সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন আত্মমগ্ন শিল্পীর কথা

মানিকগঞ্জ থেকে এম. আর. লিটন

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা, ধূলা যতই হোক তার অবহেলা। এই বিশ্ব সংসারেও সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ আর প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে প্রতিভা। কাউকে ছোট করে দেখার নেই, অবহেলা করার কিছু নেই। এ সমাজে প্রতিটি মানুষের অবদান রয়েছে সে অবদান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হতে পারে।
আমরা কাউকে পাগল বলি এবং অবহেলা করি। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না যাকে আমি পাগল বললাম অবহেলা করলাম তার মধ্যেও সৃজনশীলতা বা প্রতিভা থাকতে পারে।
এমন একটি বাস্তবতার কথা বলছি। ১৪ জুন। ২০১৬। দুপুর। ঘিওর সরকারী কলেজের সামনে রাস্তায় অনেক লোকের ভীড়। আর ভীড়ের মাঝে একটি লোক লুঙ্গি ও টিশার্ট পরা। গলায় ঝুলানো একটি চাদর মাথার চুল এলোমেলো। সবাই তাকে পাগল বলছে। লোকটি বসে আছেন নিশ্চুপ। আপন মনে রাস্তার মাঝেই আকছেন আল্পনা এবং সুন্দর করে লেখা বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তি।

1
তার আল্পনা ও লেখার উপাদান কয়লা, খুওয়া (ইটের ছোট টুকরো), গাছের সবুজ পাতা এবং চক। তার এই সৃষ্টি কর্ম দেখে মনে হয় দামি রঙ ও তুলি দিয়ে আকা এবং লেখা।
তিনি যে উক্তিগুলো লিখেছেন সেগুলোর কয়েকটি হলো, ‘জগতের সব মানুষ সমান না, সব মানুষও মানুষ না।’ পাশে আরো লেখা, ‘শত ব্যথার মাঝেও যে হাসি, সে হাসি অনেক দামী।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘এমন জীবন তুমি করিও গঠন, মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন।’ তার অসাধারণ আল্পনা ও সুন্দর লেখা দেখে সবাই বিস্মিত হয়েছেন। ভাবছেন একজন পাগল হয়েও কি সুন্দর আল্পনা এবং তার লেখা।

তখন রোজার মাস ছিল তাই লিখেছেন, ‘রোজা থাকি তো তাই … খাবার খেতে সমস্যা হয়, যদি কারও মন চায় কিছু ঐবষঢ় সব’। কয়েকজন ওই লোকটিকে ৫-১০ টাকা দিতে দেখা যায়। আবার লিখেছেন, “মুছিবেনা, উড় ঘড়ঃ ডরঢ়ব’, ‘দেখা হলে ভীড় ছেড়ে চলে যান।’

2.1
লোকটির আল্পনা ও সুন্দর লেখা দেখে অনেক লোক ভীড় জমায়। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে তার অপূর্ব আল্পনা ও লেখা। অনেককে আবার ছবি তুলতে দেখা যায়।
লোকটির নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করি, কিন্তু কোন কথা বলে না। একটু পর আল্পনার পাশে লেখে, ‘ছন্ন ছাড়া মন আর কোথাও দাঁড়ায় না, যেখানেই যাই মানুষ বলে পাগল। কথা বলার মত মন মানসিকতা সবসময় থাকে না।’ লোকটি তার নিজের সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখেছেন, ‘বাড়ি ছিল দক্ষিণবঙ্গে, বিশাল একটি নদীর তীরে। জেলা বরিশাল, সব বাড়ি সয়-সম্পত্তি সব খেয়ে নিয়েছে নিষ্ঠুর নদীতে। নাম- কাদের, ১৯৯০ সালে ইন্টার।’

3
কাদের সম্পর্কে এতো টুকুই জানতে পারি। আর এটাও জানি, ‘আজ পুঁজিবাদ সমাজে কাদের এর মত মানুষের মূল্য নেই। হয় তো তাকে সবাই পাগল বলেই জানবে। আধুনিকতার রঙে কাদেরের কয়লা, খুওয়া, গাছের সবুজ পাতা ও চকের কোন মূল্য নেই। তবু তুমি এঁকে যাও এবং লিখে যাও। প্রতিটি রাস্তায় বাংলাদেশের হৃদয়জুড়ে ভয় কি? কবিগুরু বলেছেন,“ যে তোকে পাগল বলে তাকে তুই বলিস না কিছু”।

happy wheels 2
%d bloggers like this: