Posted in

আমার দেশের মাটিও ভাই, সোনার চেয়েও খাঁটি

বরেন্দ্র অঞ্চল-তানোর থেকে অসীম কুমার সরকার

মাটি নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত কাজ করছেন সেই মৃৎশিল্পীদের কাছে মাটি ‘সোনা’র মতোন। যুগের বিবর্তনে যদিও মৃৎশিল্প বিলুপ্তের পথে এবং অনেকে এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন’ তারপরও এখনও কিছু মানুষ আছে যারা তাদের আদি ও ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও বাধাকে অতিক্রম করে। রাজশাহীর তানোর পৌর এলাকার কালীগঞ্জ হাবিব নগর পালপাড়ার গৌতম পাল, শ্যামলী পাল, চমৎকার বালা, মহাদেব পাল, আশা পাল, সঞ্জয় পাল, সহাদেব পালরা এখনও এই পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের কাছে মাটি হলো ‘সোনা’। আর এই ‘সোনা’ দিয়েই মৃৎশিল্পীরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। শুধু প্রয়োজন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মৃৎশিল্পে নতুনত্ব ডিজাইনের সামগ্রী তৈরি করা।

file
গৌতম পালরা সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মাটির ফুলদানী, ব্যাংক, ঝুলন্ত টব, কলমদানী, টেরাকোটাসহ ইন্টারনেট থেকে নিত্য নতুন ডিজাইন দেখে আর নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছেন হরেক রকমের মাটির সামগ্রী। যার চাহিদা এখন রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাপাইনবাবগঞ্জ শহরে। গৌতম পাল জানান, দেশজুড়ে তার মাটির ব্যাংকের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে কোয়ান্টাম ফাউডেশন তার মাটির ব্যাংক সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “যদি মৃৎশিল্পীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাহলে বর্তমান যুগের সর্বাধিক চাহিদা টাইলস বানানো অসম্ভব কিছু নয়।” গৌতম পালের আত্মবিশ্বাস, সরকার যদি তাদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করেন, মৃৎ শিল্প উন্নয়নে যদি বিভিন্ন সংস্থা তাদের পাশে এগিয়ে আসেন এবং অবহেলিত মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাহলে শুধু বাংলাদেশে নয়, যুগোপযোগী ডিজাইনে মৃৎ সামগ্রী তৈরি করে সারাবিশ্বে বিক্রি করা সম্ভব।
সম্প্রতি সরজমিনে তানোর পৌর এলাকার কালীগঞ্জ হাবিব নগর পালপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, মৃৎশিল্পীদের পঁচিশ পরিবারের মধ্যে এখন আঠারো পরিবারে এ পেশায় কর্মরত আছেন। মৃৎশিল্পী শ্যামলী পাল, চমৎকার বালা, মহাদেব পাল, আশা পাল, সঞ্জয় পাল, সহাদেব পাল, অনিতা পালসহ অনেকের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে মৃৎশিল্পের প্রতিবন্ধকতার মূল উৎস মাটির উত্তোলনের সমাধান। এ মাটি উত্তোলন স্বাভাবিকভাবে সম্ভব না হলে শুধু হাবিব নগর থেকে মৃৎশিল্প হারিয়েই যাবে না, চরম বিপর্যয়ে পড়বে আঠারোটি পরিবারের কয়েক শত লোকের জীবন জীবিকা। তারা জানান, শিবনদীর তলদেশ থেকে মাটি নিয়ে সেই পূর্বপুরুষদের আমল থেকে কাজ করে আসছেন। কিন্তু বছরপাঁচেক থেকে সেই মাটি উত্তোলনে বাধা দিচ্ছেন কিছু ভূমি দখলবাজরা। বিশেষ করে, খরা মৌসুমে নদীতে পানির মাত্রা কমে গেলে, নদীর পাড়ঘেঁষে জবর দখল করে ভূমি দখলবাজরা ধান চাষ করেন। ফলে তাদের মাটি উত্তোলন করতে গেলে বাধা দেন। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দিয়ে থাকেন বলে তারা জানান।
এ পেশার মানুষেরা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক এর সহযোগিতায় বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করেছেন।তারা তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ভূঁঞা’কে মৌখিকভাবে এ বিষয়টি জানান।এছাড়া সাংবাদিক, নির্বাচিত প্রতিনিধি স্থানীয় প্রশাসন ও সুধী সমাজের পরামর্শে নিজেরা লিখিত অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পালপাড়ায় ইউএনও মহোদয়সহ পরিবেশ অধিদপ্তরের যুগ্নসচিব এলাকাটি পরিদর্শন করেন। বর্তমান তাদের সংকট কিছুটা হলেও কেটে গেছে বলে তারা জানান।

মৃৎশিল্পীরা তাদের শ্রম, মেধা ও মনন দিয়ে কয়েকটি ধাপে বিভিন্ন মৃৎসামগ্রী তৈরি করে থাকেন। প্রথমে তানোর শিবনদী থেকে মাটি উত্তোলন করে ভ্যান গাড়ি দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তারপর পুরো মাটি এক জায়গায় রাখেন। এরপর মাটিকে চিরা ও সানা করেন। এ দু’টি কাজ সম্পন্ন করার পর তারা মাটির ওজন করেন যাতে একটি দ্রব্যের চেয়ে আরেকটি দ্রব্য বড় না হয়। ওজন ঠিকঠাক  হলে এই মাটিকে পরিশুদ্ধ করেন এবং চাকে পরিশুদ্ধ মাটি বসিয়ে ইচ্ছেমতো মাটির দ্রব্য তৈরি করেন। তৈরিকৃত সামগ্রীগুলোকে ফিনিসিং করে চুলায় দিয়ে মাটির দ্রব্যগুলোকে পোড়ান। সবশেষে দ্রব্যগুলোকে ইচ্ছে মতো বিভিন্ন রঙে রাঙানো হয়।
বর্তমানে গৃহস্থালী মৃৎ দ্রব্যের চাহিদা যেমন অপ্রতুল তেমনি বাজারমূল্য পরিশ্রমের তুলনায় অনেক কম। মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দেশের বাইরে যাতে মৃৎসামগ্রী রপ্তানি করে অর্থনীতির চাকা সচল করা যায় এবং এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ তাদের আদি ও ঐতিহ্যবাহী এই পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে সেজন্য সরকারসহ বেসরকারি সংস্থা ও সর্বোপরি মুক্তমনা মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.