সাম্প্রতিক পোস্ট

জলাবদ্ধতাকে জয় করেছেন আশুরা

সাতক্ষীরা থেকে শাহীন ইসলাম ও ফজলুল হক

বেতনা পাড়ের একটি গ্রাম মাছখোলা। সাতক্ষীরা জেলা সদরের গ্রামটিতে প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস। কৃষকেরা বছরে দু’বার ধান চাষ, বসতভিটায় সবজি, পুকুরে মাছ ও গবাদিপশু পালন করে নিশ্চিত করত শান্তিময় জীবনযাত্রা। কিন্তু সুখের জীবনে নেমে আসে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ। জেলা সদরের প্রায় ৫০টি গ্রামের মানুষ ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় জীবনযাপন করছে। এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবার উপায় হিসেবে আশুরা সৃষ্টি করেছে একটি সমন্বিত কৃষি খামার। যা এলাকার অনেকের কাছেই উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
1
২০০০ সাল হঠাৎ করে  মাছখোলা গ্রামে জলাবদ্ধতা বাড়তে থাকে। বেতনা নদী ভরাট হওয়ায় বিগত ৫/৬ বছর মানুষ বর্ষার ধান চাষ করতে পারে না। বছরের ৬ মাস বাড়ির উঠান, ঘরবাড়ি, পুকুর, গাছপালা, সবজি ক্ষেত, কৃষি জমি জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা কার্যক্রম। খেলার মাঠ, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাটে সর্বত্র জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ। মানুষসহ সকল প্রাণীকে সংগ্রাম করে চরম ভোগান্তিতে বেঁচে থাকতে হয়। ভেসে যায় পুকুর ও খামারের মাছ। গাছপালা মরে গিয়ে বিপন্ন হযে পড়ে মানুষসহ সকল প্রাণীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। যেহেতু জমিতে বেশি পানি আটকে থাকে, ধান চাষ সম্ভব হয় না, জমি পড়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধ সহনশীল মাছ, ধান, সবজি ও ফলের সমন্বিত কৃষি খামার তৈরির স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসে এই গ্রামের আশুরা।

আশুরার ভাবনা ছিল একটি সমন্বিত কৃষি খামার করতে পারলে পরিবার নিয়ে জলাবদ্ধতার ভেতরেও শান্তিতে বসবাস করা যাবে। এই প্রসঙ্গে আশুরা বলেন, “একদিন আমার স্বামী আমাকে এক হাজার টাকা জোগাড় করে দিতে বলে। কি করবে জানতে চাইলে বেতনার নদীর পাশে একটি পুকুরের মাছ কেনার কথা বলেন।” তিনি আরও বলেন, “আমি পুকুরটি দেখতে চাই। পুকুরে আদৌ মাছ কিনা তা সরজমিনে দেখার পর তার হাতে এক হাজার টাকা তুলে দেই। ঐ পুকুর থেকে ৩৭ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হয়। আর দেরি না করে প্রতিবেশি ভন্টু চাচার ৫ বিঘা জমি লিজ নেই এবং আমার স্বপ্নের কাজ শুরু করি”। পুকুর আর মাছ চাষ দিয়ে শুরু করেলেও খুব দ্রুতই ৫ বিঘা জমি নিয়ে একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন বেতনা পাড়ের মাছখোলা গ্রামের আশুরা। জলাবদ্ধতার সমস্যা বিবেচনা করে লিজ নেওয়ার পর আশুরা পরিকল্পনা করে চারিধারে মাটি কেটে দুই হাত উঁচু ভেড়ি তৈরি করেন।
2
খামারের পশ্চিম পাশে ভেঁড়িতে লাউ, কুমড়া, ঢেড়স, বরবটি, করলা, পিপে চাষ, পূর্ব পাশে কচু চাষ, উত্তর পাশে আম, নারিকেল, কলার চাষ করেছেন। সুতার মাচায় লতানো সবজি আর ভেঁড়িতে ঢেড়স, থানকুনি, পেপে। খামারে রুই, মৃগেল, কাতল, সিলভারকাপ, গ্লাসকাপ, মনোচেক, তেলাপিয়া, ট্যাবলেট, কালবোস, কই, শোল, টেংরা, পুটি, গলদা চিংড়ি মাছের চাষ। খামারের চারিধারে সানচি, কলমি ও ঘাসের বিছানা। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছের উপযোগী আবাসস্থল। যেখানে গলদা চিংড়ির থাকার জায়গা, সেখানের শাক, ঘাস ও লতাপাতা পরিস্কার। পানি পরিস্কারের জন্য খামারে ছেড়েছে শামুক। আরো আছে ঢ্যাব শাপলা, যা গলদার প্রিয় পুষ্টিকর খাবার। ফলে, গলদার চেহারা খুব ভালো হয়, দামও পাওয়া যায়। খৈল, ভূষি, পালিশ, খুদ মিশ্রিত খাবার ছাড়াও রুই কাতলা, সিলভারকাপ, গ্লাসকাপ, মনোচেক, তেলাপিয়া, ট্যাবলেট, কালবোস, কই, শোল, টেংরা, পুটি মাছের জন্য শামুক, ঢ্যাব, শাপলা, সানচি, কলমি ও ঘাস অতিরিক্ত খাবার জোগায়। বছরে এক বার বিঘা প্রতি ১৮/২০ মণ ধান উৎপাদন করেন। খামার থেকে পরিবারের ৫ সদস্যের মাছ ও সবজির চাহিদা পূরণ হয় এবং বছরে লাভ থাকে প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা। বিগত ৩ বছর ধরে সমন্বিত কৃষি খামারটি পরিচালনা করছেন আশুরা।

তিনি বলেন, “আমি প্রতিবছর আমার খামারের ভেঁড়িবাধ মেরামত করি। মাটি কেটে ভেড়ি উঁচু করি। ফলে জলাবদ্ধতায় খামার ভেসে যাওয়ার চিন্তা থাকে না। কিন্তু এ বছর দুই দিন টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া, পানি সরানোর পথ বন্ধ থাকায় দেখতে দেখতে প্রচন্ড পানি বেড়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, “প্রস্তুতি না নিতে পারায় অনেক মানুষের মাছের খামার ভেসে যায়। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। ভুব ভোরে খামারে যেয়ে দেখি ভেসে যায় যায় অবস্থা। সাথে সাথে ছেলে বউ মেয়ে জামাইকে সাথে নিয়ে প্রথমে সানচি, কলমি ও ঘাস ছিড়ে খামারের ভেঁড়ির উপর এক হাত উঁচু করে দেয়। এর ফলে পানি চুইয়ে গেলেও মাছ চলে যাওয়া বন্ধ হয়। এরপর নেট কিনে ও ধার করে খামারের চারিধারে ৩ হাত উঁচু করে ঘিরে দেয়। যাতে মাছ ফাঁসাতে না পারে।”
3
আশুরা বলেন,“আমার ভিটে একটু উঁচু। প্রথম জলাবদ্ধতায় পানি উঠতে পারিনি। কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ বসতবাড়ির উঠানে পানি উঠে যায়। একমাস বন্দী জীবনযাপন করতে হয়। তখন থেকে প্রতি বছর নিজেরা মাটি এনে এবং কখনও টাকা খরচ করে বসতভিটার মাটি উঁচু করতে থাকি।” তিনি আরও বলেন, “এ বছর আমার বসতভিটায় পানি উঠতে পারিনি। আশেপাশের অনেক পরিবারের একশ’ হাঁস মুরগি আমাব বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি। বস্তা, ঝুঁড়ি ও মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে খাচ্ছি। সবমিলে ভালোই আছি।”

আশুরার সমন্বিত কৃষি খামার এখন পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতার হাত থেকে কিভাবে আশুরা তার খামার রক্ষা করেছে এলাকার মানুষ তা জানতে ও দেখতে আসছে। অনেকে পরামর্শ নিচ্ছে। কৃষক আব্দুর জব্বার ও কৃষাণী ঝর্ণা আশুরার পরামর্শ নিয়ে তাদের খামারও রক্ষা করেছে। সবাই মুখে এখন কেবল আশুরাকে  প্রশংসাই শোনা যায়।
উল্লেখ্য, জলাবদ্ধ সহনশীল সমন্বিত কৃষি খামার তৈরিতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ প্রদানে বারসিক সাতক্ষীরা আশুরাকে সহায়তা করছে। আশুরা প্রমাণ করেছে পরিকল্পনা ও বুদ্ধি করে পরিশ্রম করলে জলাবদ্ধতার অভিশাপ মুক্ত জীবনযাপন করা যায়।

happy wheels 2
%d bloggers like this: