সাম্প্রতিক পোস্ট

বায়োস্কপ সম্রাট একজন আতোয়ার রহমান

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম
বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার সীমাহীন এবং বহুমূখী। এই ভান্ডারে রয়েছে বিভিন্ন রকমের গান, নাটক, সামাজিক যাত্রাপালা, উৎসব, পার্বণ এছাড়াও রয়েছে অঞ্চলভিত্তিক নানামূখী গল্পের আসর ও স্থিরচিত্র। এই সকল বিষয়কে আলোড়িত ও গণমূখী করতে বায়োস্কপ এক বিশাল মাধ্যম। যখন সমাজে প্রযুক্তির ছোয়া ছিলনা তখন বায়োস্কওয়ালাদের বেশ কদর ছিল।


হারিয়ে যাওয়া সেই অমুল্য ঐতিহ্যের সংরক্ষক ধারক ও বাহক মানিকগঞ্জ অঞ্চলের ঘিওর উপজেলাধীন পয়লা গ্রামের পাষাণ ফকির ও রুবী বেগমের একমাত্র পুত্র বায়োস্কপ স¤্রাট একজন আতোয়ার রহমান (৪৯)। আতোয়ার রহমান বলেন, ‘আমার বাবা ও দাদার প্রধান পেশা কৃষি। নিজের সামান্য জমি ও অন্যের জমি ভাড়া ও বর্গা নিয়ে চাষবাস করি। কৃষি কাজও সারাবছর থাকে না। গান বাজনা ও নাটক অভিনয়ে আমার বাবা পাষাণ পাগলা বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমারও বেশ ঝোঁক রয়েছে। বাবা বিভিন্ন আসরে নিয়ে আমাকে যেতেন। মূলত আমিই তার অনুসারী। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে মানুষের আনাগোনা বিশেষ করে বায়োস্কপ দেখার জন্য পাড়ার ছেলেমেয়েরা ভিড় করত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবার মাধ্যমেই বায়োস্কপের ইতিহাস জানলাম। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ সাংস্কৃতিকমনা। সারাবছর মেলা, খেলা, গান বাজনা উৎসব পার্বণ লেগেই থাকত। বাবা কিছু খেলাও জানতেন। সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। ধান কাটতে দাওয়ায় গিয়েছিলেন হাওর অঞ্চল সিলেটে সেখানে একটি অনুষ্ঠানে বায়োস্কপ এর ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হন। তারপর বাড়িতে এসে কাঠ ও টিন, কাচ, তারকাটা দিয়ে একটি বায়োস্কপ তৈরি করেন ১৯৫০ সালে। তারপর বিভিন্ন জায়গা থেকে যাবতীয় উপকরণ সংগ্রহ করে বাবা নিজেই হয়ে ওঠেন বায়োস্কপের করিগর। আমিও তার কাছে বিদ্যা শিখে এ পর্যন্ত কতবার যে বাক্স ভাঙলাম গড়লাম তার হদিস নাই।’

আতোয়ার রহমান জানান, বায়োস্কপ প্রদর্শনের আগে মানুষ জমাইতে হয়। তার জন্য ভেপু বাঁশি বাজান তিনি। এরপর ‘সিনেমা আছে দেইখা যান, রাজপরিরা হাসিতেছে জি¦নের বাদশা আসিতেছে, কি সুন্দর ভাই লাগিতেছে… এ জাতীয় বাক্য জোরে জোরে বলতেন সবাই আকৃষ্ট করার জন্য। এভাবে তিনি তার বায়োষ্কোপে নানান ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেন ‘ভালো কি চমৎকার লাইগা গেলো’, ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসি হলো দুঃখের সাগর নাইমা এলা’, ‘ধীরে ধীরে দেখা গেলো ফাসিঁর দড়ি গলে ছিলো’, আইন বেটা খাড়া ছিল, ফসিঁর হুকুম হইয়া গেলো, কি চমৎকার দেখা গেলো, ধীরে ধীরে খেলা হলো, তারপরেতে দেখেন ভালো মক্কা শরিফ আইসা গেলো’। এছাড়াও বাড়িতে ছেলেমেয়েরা বাবা-মা, দাদা-দাদীকে কিভাবে সম্মান করবে, প্রবীণ অধিকার কি, লঙ্ঘন করলে তার শাস্তি কি হতে পারে এবং সর্বদায় নবীনরা প্রবীণদের অভিজ্ঞতা যাতে গ্রহণ করে তার জন্যও গান করেন। তিনি জেলা ও জেলার বাইরে অসংখ্যবার সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে বায়োস্কপ প্রদর্শন করেছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, গাজীপুরে, ঢাকা সেনানিবাসে, ঢাকা বিমানবন্দরসহ বারসিক’র প্রবীণ অধিকার কর্মসূচি ও প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের আয়োজনে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের সাথে বায়োস্কপ প্রদর্শনের সুযোগ হয়েছে।
আতোয়ার রহমান বলেন, ‘বায়োস্কপ আমার নেশা, রক্তের মধ্যে মিশে থাকলেও সারাবছর কাজ পাই না, বায়নাও কম হয়, ঠিকমত বুঝে পাইনা, সম্মান আছে অফুরান্ত এটি বুঝানো যাবে না। আমি যখন বায়োস্কপের আসরে আসি কচি ছেলে মেয়ে থেকে শুরু করে আবার বৃদ্ধা-বণিক সবাই মুগ্ধ হয়। আমিও অনুপ্রাণিত হই। দেখার পর পয়সা চাইলেই অনেকেই অখুশি হয়। অঞ্চলভিত্তিক ৫, ১০ ও ২০ টাকা পর্যন্ত টিকেট করি। অনেক মানুষ দেখে কিন্তু টাকা নেয়ার সময় লোক কম থাকে। আগের চেয়ে মানুষ বেশি চালাক। শুধু মাগনা চায় টাকার বিনিময়ে খরিদ করতে চায় না। তারপরও মানুষের মাঝে থাকতে ভালোবাসি বিধায় এই চর্চার মাধ্যমে মানুষের মাঝে আনন্দ খুজে বেড়াই।’

তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই শিল্পকে আরো আধুনিক ও গতিশীল করা সম্ভব। আমার স্বপ্ন হলো যতদিন আছি বাবার দেয়া বিদ্যা ভুলব না, রপ্ত করব, তবে আমার পরিবার থেকে মনে হয় না কেউ শিখবে। আগ্রহ করে কেউ আসেও না শিখতেও চায়না, আমি চাই আমার মত আরো আতোয়ার রহমান তৈরি হোক। কারণ বায়োস্কোপ হলো সাংস্কৃতিক জাগরণের বিশাল হাতিয়ার। সমাজ আধুনিক হয়েছে, যুবকদের হাতে দামি মোবাইল এসেছে, নেট এর ব্যাবহার বাড়ছে কিন্তু খেলাধুলা, মেলা, পার্বণ ও সাংস্কৃতিক চর্চা আগের মত নাই বলেই যুব সমাজ মাদকাসক্ত হচ্ছে। নারীসমাজ ইভটিজিংসহ নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদ। আমার মনে হয় সমাজ ক্রমশই অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। আমি এই প্রথাগুলো ভাঙতে চাই বলেই এখনো সাহস করে বায়োস্কোপ প্রদর্শন করছি যতদিন আছি করে যাব।’
উল্লেখ্য যে, বায়োস্কোপের চার কোণায় একটি টিনের বাক্সে ৬টি কাচের জানালা থাকে। প্রদর্শনের সময় এ জানালা খুলে দিতে হয়। হাত দিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে দর্শনীয় স্থান বা চিত্রকর্ম দেখানো হয়। ছবিগুলো বাক্সের দুই পাশে দুটি ঘুড়ির লাটাইয়ে পেচিয়ে প্রদর্শন করা হয়। সাথে আরো লাগে ভেপু বাঁশি, মন্দিরা, চটক, রিলে ইত্যাদি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: