সাম্প্রতিক পোস্ট

জাগো নারী জাগো, বহ্নি শিখা

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

জায়া, জননী, কন্যা-এই রূপেই নারীর পরিচয়। সেটা অতীত। বর্তমানে এই তিনটি রূপকে ছাড়িয়ে নতুন উপমায় নারীতে উপস্থাপন করা হয়। সেই ভিন্ন রূপটি হলো ‘জয়িতা’। হ্যাঁ আমাদের জয়িতাদের কথা বলছি। সমগ্র বাংলাদেশ যাঁদের খুঁজে বের করছে এবং পুরষ্কৃত করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক নারী রয়েছেন যারা বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার সাথে সংগ্রাম করে নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবসকে সামনে রেখে পাঁচটি বিভাগে মোট পাঁচ জন নারীকে ‘জয়িতা’ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

১. অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী
২. শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী
৩. নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী
৪. সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী এবং
৫. সফল জননী নারীÑএই পাঁচটি বিভাগের মধ্যে উপরোক্ত তিনটি বিভাগে বারসিক, নেত্রকোনা কর্ম এলাকার তিনজন নারী ‘জয়িতা’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

গত ৯ ডিসেম্বর আটপাড়া উপজেলা হল রুমে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে এই পুরষ্কার প্রদান করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা শারমীন সিদ্দিকি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেনাজ ফেরদৌস, আটপাড়া থানা অফিসার ইনচার্জ রমিজ উদ্দিনসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ, এনজিও কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী: নাজমা আক্তার, কোনাপাড়া, স্বরমশিয়া
‘জয়িতা’ পুরষ্কার প্রাপ্তদের মধ্যে কোনাপাড়া গ্রামের নাজমা আক্তার। তিনি অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী বিভাগে সম্মাননা পেয়েছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি চার সন্তানের জননী। কৃষিকাজের জমি তেমন নেই। বাড়ির আঙিনা এবং বাড়ির সামনের অল্প জায়গায় তিনি সবজি চাষ করে থাকেন। শ্বশুর বাড়িতে প্রথম এসে যখন তিনি চাষ শুরু করেন, তখন মাটিতে গর্ত করার সময় মাটির নীচে ইট, সুড়কিসহ অনেক ধরনের অজৈব পদার্থ দেখতে পান। IMG_20171209_125109যেখানে গাছ লাগালেও ফসল হতোনা। তারপর তিনি নিজের বুদ্ধিমত্তায় একটি উপায় খুঁজে বের করেন। একটি গর্ত করে সেখানে বাড়ির ময়লা আবর্জনা, গোবর, মাছের আঁশ, কাঁটা ইত্যাদি গর্তে জমা করে রাখতেন। তারপর সেখানে মাটি দিয়ে রাখতেন এবং গাছ লাগাতেন। এতে তিনি বেশ উপকারই পেয়েছেন। গাছ ভালো হতো, ফলনও ভালো পেয়েছেন। নিজের পরিবারে সব্জীর চাহিদা মেটানোর পর তিনি বাজারে কিছু বিক্রি করতে পারেন। পাশ্ববর্তী গ্রাম ম্বরমশিয়ার হাবাদা-১ সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি বারসিক সম্পর্কে জানেন এবং চাষের জন্য ভালো মানের বীজ সহযোগিতার জন্য তিনি বারসিক’র শরনাপন্ন হন। বারসিক তাঁকে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় জাতের সব্জী বীজ দিয়ে সহায়তা করে। পাশাপশি জৈব সার, কীটনাশক তৈরির প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর ইত্যাদির মাধ্যমেও সহযোগিতা করে। এরপর থেকে তিনি নিজে চাষ করার পাশাপাশি গ্রামের অন্যান্য নারীদের মাঝেও বীজ বিতরণ করেন। তাঁর চেষ্টায় নিজ গ্রামে ২০জন নারী নিয়ে একটি জৈব কৃষাণী দল গড়ে তোলেন। এই জৈব কৃষাণী দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার।
সবজি চাষের মাধ্যমে তিনি পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। স্বামীর উপার্জন কম। তাছাড়া নিজস্ব জমির পরিমাণ তেমন নেই। যে কারণে তিনি এই কাজ শুরু করেন। এখন তিনি সফল, কারণ নিজের উপার্জনে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা ও বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে পারছেন। এছাড়াও সংসারের খরচ মেটাতে স্বামীকে সাহায্য করছেন।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী রিকু রানী পাল, বাকরপুর, আটপাড়া
আটপাড়া উপজেলার বাকরপুর গ্রামের মৃৎশিল্প সম্প্রদায়ের একমাত্র নারী যিনি স্নাতককোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সভ্য সমাজে মৃৎ শিল্পীদের ছোট করে দেখা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তাঁদের ‘মানুষ’ বলে মূল্যায়ন করেনা।এ রকম একটি সমাজে এত দূর পড়া লেখা বিষ্ময়কর ব্যাপার। তাছাড়া খুব ছোট বেলায় রিকু রানী পাল এর মা মারা যান। দরিদ্র পিতার সংসারে আর্থিক অভাব অনটনের মাঝে শুধুমাত্র নিজের অদম্য উৎসাহ আর আগ্রহের কারণে তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান। সমাজেন নানা বাধা বিপত্তি সত্বেও রিকু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বর্তমানে তিনি নিজ সম্প্রদায়ের স্কুলগামী শিশুদের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন। নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন একটি ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র”। যেখানে স্কুলের পর শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। সেই কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৩০-৩৫জন শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে। পাঠ্য পুস্তকের বাইরের বিভিন্ন বিষয় যেমন স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিকতা, আচার-আচরণ, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দান করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় নিজের ছোট বোনকেও লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে।

IMG_20171209_125020
বাকরপুর গ্রামে মৃৎ শিল্পীদের একটি সংগঠন আছে। যেখানে বারসিক নিয়মিত যোগাযোগ ও তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং উদ্যোগে সহায়তা করে থাকে। এখানে কাজের সূত্র ধরেই রিকুর সাথে পরিচয়। তিনিও বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর আগ্রহের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে বারসিক বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে। তাছাড়া বিভিন্ন ঐ প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে পুরষ্কার প্রদান করা হয়।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী: গীতা নম দাস, দিয়ারা, তেলিগাতী
লোকায়ত জ্ঞান, স্থায়িত্বশীল চর্চা, নথিভূক্তকরণ ইত্যাদি বারসিক’র নিয়মিত কাজে পাশাপাশি একটি কাজ ছিল গ্রামীণ নারী সম্মাননা। যে সমস্ত নারী উপরোক্ত কাজগুলো ছাড়াও বিলুপ্ত প্রায় পেশা টিকিয়ে রেখেছেন বারসিক তাঁদের সম্মাননা প্রদান করে আসছে। তেমনি একজন নারী দিয়ারা গ্রামের গীতা নম দাস। তিনি প্রায় ৫০ (পঞ্চাশ) বছর যাবৎ ঘানির সাহায্যে তেল তৈরি করছেন এবং তা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। বারসিক সম্মাননা জানানোর পর এলাকার অনেকেই তাঁকে সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছেন।

IMG_20171209_124744
গীতা রানীর বিয়ের কিছুদিন পর তাঁর দু’টি মেয়ের জন্ম হয়। মেয়েদের জন্মের পর তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যায় এবং অন্যত্র সংসার শুরু করে। যতদিন স্বামী তাঁর সাথে ছিলেন ততদিন শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করেছেন। চলে যাওয়ার পর কোনদিন তাঁর খবর নিতেন না। বা মেয়েদের ভরণ পোষণও দেননি। বাধ্য হয়ে তাঁকে সংসার চালানোর জন্য ঘানি ঘুরানোর কাজ বেছে নিতে হয়। গ্রামের অন্যদের বাড়িতেও কাজ করতেন। নিজের থাকার মতো জায়গাও ছিলোনা। গ্রামের এক ধনী বাড়িতে কাজ করে দেওয়ার পাশাপশি সেই বাড়ির একটি ঘরে দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। স্বামী পরিত্যক্তা হওয়ার কারণে এলাকায় তাঁকে অনেক বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি। দৃঢ় মনোবলে কাজ করে গেছেন। গরুর অভাবে তিনি নিজের হাতে ঘানির চাকা ঘুরিয়েছেন। ঘানি ঘুরিয়ে তেল বিক্রি করে জায়গা কিনেছেন। সেই জায়গাতে ঘর তুলেছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। একসময় মেয়েদের নিয়ে সারাদিন উপোস করেছেন। এখন তাঁর কোনো অভাব নেই। ঘরে সারাবছর খাবার মজুদ থাকে। সমাজ তাঁকে এখন মূল্যায়ন করে। তাঁরাই আমাদের জয়িতা।
বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে অনেক নারী আছেন, যারা নিরলস সংগ্রাম করে জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের ক’জনের খবর আমরা রাখি? তাঁরা প্রত্যেকেই রোকেয়া, প্রত্যেকেই জয়িতা। শুধু রোকেয়া দিবসে নয় প্রতিদিন, প্রতি মূহূর্তে আমরা তাঁদের সম্মান জানাই। তাঁদের জীবন সংগ্রামে সাথী হতে না পারলেও অন্তত এই একটি দিবসকে সামনে রেখে সকল নারী জাতিকে অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাই। আর বলি “তুমি এগিয়ে যাও তোমার পথে, নিজে চলার পথ নিজেই সৃষ্টি করো।”

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: