Posted in

জোয়ার-ভাটা অনুসরণ করে চলে স্কুলে আসা যাওয়া

দেবদাস মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি, উপকূল অঞ্চল :

সড়ক নেই, আছে কেবল বিস্তৃর্ণ খাল আর বিল। এমন জনপদে কোমলমতী শিশুদের স্কুল চলে জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর করে। জোয়ার ভাটা নির্ণয় করে চলে এ জনপদের স্কুল। শিক্ষার্থী স্কুলে আসে খালে ও বিলে জোয়ার আসলে। স্কুলে আসা যাওয়ার বাহন একমাত্র নৌকা। সে নৌকা আবার শিশুরা নিজেরাই চালিয়ে নেয় স্কুলের পথে। এমন ঝুঁকি নিয়ে উপকূলীয় পিরোজপুরের প্রত্যন্ত নাজিরপুর উপজেলার বিল অঞ্চলের ১৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের লেখা পড়া চলছে। জোয়ার ভাটার এ জীবনে সামান্য ঢেউয়ে নৌকা উল্টে যাওয়ার শঙ্কা আছে। আছে জীবন হারানোর ভয়। তবুও ঝুঁকি নিয়েই রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার একমাত্র বাহন কেবল নৌকা। শিক্ষার্থীরা ছোট-ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সারাবছর স্কুলে আসা-যাওয়া করে।

স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, নাজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বিল অঞ্চল দেউলবাড়ী ও দোবড়া ইউনিয়ন সংশ্লিষ্ট ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কোন সড়ক যোগাযোগ নেই। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এগুলো হচ্ছে: ১১নং উত্তর গাওখালী আমভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২১নং মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩২নং মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২নং সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩নং বিলডুমরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৭নং পদ্মডুবি শিশু শিক্ষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬৫নং বিলডুমরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩৬নং পদ্মডুবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আছে ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়গুলো হচ্ছে: আমভিটা বালিকা নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ত্রিগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সোনাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিলডুমরিয়া-পদ্মডুবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আর মাদ্রাসা ৩টি হচ্ছে- ডুমরিয়া-নেছাারিয়া আলীম মাদ্রাসা, ডুমরিয়া-নেছারিয়া বালিকা সিনিয়র মাদ্রাসা ও মনোহরপুর মোহাম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসা। এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীদের সারাবছরই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা যাওয়া করতে হয়।

এসব এলাকায় বর্ষাকালের চিত্র চারিদিকে পানি আর পানি। আবার শীতকালে বিল শুকিয়ে মরা। খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। তখন হাজির হয় ভিন্ন সমস্যা। কোন বাহনই চলে না তখন। তখন জোয়ার-ভাটায় নির্ণয় করে দেয়া হয় স্কুলের সময়সূচি। অর্থাৎ- খালে জোয়ার এলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যায় এবং জোয়ার শেষ হওয়ার আগে অথবা পরবর্তী জোয়ারে তাদের বাড়ি ফিরতে হয়। পরবর্তী জোয়ার পেতে অনেক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে আসে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হওয়ায় স্কুলে টিফিন নিয়ে আসে না কেউ। বিলাঞ্চল হওয়ায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমও নেই এখানে। ফলে শিশুরা ক্ষুধার তাড়না নিয়ে ক্লাস করে।

স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল জানান, এখানকার স্কুলের শিক্ষার্থীরা অনেকে পানি খেয়েই পেট ভরে রাখে। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারে না। তাই ফলাফলও ভালো হয় না। তাছাড়া উপস্থিতিও কম। আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম গাজী বলেন, ‘এখানকার শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়েই নৌকায় করে বারোমাস স্কুলে আসে। অনেকসময় নৌকা ডুবে যায়। তবে বিলাঞ্চল হওয়ায় জীবনের প্রয়োজনে শিশুরা সাঁতার জানে; এ কারণে হতাহতের ঘটনা তেমন ঘটে না।’ উপজেলার ১১নং উত্তর গাওখালী আমভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক গোকুল চন্দ্র বেপারী জানান, খালে ভাটা হলে পানি শুকিয়ে যায়। তাই এক ঘণ্টা আগে স্কুল ছুটি দিতে হয়। ওই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সৃষ্টি বড়াল বলে, “আমাগো নৌকা ছাড়া স্কুলে যাওয়া আসার কোন উপায় নাই। খুব কষ্ট করে স্কুলে আসি। আবার কষ্ট করেই বাড়ি ফিরি। নৌকায় চড়তে রোজ ভয় লাগে।” ত্রিগ্রাম সম্মেলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কথা হয় ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের সাথে। তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি কম।

স্থানীয় অভিভাবক শাহাবুদ্দিন বাহাদুর জানান, বিলাঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। অধিকাংশ স্থান বর্ষা মৌসুমে ডুবে থাকে, নৌকা ছাড়া যাতায়াতের উপায় থাকে না। শীত মৌসুমে খালে পানি থাকে না। তখন অবস্থা আরো খারাপ হয়। জোয়ার-ভাটা দেখে স্কুলে যেতে-আসতে হয়। আবার নৌকা কিনে স্কুলে যাওয়ার মতো অবস্থা অনেকের নেই। অনেকসময় যে জায়গায় স্কুল সেখানে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য কোনো নৌকাও পাওয়া যায় না। এ পরিস্থিতিতে অনেক শিশু বর্ষায় স্কুলে যেতে চায় না বা তাদের অভিভাবকরাও তাদের পাঠাতে চায় না। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষা বিভাগ থেকে বর্ষাকালে স্কুলে যাতায়াত করার জন্য যান্ত্রিক নৌকার ব্যবস্থা করা উচিত।

স্থানীয়রা বলছেন, বিলাঞ্চলের মানুষ এক সময় না খেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটালেও আজ আর তারা না খেয়ে থাকেন না। ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি আবিস্কারের ফলে এ অঞ্চলের মানুষ তিন বেলা পেটপুরে খেয়ে ভালোই দিন কাটাচ্ছেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষায় উন্নতি করতে পারছে নাজিরপুরের বিলাঞ্চলের মানুষরা।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার মো. ওয়ালী উল্লাহ জানান, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা বিলাঞ্চল হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ কম। তাই অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়। তবে পূর্বে আরো খারাপ অবস্থা ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে ও চলমান রয়েছে। পুরো ইউনিয়নকে সড়ক যোগাযোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি কাজ করছেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কৃষ্ণপদ সরকার বলেন, ‘সড়ক যোগাযোগ না থাকায় বিলাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কষ্ট করেই স্কুলে আসা-যাওয়া করে। এ কারণে স্কুলে উপস্থিতিও কম।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.