Posted in

আন্তরিকতা খুঁজে বেড়াই

সিলভানুস লামিন

আমরা আন্তরিকতা খুঁজে বেড়াই। যাদের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করি, যোগাযোগ করি তাদের কাছে এই আন্তরিকতা খুঁজে বেড়াই। আন্তরিকতা পেলে আমরা নিজেরাও আরও আন্তরিক হই। আন্তরিকতা থাকলে আলাপচারিতা হয় সক্রিয়, দ্বিধাহীন, জীবনঘনিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল। শহুরে জীবনে আজ আন্তরিকতার কোন বালাই নেই। সবাই ব্যস্ত থাকেন নিজ নিজ কাজে ও স্বার্থে। তাই আন্তরিকতা খুঁজে বেড়ানোর জন্য সম্প্রতি মানিকগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম-প্রান্তরে যাই। মিথস্ক্রিয়া করি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সাথে। এই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে জীবনঘনিষ্ঠ অনেক কিছুই পেয়েছি অসাধারণ অথচ সাধারণ জীবনযাপনকারী বেশকিছু মানুষের কাছ থেকে। এই মিথস্ক্রিয়ার কিছু চিত্র নিয়েই এ লেখাটি সাজানোর চেষ্টা করছি।

প্রাণোচ্ছ্বল কমলা বেগম
নয়াবাড়ি আদর্শ গ্রাম। মানিকগঞ্জ শহর থেকে দুরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার! মটরসাইকেল যোগে এই গ্রামে যাই সম্প্রতি। সঙ্গী বারসিক’র শিমুল কুমার বিশ্বাস। যাওয়ার পথে চারদিক সারি সারি গাছ, সদ্য বন্যা পানিতে বিধৌত কৃষিজমি, কোন কোন জমিতে হাটু সমান পানি, আবার কোন কোন জমিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ফসল হাহাকার করছে! কয়েকজন বিপন্ন কৃষক চেষ্টা করছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসল থেকে মুষ্টিমেয় কিছু ফসল ঘরে তুলার জন্য! কেউবা জমিতে জমানো পানি সরিয়ে জমি প্রস্তুত করেছেন ফসল আবাদ করার জন্য। যাতে করে বন্যায় যা ক্ষতি হয়েছে নতুন ফসল দিয়ে কিছুটা হলেও তা পুষিয়ে নিতে পারেন। গ্রামে ঢুকতেই গ্রামবাংলার হাজার বছরের চেনা দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখা গেছে, কেউ কেউ গরুকে খাবার দিচ্ছেন, গোয়াল ঘর পরিষ্কার করছেন, ছাগল মাঠে চড়াচ্ছেন, কেউ খড়ি দিয়ে রান্না করছেন, কেউবা ব্যস্ত তাদের বসতভিটার সবজি বাগান পরিচর্যা করতে, পুকুরে মাছকে খাবার দিতে। আবার কেউ কেউ ব্যস্ত পরস্পরের সাথে গল্প-গুজব করতে। পরস্পরের সাথে সুখ-দুঃখ সহভাগিতা করতে। প্রত্যেক বাড়ির আশপাশে রয়েছে ছোট-বড় কাঠ, ফলদ ও ওষুধি গাছ, নাড়ার স্তুপ!
Komla
এই গ্রামেই থাকেন কমলা বেগম। বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। প্রাণোচ্ছ্বল, আন্তরিক একজন নারী। এই নারীর সাথেই প্রথমে শুরু হয় আমার মিথস্ক্রিয়া! অনাহুত অতিথির মতো তার বাসায় প্রবেশ করি। কিছুটা সঙ্কোচ ও দ্বিধা মনে বিরাজ করলেও তাঁর প্রথম বাক্যেই সেটি উধাও হয়ে যায়। হাসোজ্জ্বল মুখে তিনি বলেন, “বালা আছেননি”? সাথে সাথেই পিড়ি, বেঞ্জসহ যা কিছু আছে বসার জন্য সেটি বাড়িয়ে দেন তিনি। কোন সঙ্কোচ, দ্বিধা, অবিশ্বাস নেই তাঁর চোখে। অদুরে তাঁর স্বামী মজনু দেওয়ানের চোখে-মুখেও কোন অস্বস্তি ও বিরক্তি নেই। আপন মনে তাঁর ঝাল-মুড়ি ও চানাচুরে ঠাসা ঠেলাগাড়িটি প্রস্তুত করছেন স্কুলে ফেরি করার জন্য। আলাপচারিতায় কমলা বেগম জানান, ১৯৯০ সালে এই গ্রামে বাস করতে আসেন তিনি। এর আগে তিনি বাস করতেন নবীনগরে। তাঁর বাবার বাড়িতে। এই গ্রামে এসেই কমলা বেগম শুরু করেন কৃষিকাজ। যদিও ৫ শতাংশ বসতভিটা জমি ছাড়া নিজস্ব জমি নেই তাঁর। তবে বেঁচে থাকার জন্য এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার মনোবাসনা থেকেই তিনি অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষবাস করতে শুরু করেন। তাঁর চাষবাসে রয়েছে বৈচিত্র্যময় শাকসবজি, ধান, আখ ও মসলা। তাঁর ছোট একটি উঠানে রয়েছে নানা রকমের ঔষুধি গাছ। উঠানের পাশে একটি খা্লে রয়েছে ভাসমান বীজতলাও। বন্যায় মূল জমিতে বীজ করতে না পারায় তিনি ভাসমান বীজতলা করেছেন। স্বামী মজনু দেওয়ানের ঝাল মুড়ি ও চানাচুর বিক্রি থেকে দৈনিক যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার ভালোই চলছে বলে জানান কমলা বেগম। আলাপচারিতায় কমলা বেগম তাঁর জীবনের নানান সংগ্রামের কথাও জানান। Komal-1এক সময় গামের্ন্টস-এ তিনি কাজ করতেন। তবে বিয়ের পর স্বামীর সাথে চলে আসেন এই গ্রামে। গার্মেন্টস চাকুরি থেকে তিনি কিছু টাকা সঞ্চয় করেছেন যা দিয়ে তিনি এই গ্রামের ৫ শতাংশ বসতভিটা জমিটা ক্রয় করেছেন। কমলা বেগম সারাবছর সবজি, মসলা ও অন্যান্য ফসল আবাদ করেন। ফসলের জমিতে তিনি নিজের তৈরি করা কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন। কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরির কৌশল তিনি শিখেছেন বায়তোরা গ্রামের রূপ্রশীর কাছ থেকে। তিনি আবার তাঁর গ্রামের অন্যান্য কৃষক ও নারীকে শিখিয়েছেন। কমলা বেগম নিজে বীজ সংরক্ষণ করেন। এ বীজ তিনি অন্যের সাথে সহভাগিতাও করেন। শুধু কৃষিকাজ নয়; সামাজিক নানান বিষয়ে বেশ সক্রিয় তিনি। যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে আত্মবিশ্বাসী কমলা বেগম কথা বলতে পারেন। সমাজকর্মী, এনজিও কর্মী, স্বাস্থ্য কর্মী এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সাথে তাঁর রয়েছে ভালো সম্পর্ক। এ সম্পর্কের গুণেই তিনি কোন মানুষের সমস্যা হলে সাথে সাথেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের সাথে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেন কিংবা তিনি নিজেই উদ্যোগ নেন তাদের সহযোগিতা করতে। কমলা বেগমের কাছ থেকে অনেককিছু শেখার আছে আমাদের!

প্রকৃতিপ্রেমিক ইব্রাহিম মিয়া
কমলা বেগমের সাথে নাতিদীর্ঘ আলাপচারিতার পর ছুটে যাই ইব্রাহিম মিয়ার বাড়িতে। তাঁর সম্পর্কে অনেককিছু শুনেছি। মানুষটাকে দেখার আগ্রহ অনেকদিন থেকে ছিলো। সুযোগ পেয়ে তাই হাতছাড়া করতে চাইনি। ইব্রাহিম মিয়াকে বাসায় পাইনি। তিনি তার ক্ষেতের ফসল পরিচর্যা করছেন সেই সময়। তাঁর বাড়ির আঙিনায় এসে দেখতে পেলাম বিচিত্র ধরনের গাছ, ফল, সবজি। বাড়ির চারপাশটা নানান ধরনের ফলদ, ঔষুধি গাছ ও শাকসবজি দিয়ে সজ্জিত, রয়েছে বিভিন্ন বৃক্ষের নার্সারিও। নার্সারি ও বাগানের প্রতিটি উদ্ভিদের গায়েই টাঙানো রয়েছে তাদের নাম ও উপকারিতা। ডন্ড কলস, আষটে গাছ, পিপুল পাতা,শতমুলী, অগ্নিশ্বর, দুধ কচু, অগ্নিশ্বর কলা, থানকুনি পাতা, পাথরকুচি। ঔষুধি গাছের পাশাপাশি কাঁঠাল, আম, সবেদা, লটকন, মেওয়াসহ নানান রকমের ফলদ গাছ রয়েছে। এছাড়া বাড়ির পাশেই একটি আখ ক্ষেত রয়েছে। আখ ক্ষেতের ঠিক আগে মাচায় শোভা পাচ্ছে লাউসহ অন্যান্য সবজির গাছ। মজার বিষয় হচ্ছে, মোট ৫৪টি ফলদ, ঔষুধি ও বনজ গাছের মধ্যে মাত্র দু’টিই রয়েছে কাঠ জাতীয় গাছ। সেগুলো হলো মেহগনি ও নিম। যদিও নিম গাছ নিজেই একটি ঔষুধি গাছ হিসেবে পরিচিত। ঘরের অদুরে একটি টিনশেডে কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করার ব্যবস্থা রয়েছে। তা দেখে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, তিনি স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চা করেন।
Komal
আমাদের আসার খবর শুনে তিনি কাজ ছেড়ে চলে আসেন। শক্ত, সামর্থ্য তবে শান্তশিষ্ট চেহারার মানুষটিকে দেখে বুঝার উপায় নেই যে, তাঁর বয়স প্রায় আশির ঘরে! কিছু বলতে না বলতেই তিনি ঘরের ভেতর থেকে দু’টি চেয়ার ও একটি পিঁড়ি নিয়ে আসেন। বসিয়ে দেন আমাদের। অথচ তিনি নিজে পিঁড়িতে। কোনভাবেই তিনি চেয়ারে বসবেন না। একটু অস্বস্তি লাগছে। তারপরও তাঁর নাছোরবান্দা অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস নেই আমাদের। আন্তরিক আলাপচারিতায় ইব্রাহিম মিয়া তাঁর জীবনের নানান সংগ্রামের কথা জানান। কৃষিকাজ করে কোনভাবে সংসার চালাতে না পেরে তিনি বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। দেশে ফিরে জমানো টাকা দিয়ে তিনি জমি কিনেছেন। আবার কৃষিকাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছেন। নিজে পড়ালেখা করার সুযোগ না পেলেও তাঁর সন্তানদের তিনি পড়িয়েছেন। তারা প্রতিষ্ঠিত। ইব্রাহিম মিয়ার সবচে’ বড় শখ হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ (ঔষুধি, ফলদ, বনজ) সংগ্রহ করা। তিনি যখনই কোন নতুন ও বিরল প্রজাতির গাছ দেখেছেন সাথে সাথেই সেই গাছের চারা ক্রয় করেছেন। তার মতে, প্রকৃতির প্রতিটি উদ্ভিদের মূল্য রয়েছে। কোন উদ্ভিদই ফেলনা নয়। তাই তো তিনি তার বসতভিটা ও জমির আশপাশে কোন উদ্ভিদ নিজে যেমন নষ্ট করেননি তেমনিভাবে অন্য কাউকে নষ্ট করতে দেননি! তার মতে, শুধু ফল ও কাঠ গাছই আমাদের জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের ভালোভাবে বাঁচার জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে বাড়ির আশেপাশে জন্মানো গাছ, লতাপাতাসহ নানা জাতের উদ্ভিদের। এ গুলোকে যেন আমরা আগাছা মনে করে নষ্ট করে না ফেলি সেই আহ্বান তাঁর। তাঁর মতে, আমাদের আশেপাশে যে সব গাছগুলো আপনা-আপনি জন্মে ,সেই গাছ কখনো আমাদের নিরাপদ খাদ্যের যোগানদাতা আবার কোন কোন গাছ আমাদের রোগমুক্ত রেখে শরীরকে করে তোলে স্বাভাবিক কর্মপোযোগী। আন্তরিক ইব্রাহিম মিয়ার কাছ থেকে শিখেছি কীভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উদ্ভিদকে যতœ করতে, ভালোবাসতে!

গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে। এসব উন্নয়ন কর্মকা-ে অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের বিষয়টি মাঝে মাঝে আলোচিত হয়। কিন্তু নৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি? আমার মনে হয় না এটি খুব বেশি গুরুত্ব পায় ! অথচ ‘উন্নয়ন’ এর মূলকথায় হচ্ছে মানুষের সার্বিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করা। এই ‘সার্বিক’ বিষয়টির মধ্যে নৈতিক বিষয়টিই প্রধান। মানিকগঞ্জে দু’একদিনের এই সফরে এসব মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে নৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি এসব মানুষের কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি। তারা শুধু মানুষকে নয়, প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিকে চরম মমতায়, আন্তরিকতায় ভালোবেসেছেন নানান সমস্যার আবর্তে পরেও! নিজের ও প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ যেন ভালো থাকে সেজন্য তারা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। সংগ্রাময় এই জীবনে তারা তাদের নৈতিক উন্নয়ন সাধনে কোন ধরনের অবহেলা করেন না। তাই তো আলাপচারিতায় তাদের আন্তরিকতা, আমাদের সাথে তাদের সৌহার্দ্য সম্পর্ক এবং আমাদেরকে স্বাদরে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাদের যে ইতিবাচক মানসিকতার প্রতিফলন আমি দেখেছি তাতে মনে হয়েছে ‘উন্নয়ন’ এর সংজ্ঞাটি তাদের কাছ থেকে আমাদেরকে শিখে নিতে হবে। কারণ আমরাই তো নানান প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের সার্বিক উন্নয়ন সাধনের কাজ করে যাচ্ছি উন্নয়নকর্মী হিসেবে। তাদের সাথে মিথস্ত্রিয়ায় আমরা যেন আরও আন্তরিক হই, আরও দায়িত্বশীল হই এবং আরও মানবিক হই সেটিই যেন আমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন কমলা বেগম বা ইব্রাহিম মিয়া! তাদের এই পথচলা আরও মসৃণ হোক, আরও গতিশীল হোক এবং আরও অর্থময় ও সফল হোক এ কামনা করি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.