Posted in

দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই বড় কথা-বোম ফুটি মর্জিনা

তানোর, রাজশাহী থেকে মো. শহিদুল ইসলাম শহিদ 

নাম কী? বোম ফুটি। এ আবার কেমন নাম? কোন মানুষের নাম কী এমন হওয়া সম্ভব? হ্যা, সম্ভব। রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার উপজেলা ক্যাম্পাস সংলগ্ন শিতলী পাড়ায় বসবাসকারী ৫৮ বছর বয়সী মর্জিনা’র নামই বোম ফুটি। তার নাম যে মর্জিনা তা এই এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানে না। কিন্তু, কেন তার নাম বোম ফুটি? কারণ তার এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প। তবে বোম ফুটি (মর্জিনা) কী মুক্তিযোদ্ধা? সে প্রশ্নের উত্তর হয়ে থাকুক আর এক প্রশ্ন ঐতিহাসিক এবং নতুন প্রজন্মের কাছে।

স্বাধীনতার পর মর্জিনা এলাকার মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন বোম ফুটি নামে। ৭১ সালে বোমের আঘাতে উড়িয়ে গেছে মর্জিনার বাম পা ও বাম হাতের একটি আঙুল। শুধু তাই নয় উড়ে গেছে বুকের একটি অংশও। ফেলে রাখা বোমা বিষ্ফোরণে মর্জিনার শরীরকে শুধু ক্ষত বিক্ষত করেনি; নিজের নামটিও সকলের কাছে ঢাকা পড়েছে। সহায় সম্বলহীন মানুষটি ছোট বেলা থেকেই জীবন অতিবাহিত করার জন্য তাই বেছে নিতে হয়েছে ভিক্ষার পথ। এমনটিই জানালেন বোম ফুটি পরিচয়ে পরিচিত মর্জিনা।
2
মর্জিনা’র এ  দূর্ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় অধিবাসী মো. আফসার আলী (৬৫) বলেন, ‘যুদ্ধের সময় তানোর থানা যেখানে অবস্থিত সেখানে পাক বাহিনীরা অবস্থান নিতেন। মুক্তি বাহীনিরা তাদের বিতাড়িত করার জন্য এলাকার রাস্তা বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে বোমা মেরে ভেঙে ফেলেন এলাকার সকল ব্রীজ ও কালভার্ট। পরবর্তীতে দিনের বেলায় পাক সেনারা অন্য জায়গায় চলে গেলে সেই সুযোগে গোপনে তাদের আস্তানায় বোমা পেতে রাখেন। এছাড়াও পুড়িয়ে দেন তাদের আস্তানাটি। পাশাপাশি এই এলাকায় যেন পুনরায় যাতে আস্তানা না গড়তে পারে সে উদ্দেশ্যে বাংকারে বোমা পেতে রাখেন। এমনি অবস্থায় শীতলি পাড়ার মর্জিনা নামক মেয়েটি খড়ি (জ্বালানি) সংগ্রহের জন্য যান তানোর থানার পাশে। বাংকারে পেতে রাখা বোমা বিষ্ফোরিত হয়ে জ্ঞান হারান তিনি। সেই থেকেই পঙ্গু হন মর্জিনা।’

নামের মতো তার স্মৃতিতে এখনো তরতাজা হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তি বাহিনীদের সম্পর্কে মর্জিনা বলেন, “আমাদের বিলের ধারে মুক্তি বাহিনীরা এসে সংগঠিত হতেন। তাদের সাথে আমার দেখা হতো, কথাও হতো। আজ তারা অনেকেই বেঁচে নেই। যেমন- তানোর হিন্দু পাড়ার মৃত নিশিত ও কার্তিক। তবে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন; যেমন ত্রিনাথ, টুকু আরও অনেকে।” তিনি আরো বলেন, “তখন তো খাবার পানির এতো ভালো ব্যবস্থা ছিল না। পানি আনতে হতো অনেক দূর থেকে। তাঁরা ক্লান্ত হয়ে এসে পানি চাইতেন। আমি ছোট তাই হয়ে দৌঁড়ে গিয়ে তাদের খাবার পানি এনে দিতাম। আমার অসুস্থতার খবর শুনে তারাই আমার চিকিৎসার জন্য জরুরিভাবে রাজশাহী হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয় তাঁরা চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তাও করেছিলেন।”
IMG_20170111_122846
শারীরিক অবস্থার সাথে সাথে তিনি কখনোই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি সংসার গড়েছেন। তার একটি মাত্র ছেলে সন্তান। ছেলেকে বিয়েও দিয়েছেন। নাতি নাতনি নিয়ে ৬ সদস্যের পরিবার। বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘৫-৬ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছি। তাই আমাকে এখন বিধবা ভাতা হিসেবে মাসে ৪০০ (চারশত) টাকা সহায়তা পাই। যার পুরাটাই আমার ঔষধ খরচেই লেগে যায়।”

সারাটা জীবন পার গড়েছেন অন্যের কাছে থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে। অন্যভাবে বললে ভিক্ষাবৃত্তি করে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আগে আমার শক্তি ছিল। তখন এই গ্রাম ঐ গ্রামে গিয়ে হাত পেতে কিছু সংগ্রহ করতে পারতাম। বর্তমানে সেই শক্তিও হারিয়েছি। ছেলে দিন মজুরি করে তার ৫ সদস্যের পরিবার চালাতে হিমশিম খায়। আবার আমার দায়িত্বও পড়েছে তার উপরেই। আমি আগের মত মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতেও পারি না। তাই অসুস্থ্য জীবনে টানাপোড়নের মধ্যেই জীবন পাড়ি দিতে হচ্ছে আমাকে।”

তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অভাব-অনটন কোনটাই নিয়ে তার কোন অভিযোগ নেই। কারো কাছে কোন চাহিদা বা প্রত্যাশাও নেই। ইচ্ছা ও প্রত্যশা সম্পর্কে তিনি বলেন, “দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই বড় কথা। বর্তমান অবস্থায় বড় ইচ্ছা ও প্রত্যাশা কোনটিই আমার নেই। অসুস্থ্য জীবনে তিন বেলা তিন মুঠো ভাত ও ঔষধ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেই বাকি জীবনটা হয়তো সুখেই কাটাতে পারতাম।”

ইতিহাসের উল্লেখিত জীবন্ত উপাদান হয়ে মর্জিনা আমাদের মাঝে বেঁচে আছে বোম ফুটি নামে। তার এই অদ্ভুত নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকথা। বোমফুটি বেঁচে থাকুক আরো বেশ কিছুদিন। আর বাঁচিয়ে রাখুক মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে। জানি না তার এ ঘটনা কোথাও লেখা আছে কিনা! কিন্তু, জীবিত অবস্থায় এ রকম হাজোরো বোম ফুটির গল্প আমাদের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষরণ সতেজ ও প্রবাহমান রাখুক-এটুকুই প্রত্যাশা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.