৃত গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে আশার কথা হল আমাদের দেশে এখনও এমন কিছু এলাকা বা গ্রামাঞ্চল রয়েছে এবং এমন কিছু লোক রয়েছে যারা এখনও গরু ও কাঠের লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করেন এবং গাইল সেপাট দিয়ে ধান ভানা এবং চালের গুড়ো কুটেন। এ সংখ্যা অতি নগণ্য হলেও তারা ইচ্ছে করে হোক বা কোন উপায় না পেয়েই হোক তারা তাদের অবস্থান থেকে এসব উপকরণ ব্যবহার করে তাদের কাজ যেমন চালিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি গ্রামীণ সংস্কৃতির চর্চা ও উপকরণের ব্যবহার ধরে রেখেছেন।

নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার হাওরাঞ্চলে এখনও ধান ভানা ও চালের গুঁড়ো কুটার কাজে গাইল সেপাট ব্যবহার করতে দেখা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন ভালো না হওয়ায় হাওরাঞ্চলের নারীরা অল্প পরিমাণ ধান ভানা বা চালের গুড়ো কুটার কাজে কাঠের তৈরি গাইল সেপাট এখনও ব্যবহার করেন।

গাইল সেপাট কী? গাইল ও সেপাট মূলত কাঠের তৈরি দু’টি পৃথক চাল ভানা বা গুড়ি কুটার গ্রামীণ উপকরণ। ১৮-২৪ ইঞ্চি লম্বা এবং ৪০-৪৫ ইঞ্চি বেড় (সামান্য ছোট বা বড় হতে পারে) আকৃতির গাছের গুড়ি উপর নিচ সমান করে কেটে উপরের দিক থেকে ধারালো কাটার দিয়ে (বাটাল) কেটে এক ফুট পরিমান গভীর করে বাটি বা বাল্টি আকৃতির তৈরি করা হয়। বাল্টি আকৃতির কাঠের গর্ত অংশটি সমান করে ছাঁচা হয়। গাছের একটি ৮/১০ ইঞ্চি বেড়ের সোজা ও লম্বা ডাল বা ছিড়াই গোল কাঠের এক মাথায় রিং বা চুড়ি আকৃতির লোহার সামি লাগানো থাকে, যাকে গাইল বলা হয়, যা দিয়ে গাছের গুড়িতে বাল্টি আকৃতির গর্তে ধান বা চাল রেখে গাইল দিয়ে দুই হাতে গাইল দিয়ে উপর থেকে ধান বা চালের উপর জোড়ে জোড়ে ফেলা হয়। লোহার সামি লাগানো সেপাটের আঘাতে গাইলে রাখা ধান চালে বা চাল গুড়িতে পরিণত হয়। গাইল সেপাট দিয়ে ধান ও চালের গুড়ি করতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। একটি গাইল সেপাট দীর্ঘদিন টেকসই হয়। গাইল সেপাট দিয়ে ভানা চালের রান্না ভাত ও গুড়ি দিয়ে তৈরি পিঠা খেতেও খুব সুস্বাদু হয়। নারীরা গৃহস্থালী কাজের অবসরে সহজেই গাইল সেপাট দিয়ে ধান ও চালের গুড়ি কুটতে পারেন।
গাইল সেপাট দিয়ে গ্রামীণ নারীরা দল বেঁধে ধান ভানা ও চাল গুড়ি কুটার সময় বিভিন্ন ধরণের গান ও কিচ্ছা বলে বিনোদন করেন। গাইল গ্রামীণ সংস্কৃতি ধারণের পাশাপাশি নারীদের বিনোদনেরও একটি বড় মাধ্যম। হাওরাঞ্চলের নারীরা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ গৃহস্থালী উপকরণ ব্যবহারের সংস্কৃতি এখনও তাদের জীবনধারণের প্রয়োজনে ধরে রেখেছেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.