সাম্প্রতিক পোস্ট

খরা মোকাবেলায় অভিযোজন কৌশল হিসেবে মালচিং-এর ব্যবহার

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তথা রাজশাহীসহ রংপুর বিভাগের কিছু জেলা নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল গঠিত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য আলাদা। ভূগঠন যেমন-উঁচু নীচু মাঠ, খাড়ি, এটেল মাটি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। এই অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুবই কম। এর ফলে উর্বরতা, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা ও শোষণের ক্ষমতা কমে যায় এবং খরার প্রকোপ বেশি হয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ুর আঞ্চলিক অভিঘাতের কারণে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়াসহ দীর্ঘ সময়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং সেচ নির্ভর কৃষি ফসলকে বেশি গুরুত্ব দেবার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলকে মারাত্মক খরা প্রবণ করে তুলছে। খরা এবং পানি সংকটের কারণে স্থানীয় কৃষকগণ নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খরা মোকাবেলায় উদ্যোগ গ্রহণও শুরু করেছেন। স্থানীয়ভাবে কৃষকগণ শস্য ফসলের চাষেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। তাঁরা কম পানি নির্ভর শস্য ফসলের চাষাবাদ শুরু করেছেন। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই পানি সংকট ও খরা মোকাবেলায় নানা সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার ঘন ঘন প্রার্দুভাব এই এলাকার একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরেন্দ্র ভূমিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এলাকা ও বছর ভেদে ভিন্ন হয়েও থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮১ সালে রেকর্ডকৃত বৃষ্টির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,৭৩৮ মিমি, কিন্তু ১৯৯২ সালে ছিল ৭৯৮ মিমি। বৃষ্টিপাতের বণ্টনও স্থান ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। তাই বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের মধ্যে খরাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শস্য ফসলের উপর তা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এই পরিবর্তন এখনো চলমান। তথ্যানুযায়ী- বরেন্দ্র অঞ্চলে কমছে বৃষ্টিপাত, বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রকৃতির এই দুই অনুষঙ্গের বিপরীতমুখী অবস্থানে বসবাসযোগ্যতা হারাচ্ছে মানুষ ও প্রাণী। বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। ১৯৬৪ সালের পর থেকে প্রতি বছরই এ অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক শূন্য ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এ অঞ্চলে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে ২০২০ সাল নাগাদ বার্ষিক তাপমাত্রা বাড়বে আরো দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০৫০ সাল নাগাদ বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বর্তমান সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাবে। গত ৫০ বছরের তাপমাত্রা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জানুয়ারি ছাড়া বাকি ১১ মাসেই তাপমাত্রা বেড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। (সূত্র:বণিক বার্তা,অক্টোবর ৩১, ২০১৭)।
কিন্তু শত দূর্যোগের মধ্যেও বরেন্দ্র অঞ্চলের সচেতন অভিজ্ঞ কৃষক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতায় এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে নানা অভিযোজন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে শস্য ফসল উৎপাদন করে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে খরার প্রকট এবং পানিসংকট মোকাবেলায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের শস্য ফসলে মালচিং পদ্ধতি তেমন একটি অন্যতম অভিযোজন কৌশল। যা দিনে দিনে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রত্যক্ষ মাঠ পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞ কৃষক, বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী পানি সংকটাপন্ন বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা মোকাবেলায় অভিযোজন কৌশল হিসেবে ফসলে মালচিং-এর ব্যবহার ও পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবেদন করছেন বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চল প্রতিনিধি মোঃ শহিদুল ইসলাম

কৃষিতে মালচিং মানে কি?
‘মালচ’ কথার অর্থ মাটি ঢেকে দেয়া। আর এ পদ্ধতিটিকে বলে মালচিং। প্রচুর পরিমাণে বাষ্পীভবন বা ক্ষয় প্রতিরোধে মাটি সমৃদ্ধ করা, আগাছা বৃদ্ধির বাঁধা ইত্যাদির জন্য গাছের চারপাশে মাটিতে ছড়িয়ে পড়া খড়, লতা পাতা,কম্পোস্ট বা প্লাসটিক শীট হিসাবে একটি আচ্ছাদন। খরা মোকাবেলা, পোকার উপদ্রুপ, কীটনাশকের ব্যবহার কমানোয় কৃষিতে মালচিং বা আচ্ছাদন পদ্ধতিতে চাষাবাদের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। মূলত পুরোনো, শুকনো বা কাঁচা পাতা, বিচালি বা খড়, কচুরিপানা ইত্যাদি দিয়ে মাটি ঢেকে দেওয়ার পদ্ধতিই হলো মালচিং। মালচিং নতুন কোন পদ্ধতি নয়। অনেক আগে থেকেই খরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গাছের বা চারাসহ সবজির গোড়া রসালো রাখতে কৃষকগণ খড়, কচুরীপানাসহ বাড়িতে জৈব আবর্জনা ব্যবহার করতো। মালচিং পদ্ধতি আবিষ্কার করেন গ্রামের কৃষকগণই। এটি আগে থেকেই আমাদের দেশে চালু আছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলসহ খরাপ্রবণ এলাকার কৃষকগণ এই মালচিং ব্যবহার করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে কৃষকগণ একে ‘খরা পদ্ধতি’ বলে থাকেন। গ্রামের বেশিরভাগ কৃষকগণ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে মালচিং করে থাকেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে স্থানীয় সম্পদ বা মালচিং উপকরণ কমে যাবার কারণে ও কৃষির আধুনিকীকরণ হওয়ায় বর্তমান দেশে প্লাস্টিক মালচিং-এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদে কৃষকগণ প্লাস্টিক মালচিং বেশি ব্যবহার করছেন। মালচিং এর ফলে ফসলের দ্রুত বৃদ্ধি হয়। তাছাড়া, ভালো ফলনের জন্য মাটি ঢেকে দিয়ে আবাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়। মালচিং ব্যবহারের ফলে পানির ব্যবহার কম লাগে। এটি খরা মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

মালচিং বা আচ্ছাদন-এর ধরণ
সাধারণত মালচিং বা আচ্ছাদন দুইভাবে করা হয়। একসময় কৃষকগণ তাঁর আশপাশের সহজপ্রাপ্য উপকরণগুলো দিয়ে মালচিং করতেন। কিন্তু কৃষির আধুনিকিকরণ হওয়ার কারনে বর্তমানে প্লাস্টিক মালচিং এর ব্যবহার দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে মালচিং সাধারণত দুই ধরনের পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। জৈব মালচিং পদ্ধতি এবং অজৈব মালচিং পদ্ধতি।

জৈব মালচিং
জৈব মালচিং এমন উপকরণ যা একবার জীবন্ত উদ্ভিদ উপকরণ ছিল যা মাটি পৃষ্ঠায় ক্ষয়, আগাছা অঙ্কুর প্রতিরোধ এবং বায়ু চলাচল কমাতে পারে। গাছের ছাল বা পাতা, শুকনো ঘাস, কম্পোস্ট, ভালোভাবে পচানো রান্নাঘরের আবর্জনা, কাঠ চিপস, সংবাদপত্রের মতো জৈব পদার্থ বা অব্যবহৃত পেপার কাগজ, কচুরিপানা, ধান বা গমের খড়, নাড়া ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উপকরণ দিয়ে যে মালচিং বা আচ্ছাদন দেয়া হয় সেটিকে জৈব মালচিং বলে।

জৈব মালচিং ও ব্যবহার পদ্ধতি
স্থানীয় কৃষকদের দেয়া তথ্য মতে এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে জানা যায়, নদী বা খাল থেকে কচুরীপানা তুলে রেখে দিয়ে পানি ঝরিয়ে নিয়ে শুকালে সেটি আচ্ছাদন হিসেবে ভালো হয়। খড় বা নাড়াকে শুকিয়ে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত বীজ আলুর ক্ষেত্রে বা ফসলের বীজ রোপণের পর পরেই বা চারা রোপণের পরপরই ৪-৬ ইঞ্চি পুরু করে আচ্ছাদন দিতে হবে। আবার সতর্ক থাকতে হবে আচ্ছাদন বেশি হলে গাছ বের হতে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় গাছের গোড়ার বা বীজের গজানোর জায়গায় প্রয়োজনীয় জায়গা একটু ফাকা রাখা ভালো । অন্যান্য গাছের গোড়া, সবজির বেড এবং ফলবাগানে গাছের গোড়া হতে এক থেকে দু’ইঞ্চি (২.৫০-৫.০ সে.মি) দূরে বিভিন্ন ধরনের মালচ ব্যবহার করা যেতে পারে। মালচিংয়ের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদার্থ অবশ্যই ৫ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি) এর বেশি পুরু করে দেয়া ঠিক নয়। শুকনো খড়, লতাপাতা বা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কচুরিপানা ব্যবহার করতে দেখা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চল তথা রাজশাহীর অধিক সবজি উৎপাদনকারী পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের কৃষক রায়হান জুয়েলসহ বিভিন্ন কৃষকগণের কাছে তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, তাঁরা এখন পর্যন্ত সেই আদিকাল থেকে খরা মোকাবেলায় জৈব মালচিং ব্যবহার করেন। স্থানীয় কৃষকগণ জৈব মালচিং পদ্ধতির নাম বলেন ‘খরা পদ্ধতি’। খরা মোকাবেলায় অভিযোজন কৌশল হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার হয় বলেই তাঁরা এটিকে স্থানীয়ভাবে ‘খরা পদ্ধতি’ বলেন। লতাজাতীয় শাকসবজির ক্ষেত্রে খরা মোকাবেলায় বেড এবং গোড়া পদ্ধতিতে জৈব মালচিং ব্যবহার করেন। মুলা, আলু, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত্রে বেড পদ্ধতি ব্যবহার করেন। আবার যেগুলো লতানো গাছ বা সবজি গাছ যেমন লাউ, কুমড়া, করলা, পেঁপে, পটলসহ বিভিন্ন সবজিতে গাছের গোড়ায় এক থেকে দুই ফিট বা তারও কম এলাকাজুড়ে দুই-তিন ইঞ্চির কম বা বেশি জৈব মালচিং বা আচ্ছাদন দেন। লতানো গাছগুলো বেশিরভাগ বাহানে (জাংলা) তুলে দেয়া হয়। তাই সেই গাছের গোড়ায় মালচিং করা হয়। মূলত খরাকালীন সময়ে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে কৃষকগণ এই মালচিং ব্যবহার করে থাকেন।

Organic Mulching-Barind tract

জৈব মালচিং এর সুবিধা
দ্রুত বীজ অঙ্কুরোদগম
জৈব পদ্ধতিতে মালচিং করে মাটি ঢেকে রাখার ফলে মাটির ঢাকা অংশের উষ্ণতা রাতে এবং দিনে পরিবেশের সাথে ভারসাম্য ঠিক থাকে। বিশেষ করে খরা এবং শীতকালীন সময়ে অনেক বেশি উপযোগী। ফলে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম দ্রুত সম্পন্ন হয়। এছাড়া খরাকালীন সময়ে মালচ ব্যবহার করলে মাটিতে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হয়।

রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস
গাছ এবং ফসলের খাদ্য হিসেবে জৈব মালচিং বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জৈব মালচিং এর উপকরণ সহজে পচে যাবার কারণে অনেক সময় নীচের অংশে কম্পোস্ট সার বা জৈবসারের ভূমিকা পালন করে। আর এই কম্পোস্ট এর সুবিধা হলো একসময় মাটির সাথে মিশে গিয়ে গাছের বা ফসলের জৈবসার হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব ও পরিপূরক খাদ্য পাবার কারনে গাছ তরতাজা এবং রোগ ও পোকা আক্রমণের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করায় রোগ পোকার আক্রমণ কম হয়। কীটনাশকের প্রয়োগ করা লাগেনা।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি
সঠিকভাবে জৈব মালচিং ব্যবহার করলে ফসলে আগাছার পরিমান কমে যায়। জৈব মালচিং ব্যবহার করলে একদিকে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিসহ আগাছা বৃদ্ধিরোধসহ ফসলের খাদ্য উৎপাদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। খরাকালীন সময়ে সেচ কম লাগে। এর ফলে পানি সাশ্রয় হয় এবং ফসল চাষাবাদে সেচ খরচ কম হয়, লাভ হয় বেশি।

পোকা নিয়ন্ত্রণ
সঠিকভাবে জৈব মালচিং প্রয়োগে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণও রোধ করা যায়। জৈব মালচিং এর সাথে নিমপাতা বা নিমের বীজগুড়া বা অন্যান্য জৈববালাই এর উপকরণ ছিটিয়ে দিলে পোকার আক্রমণ কমে যায়।

নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত খাদ্যের যোগান
জৈব মালচিং এর ফলে যে ফসল ফলে সেখানে রাসায়নিক বা কীটনাশক কম বা না দিলেও হয়। বা অনেক সময় সঠিকভাবে জৈববালাই ব্যবহার করে রাসায়নিক কীটনাশকমুক্ত শাকসবজি, ফল বা অন্যান্য শস্য ফসল উৎপাদন করা যায়। যা পরিবেশ এবং মানুষসহ সকল জীবের জন্যে অনেক বেশি উপযোগী।

জৈব মালচিং এর সীমাবদ্ধতা
কোন কোন ফসলে জৈব মালচিং এর ক্ষেত্রে অনেক সময় ইঁদুরের আক্রমণ হতে পারে। বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া যেন পানি জমে না যায় সেদিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। জৈব মালচিং যেহেতু বিভিন্ন শুকনো খড়, পাতা বা শুকনো জৈব উপাদান ব্যবহার করা হয় সেহেতু বিভিন্ন কীটপতঙ্গকে বেশি আকৃষ্ট করতে পারে। আবার অনেক সময় শুকনো পাতা বা খড়ের কারণে মাকড়সা এবং মাইটস (অতি ক্ষুদ্র পরজীবী কীটবিশেষ) উপস্থিতি সহজ হতে পারে। জৈব মালচিং এর ক্ষেত্রে অনেক সময় খড়, শুকনো ঘাস, লতাপাতা ব্যবহার করা হয়। এগুলোর সাথে সেই প্রজাতির বীজ থাকতে পারে। যা একসময় মাটির সংস্পর্শে এসে বীজ অঙ্কুরোদগম হতে পারে এবং আগাছা হতে পারে। তাই মালচিং এর উপকরণ নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।

Organic Mulching-B-1

অজৈব মালচিং
সাধারণত অজৈব মালচিং বলতে জৈব উপকরণের বাইরে যেসকল উপকরণ দিয়ে মালচিং করা হয় তাকে অজৈব মালচিং বলে। অজৈব মালচিং হিসেবে প্লাস্টিক, ইটের টুকরা, পাথর ভাংগা, নুড়ি পাথর বা ছোট বড় পাথর ইত্যাদি উপকরণ গাছের বা চারার গোঁড়ায় দিয়ে মাটির পানি শোষণ বা বাষ্পীয় ক্ষমতা হ্রাস করা যায়। অজৈব মালচিং এর মাধ্যমেও মাটিতে পানির ধারণ ক্ষমতা উন্নত এবং মাটি ক্ষয় প্রতিরোধ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। জৈব মালচিং যতোটা না মাটির পুষ্টি যোগানে সহায়তা করে অজৈব মালচিং ততোটা করে না বলে জানা যায়। অজৈব মালচিং এর মধ্যে সব থেকে বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে প্লাস্টিক মালচিং। বর্তমান সময়ে প্লাস্টিক মালচিং এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বৃহৎ আকারে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করতে কৃষকগণ এই প্লাস্টিক মালচিং বেছে নিচ্ছেন। আমাদের দেশের এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখানে অজৈব মালচিং হিসেবে প্লাস্টিক মালচিং এর ব্যবহার ও পদ্ধতি বিষয়ে তুলে ধরা হলো।

অজৈব প্লাসটিক মালচিং পদ্ধতি ও ব্যবহার
কৃষিতে আধুনিকীকরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্লাস্টিক মালচিং-এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এটি আধুনিক চাষাবাদের একটি উন্নত পদ্ধতি। এর ফলে ফসলের দ্রুত বৃদ্ধি হয়। তাছাড়া, ভালো ফলনের জন্য মাটি ঢেকে দিয়ে আবাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মতো বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ, রক মেলন, ক্যাপসিকাম, টমেটো, স্ট্রবেরি, ফুলকপি ও বাঁধাকপি উৎপাদন করা শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে বৃহৎ পরিসরে চাষাবাদের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক মালচিং পদ্ধতি অবলম্বন করে অনেক খরচ কমানো সম্ভব।

image-84244--

প্লাস্টিক মালচিং পদ্ধতি
সাধারণ মালচিং এর চেয়ে প্লাস্টিক মালচিং একটু ভিন্ন। পলিথিন জাতীয় এ সীটের উপরের রঙ সিলভার এবং নিচের রঙ কালো। সবজি চাষের ক্ষেত্রে এটি উপযোগী পদ্ধতি। বেলে, দোআঁশ ও অন্যান্য মাটির ক্ষেত্রে এটি উপযোগী পদ্ধতি। একটি সারির জন্য পাতলা প্লাস্টিকের থান দূরত্ব অনুযায়ী কেটে নিতে হবে। আর এই থানের উপর ফসল অনুযায়ী ফুটো করে নিতে হবে। এরপর ফসলভিত্তিক প্রয়োজনীয় জৈব সার বেশি পরিমাণে রাখতে হবে, যাতে কোনও নুড়ি, পাথর, ঢেলা না থাকে। এরপর একটি করে থান শিট মাটির উপর বিছিয়ে দিতে হবে। শিটের ধারগুলো চার থেকে ছ’ইঞ্চি মাটির গভীরে ঢুকিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হবে। যা প্লাস্টিকগুলোকে মাটির সঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এবার ফুটোগুলোর ভিতর দিয়ে বীজ বা চারা রোপন করতে হবে। মালচিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হলো ড্রিপ বা বিন্দু সেচ। যদি তার সুযোগ না থাকে তাহলে এক একটি সারির পর ছোট নালা তৈরি করেও সেচ দেওয়া যায়। প্লাস্টিকগুলো ৬-৭ বার একই ধরনের ফসলের চাষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব।

প্লাস্টিক মালচিং পদ্ধতি ব্যবহারের সুবিধা
পানি সংরক্ষণ
ফসলের ক্ষেতে আর্দ্রতা সংরক্ষণে মালচিং বিশেষভাবে উপকারী। কারণ প্লাস্টিক মালচিং ব্যবহারের ফলে মাটির রসের বাষ্পায়ন প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে মাটির উপরিতল থেকে যে পরিমাণ পানি বাষ্পীভূত হয়, তা ওই প্লাস্টিকের আবরণে বাধা পেয়ে ঘনীভূত হয়। যা বিন্দু বিন্দু জলকণায় পরিণত হয়ে আবার মাটিতেই ফিরে আসে। এতে জমিতে দু’টি সেচ পর্বের ব্যবধান বাড়ানো সম্ভব হয়। ফলে সেচ কম লাগে অর্থাৎ সেচের খরচ কম হয়। সেচ বা বৃষ্টির পানি শুধুমাত্র প্লাস্টিকের ফুটো করার অংশ দিয়ে শিকড়ের কাছের অংশের মাটিতে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে পানির যথাযথ ব্যাবহার ও সংরক্ষণ সম্ভব হয়। ভিতরের রঙ কালো হওয়ায় পানি ধরে রাখার পাশাপাশি এই রঙের কারণে গাছের শিকড় বৃদ্ধি পায়। ফলে উৎপাদন হয় বেশি। এ পদ্ধতিতে ৭০% পর্যন্ত পানির অপচয় কমানো যায়।

Plastic-Malching-b

আগাছা নিয়ন্ত্রণ
প্লাস্টিক মালচিং এ যেহেতু ফুটো করা অংশ দিয়ে গাছ বেড়িয়ে আসে। মাঝের ঢাকা অংশে থেকে আগাছা বের হতে পারে না। প্লাস্টিক যদি কালো রঙের হয় তবে সূর্যালোক ঢুকতে পারে না। ফলে সালোকসংশ্লেষণ করতে না পারায় মাঝের অংশের আগাছা মারা যায়। ফলে আগাছানাশকের জন্য শ্রমিকের খরচ কমে যায়।

পোকা নিয়ন্ত্রণ
মালচিংয়ের ফলে পোকার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিমাটোড বা ফসলে কৃমির আক্রমণ রোধ হয়। পলিথিন জাতীয় এ সীটের উপরের রঙ সিলভার এবং নিচের রঙ কালো। সিলভার রঙ হওয়ায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় ফলে পোকা বসতে পারে না। গাছে পোকা ধরে কম।

সার ব্যবহার হ্রাস
এই পদ্ধতি ব্যবহারে শিকড়ের কাছের স্থানে সার প্রয়োগ করার জন্য চাষে সার প্রয়োগের পরিমাণ ও সংখ্যাও অনেক কমে যায়। ফলে খরচ কমানো সম্ভব হয়।

দ্রুত অঙ্কুরোদগম
প্লাস্টিক শিট দিয়ে মাটি ঢেকে রাখার ফলে মাটির ঢাকা অংশের উষ্ণতা রাতে এবং শীতকালে পরিবেশের থেকে বেশি হয়। ফলে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম দ্রুত সম্পন্ন হয়। এছাড়া শীতকালে মালচ ব্যবহার করলে মাটিতে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব।

ফলের রং ধারণ
প্লাসটিক মালচিং এর প্রতিফলিত আলো ফলের রঙ ধারণে সহায়তা করে।

প্লাস্টিক মালচিং এর সীমাবদ্ধতা
কচুরিপানা, জৈবসার, খড় ইত্যাদির অপেক্ষা প্লাসটিক মালচিং ব্যয়সাপেক্ষ। গ্রীষ্মকালে কালো বা মোটা প্লস্টিক ব্যাবহার করলে উষ্ণতা বেড়ে যায়। ফলে চারা পোড়া বা শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

মালচিং পদ্ধতি ব্যবহারে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকের সফলতা
পানি সংকটাপন্ন ও খরা প্রবণ রাজশাহীর গোদগাড়ি এবং পবা উপজেলার কৃষকদের সাথে আলোচনা ও প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় কৃষকগণ খরা মোকাবেলায় জৈব এবং অজৈব দুটি পদ্ধতিতেই মালচিং ব্যবহার করছেন। রাজশাহীর গোদগাড়ি উপজেলার তরুণ কৃষক মুনির দীর্ঘ তিন বছর থেকে প্লাসটিক মালচিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উচ্চ ফলনশীল শাকসবজি এবং ফলের আবাদ করছেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে গোদগাড়ির দেওপাড়া ইউনিয়নের চৈতন্যপুর এবং ঈশ্বরীপুর গ্রামে বারো মাসি তরমুজ, স্ট্রবেরী, রকমেলনসহ বিভিন্ন সবজি ও ফলের চাষ করেন প্লাসটিক মালচিং পদ্ধতিতে। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে কৃষক মুনিরের তত্ত্বাবধায়কের মতে জানা যায়, বিগত বছরে তিন বিঘা জমিতে রকমেলন, বারোমাসি তরমুজসহ বিভিন্ন সবজি ও ফলের আবাদ করেছিলেন। আগামী মৌসুমেও তিনি জমিতে রকমেলনসহ বারোমাসি তরমুজের আবাদ করবেন বলে জানা যায়। তথ্যানুযায়ী জানা যায়, তরুণ কৃষক মুনিরের এই ধরনের পদ্ধতি এলাকার অন্যান্য কৃষক দেখার কারনে তারাও শুরু করেছেন। তার এই অভিজ্ঞতা অন্যান্য কৃষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চল খরা প্রবণ ও পানির সংকট হওয়ার কারণে তিনি এই কৌশল ব্যবহার করেন। তথ্যানুযায়ী তিনি প্লাস্টিক মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করার কারণে জমিতে রাসায়নিক সার, কীটনাশকসহ সেচ কম লেগেছে। ফলে তার উৎপাদন খরচ কমেছে একই সাথে ফলন ভালো হওয়ায় লাভ বেশি হয়েছে। অন্যদিকে সবজি উৎপাদনে বিখ্যাত রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের অনেক কৃষক জৈব মালচিং বেশি ব্যবহার করেন।

??????????????????????????????????????????????????????????

সবজি উৎপাদনকারী রায়হান কবির জুয়েল বলেন, ‘আমরা সাধারণত ছোট ছোট আকারে ‘খরা পদ্ধতি’ (মালচিং)ব্যবহার করি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশেষ করে যখন বেশি খরা হয়, পানির সমস্যা দেখা দেয় তখন সবজির চারা উৎপাদনে, সবজির গাছের গোড়ায়, ফলের গাছের গোড়ায় বিশেষ করে পটল, পেঁপে চারা রোপণের সময়, লেবুর গাছ, শিম, টমেটো, করলাসহ বিভিন্ন সবজির গোঁড়ায় শুকনো বা ভেজা খড়, কচুরি পানা দিয়ে ঢেকে রাখি। যাতে মাটি রসালো থাকে বেশি সময়, সেচ কম লাগে। এতে করে গাছ পুষ্ট থাকে, পানি সেচ কম দেয়া লাগে।

উপসংহার
বরেন্দ্র অঞ্চলে অধিক পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে কোন কোন এলাকায় মারাত্মক পানি সংকট দেখা দিয়েছে। আবার সার্বিক ক্ষেত্রে বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা এবং পানি সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের আঞ্চলিক অভিঘাত বরেন্দ্র অঞ্চলেও আঘাত হেনেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ স্থানীয় কিছু ভূল উন্নয়ন উদ্যোগের কারণে দিনে দিনে পানি সংকট এবং খরা মারাত্মক আকার ধারণ করছে যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপ্রবণ লাল মাটিতে পানি সংকটের কারণে কৃষকগণ ফসল চাষে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই মালচিং পদ্ধুতিতে ফসল উৎপাদন করে বাঁচানো যায় পানির অপচয়। একই সাথে পরিবেশবান্ধব কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের লাভের দিকটিও বিবেচনায় আসবে। তাই খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক পর্যায়ে মালচিং পদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সম্প্রসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করতে পারে। সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সমন্বিত উপায়ে কাজ করা প্রয়োজন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: