সাম্প্রতিক পোস্ট

নানান ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে আমাদের

সাতক্ষীরা, শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল দুর্যোগ প্রবণএলাকা হিসাবে পরিচিত। এই এলাকায় প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা। এ উপজেলাটি সমুদ্রকূলবর্তী হওয়াতে এখানে যেমন লবণাক্ততার মাত্রা বেশি তেমনি আবার নানান ধরনরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এখানকার দুর্যোগের মধ্যে আছে নদী ভাঙন, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিস। প্রতিনিয়ত এই এলাকার মানুষ এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কখনো তারা সফল হচ্ছেন আবার কখনো তারা বিফল হচ্ছেন। প্রতিবছর তাদের নানান ধরনের সম্পদের ক্ষতি হয়। এ যেন প্রকৃতির সাথে ঠিকে থাকা তাদের এক সংগ্রাম।


গত জুলাইয়ে উপকূলীয় এলাকায় অতিবৃষ্টি হয়। এ অতিবৃষ্টিতে এলাকার বিভিন্ন স্থান প্লাবিত হয়। সেখানে বিভিন্ন স্থানের মতো সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়। সেখানে বসত ঘর থেকে শুরু করে পুকুর, চিংড়ি ঘের, সবজির ক্ষেত, খাল, বিল, উঠান, গোয়াল ঘর, বীজতলা পানিতে একাকার হয়ে যায়। অনেক ধরনের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। সবচে’ বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়েছিলো কৃষকের। কারণ উপকূলীয় এলাকায় ধান চাষের প্রধান মৌসুম আমন যা সাধারণত জুন-জুলাই মাস থেকে শুরু হয়। এসময় কৃষকেরা ২-৩ বার করে বীজতলা করেও ভারী বৃষ্টির কারণে কোন ফসল ফলাতে পারেননি।


অতিবৃষ্টি পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বিশেষ করে কালমেঘা, জয়নগর, কাঠালবাড়ি, কাচড়াহাটি, হায়বাতপুর, চিংড়াখালী গ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে একক ও দলীয় আলোচনার মাধ্যমে আমন মৌসুমরে ধানের বর্তমান অবস্থা, কি ধরনের সমস্যার সম্মুখিন পড়তে হচ্ছে এসব বিষয় জানার চেষ্টা করা হয়। সেখানে তারা নানান ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, ‘করোনার জন্য আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি। আমাদের আয় রোজগার কমে গিয়েছিলো। নিজেদের সঞ্চয় টাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছে। এখনো সেসব ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। তারপর ভারি বৃষ্টিতে আমন ধানরে ক্ষতি হয়েছে। এতে করে আমরা আরো বেশি করে ঋণের মধ্যে পড়েছি। আবার বাড়িতে যে সম্পদ ছিলো বিশেষ করে গবাদি পশু সেগুলোও কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। এরকম নানান ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে আমাদের। এখান থেকে যে কিভাবে বের হতে পারবো তা ভাবলে কষ্ট আরো বেড়ে যায়।’


এ প্রসঙ্গে ভুরুলিয়া ইউনিয়নের কাচড়াহাটি গ্রামের কৃষক রমেশ গায়েন বলেন, ‘আমরা কৃষক মানুষ। কৃষি কাজ করে আমাদের সংসার চলে। নিজেদের জমিজমা বলতে দেড় বিঘা জমি। তার মধ্যে একবিঘা ধানের জমি এবং আরো ৩ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে মোট ৪ বিঘা জমিতে প্রতিবছর আমন ধান লাগাই। সেখানে প্রায় ৭০ মণের মতো ধান পেতাম যা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে বিক্রি করতে পারতাম। এবছর ভারী বৃষ্টির কারণে ৩বার করে লাগিয়ে কোন গাছ বাঁচাতে পারিনি। পরে আগস্ট মাসের শেষের দিকে অন্যরা লাগানোর পরে যে পাতা বেঁচেছিলো তা দিয়ে ১০ কাঠা জায়গায় ধান লাগাতে পারি। তার অবস্থাও ভালো না।’ তারা আরও বলেন, ‘পরিবারে ৪জন সদস্য এবং ৩টি গরু, ১২টি হাঁস, ৪টি ছাগল আছে। একদিকে আমাদের মানুষের যেমন খাদ্যের সমস্যা তেমনি গবাদিপশুর খাদ্যের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা খুবি কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন সংসার চালানোর জন্য ঋণ করে একটি মটর ভ্যান কিনতে হয়েছে। আমার মতো এরকম সমস্যা আমাদের গ্রামের অনেকের। ধান না হওয়াতে আমাদের বড় ধরনের সমস্যার সন্মূখিন হতে হয়েছে।’


কাশিমাড়ি ইউনিয়নের কাঠালবাড়ি গ্রামের গৌরপদ ও আফরোজা বেগম বলেন, ‘এই সময়ে আমাদের প্রায় বাড়িতে কম বেশি করে ধান ওঠা শুরু হতো। আর এবছর জলাবদ্ধতার কারণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যে ধান বিলে আছে তা যে কি হবে তা বলা যাচ্ছেনা। এবছর খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেওয়ার উপক্রম হচ্ছে। এতে যেখানে আমাদের মানুষের খাদ্যের সংকট, সেখানে গবাদি পশুর খাদ্য কিভাবে যোগাড় করবো। এর জন্য গবাদি পশু বিক্রি করে দিতে হচ্ছে।’


শ্যামনগর উপজেলার কালমেঘা গ্রামের কৃষক প্রফুল্ল মন্ডল বলেন, ‘আমরা নানান সমস্যায় জর্জরিত। এবছর শুধু ধান লাগাতে যা খরচ করেছি তা প্রতিবারের তুলনায় প্রায় ৪-৫ গুণ বেশি। ভারি বৃষ্টির কারণে যেখানে নিজ এলাকায় দুইবার বীজতলা চেষ্টা করেও করতে পারিনি। পরে এলাকার বাইরে আত্মীয় বাড়িতে বীজতলা করার চেষ্টা করি এবং সেখান থেকে ধানের পাতা বাড়িতে এনে লাগানোর আগে আবার ভারি বৃষ্টির কবলে পড়তে হয়। এরকম বারবার চেষ্টা করে আমরা সফল হতে পারিনি। সব মিলিয়ে এবছর আমাদের কালমেঘা এই বিলে ধান নেই বললে চলে। বর্তমান যে অবস্থা তাতে কি করে যে খাদ্যের চাহিদা পূরণ হবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।’


কাশিাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের কৃষাণী শাহানারা বেগম ও রোজিনা বেগম বলেন, ‘এবছর ধান না হওয়াতে আমাদের বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়িতে শুধু যদি ভাতের ব্যবস্থা হতো তাহলে অন্যান্য উপকরণ যেমন তরকারী গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে অন্যের বাড়িতে থেকে তরকারী চেয়ে কোন রকমে সংসার চালানো যেতো। এখন ধান না হওয়াতে খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়া শুরু করেছে। এতে করে আমরা আরো বেশি ঋণের মধ্যে পড়বো। কারণ খাদ্য ছাড়া তো আর চলা যাবে না। তাই খাদ্যের জন্য সব। আমাদের যেনো সমস্যার কোন শেষ নেই।’


উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে নিরন্তর সংগ্রাম করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কোন একটি দুর্যোগ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না উঠতে নতুন করে সমস্যা এসে হাজির হয়। সব কিছুর পরও নিজেদের আগ্রহ ও চেষ্টাকে পুঁজি করে তাদের সামনের দিকে এগিয়ে চলা। বিগত সময়ে উপকূলীয় এলাকায় ঘটে যাওযা ভারী বৃষ্টিপাতে অন্যান্য সম্পদের মতো প্রধান মৌসুম আমন ধান চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার বিরূপ প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: