সাম্প্রতিক পোস্ট

হাওর বীজঘর, দুর্যোগে কৃষকের ভরসার কেন্দ্র

নেত্রকোনা থেকে সোহেল রানা ও সুমন তালুকদার

ভৌগলিক কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওর এলাকার নিত্যসঙ্গী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই হাওরাঞ্চলে শাকসবজি ও অন্যন্যা শস্য ফসল চাষ করা কষ্টকর। হাওরাঞ্চলে শুধুমাত্র একটি ফসল বোরো মৌসুমে ধানের চাষ করা যায়। হাওরাঞ্চলে বছরের ৬/৭ মাস পানি থাকায় অন্য কোন ফসলের চাষ হয় না বললেই চলে। বীজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সমস্যা এব্ং মানসম্মত বীজ না পাওয়ায় হাওরের কৃষকরা শস্যফসল চাষে তেমন আগ্রহ দেখায় না। রবিশস্য ফসলের মধ্যে সামান্য পরিমাণে সরিষা, মাসকলাই, বাদাম ও মরিচ এবং সামান্য পরিমাণে শীতকালীন সবজি চাষ হয়। কিন্তু এসব ফসলের অধিকাংশই হাইব্রিড জাতের হওয়ায় এসব ফসলের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করতে না পারায় হাওরাঞ্চলে সবজি ও অন্যান্য শস্য ফসলের বৈচিত্র্য তেমন চোখে পড়েনা। অথচ একক ফসল একমাত্র বোরো ধান চাষ করে হাওরের কৃষকরা প্রায়শই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন দুর্যোগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বারসিক ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে মদন উপজেলার মদন সদর ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নে কার্যক্রম আরম্ভ করে। বারসিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, মতবিনিময় সভা, গ্রামসভার মাধ্যমে হাওরের কৃষকদেরকে ধানের বিকল্প ফসল চাষের জন্য উৎসাহ প্রদান করতে থাকে। বারসিক গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কৃষকদেরকে ধানের বিকল্প ফসলের জাত নির্বাচনের জন্য কৃষক নেতৃত্বে রবি মৌসুমে শস্য ফসলের প্রায়োগিক গবেষণা স্থাপনে সহযোগিতা প্রদান করে। প্রায়োগিক গবেষণার জন্য ২৩টি জাতের শস্য ফসলের বীজ দেখে তাদের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কৃষকরা তাদের জমিতে ও বসতভিটার সামান্য জমিতে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের আগ্রহ প্রকাশ করে সেসব ফসলের বীজের জন্য বারসিক’র নিকট দাবি জানান। কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে এবং বীজ সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে বীজঘরে বীজ ফেরত দেয়ার শর্তে মদন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কৃষক-কৃষাণীদের জন্য তিন মৌসুমে (রবি, খারিপ-১ ও খরিপ-২) ২৮ জাতের সবজি, মসলা ও শস্য বীজ এবং এক জাতের ধান বীজ (ব্রি-৮১) বিতরণ করা হয়।

এলাকার কৃষকরা নিজেরা বীজ উৎপাদন করে বীজঘরে বীজ সংরক্ষণ করবেন ও পরস্পারিক বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের বীজের চাহিদা মেটাবেন, বীজের জন্য বাজার নির্ভরশীলতা কমাবে, কৃষকদের মধ্যে পারস্পারিক ও আন্তঃনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরবর্তীতে মদন ইউনিয়ন ও হাওর অধ্যুষিত গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কৃষক-কৃষাণীরা গ্রামে একটি বীজঘরের অভাব অনুভব করে পারস্পরিক মতানৈক্যের মাধ্যমে দু’টি ইউনিয়ন পর্যায়ে পৃথক দু’টি ‘হাওর বীজঘর’ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের খালাসীপাড়ায় কৃষক আব্দুল হান্নান ও মদন ইউনিয়নের হাওরঘেঁষা উচিতপুর গ্রামের কৃষাণী মোছাঃ রহিমা বেগম বীজঘরে জন্য একটি করে ঘর প্রদানে সম্মতি প্রকাশ করেন।

উল্লেখিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০১৯ সালে মদন উপজেলার মদন ইউনিয়নের উচিতপুরে একটি এবং হাওর অধ্যুষিত গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দশ্রী গ্রামে (খালাসীপাড়া) বীজঘর স্থাপনের জন্য বারসিক’র নিকট থেকে উপকরণ ও বীজ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ (ড্রাম, মাটির হাড়ি, বয়াম, ছিকা) সহযোগিতা পেয়ে কৃষকরা পৃথক দু’টি ‘হাওর বীজঘর’ গড়ে তোলেন। বীজঘর শুরুর দিকে কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে বারসিক’র উদ্যোগে কর্মএলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার থেকে ১৮ জাতের শস্য ফসলের বীজ সংগ্রহ করে হাওর বীজঘরে দেয়া হয়। হাওর এলাকা উপযোগি শস্য ফসলের জাত নির্বাচনে প্রয়োগিক গবেষণা স্থাপনের জন্য বারসিক’র উদ্যোগে ২০১৮ রবি ও বোরো মৌসুমে ৪ জাতের ডাল ফসল (খেসারী, মসুর, ছোলা ও ফরাস), ৮ জাতের মসলা ফসল (শলুক, ধনিয়া, কালিজিরা, মেথি, কিরসী, গুয়ামুড়ি, পিয়াজ, রসুন), ২ জাতের তৈল জাতীয় ফসল (সরিষা ও তিসি), ৩ জাতের শস্য (ভূট্টা, কাউন, যব, গোলআলু) ও ২০ জাতের ধানের বীজ সহায়তা প্রদান করা হয়। হাওরাঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা বীজঘর থেকে তাদের পছন্দের সবজি ও শস্য ফসলের বীজ সংগ্রহ করে নিজেদের জমিতে ও বসতভিটায় আবার কেউ কেউ জলবাবদ্ধ জমিতে বস্তা ও টাওয়ার পদ্ধতিতে এগুলো চাষ করেন এবং উৎপাদিত শস্য ফসলের বীজ সংরক্ষণ করে বীজঘরে বীজ ফেরত দেন।

প্রতি মৌসুমে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, সবজি, শস্য, মসলা ও অন্যান্য ফসলের বীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা শুরু করেন। শুধু নিজ এলাকার নয় অন্য এলাকা বা গ্রাম থেকে বীজ সংগ্রহ করে বৈয়ম, ড্রামে, বোতলে সংরক্ষণ করেন। বীজঘরের বীজ সংরক্ষণ, বিনিময় ও বিতরণের জন্য বীজ রেজিষ্টার, বীজ বিতরণ/বিনিময় রেজিষ্টার সংরক্ষণ করেন। বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, বিতরণ ও অন্যান্য রেজিষ্টার নিয়মিত ও হালনাগাত করে থাকেন। বীজ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বীজ সম্পর্কে ধারনাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সময়ে আলোচনা, মতবিনিময় সভা অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর, প্রশিক্ষণ ও বীজ মেলা, বীজ বিনিময় অনুষ্ঠান করে থাকেন।

২০১৯ রবি ও খরিফ মৌসুমে মদন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষকরা বীজঘর থেকে বীজ সংগ্রহ করে এবং যেসব জাতের বীজ বীজঘরে ছিলনা সেসব জাতের বীজ কৃষকরা পরস্পরের সাথে বিনিময়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে চাষ করেছেন। কৃষকরা পরস্পরের সাথে বীজ বিনিময় করে নিজেদের প্রয়োজনীয় শস্য ফসলের বীজের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে এবং বীজের জন্য তাদের বাজার নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে সক্ষম হচ্ছে। হাওরের কৃষকরা নিজেরা মানসম্মত বীজ উৎপাদন করে সেগুলো বীজঘরে সংরক্ষণ করে মানসম্মত বীজ সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে।

বর্তমানে হাওরে প্রতি ১০০টি পরিবারের মধ্যে ৩০টি পরিবার বীজ সংরক্ষণ করেছে। প্রতি মৌসুমে কৃষক-কৃষাণীরা তাদের উৎপাদিত ধান, সবজি, মসলা ও অন্যান্য শস্য ফসলের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছে। শুধু নিজ এলাকার নয় অন্য এলাকা বা গ্রাম থেকে বীজ সংগ্রহ করে বৈয়াম, বোতল ও কলসিতে সংরক্ষণ করছেন। যেসব বীজ তাদের নেই তারা পরস্পরের সাথে বীজ বিনিময় করে সেসব বীজের সংস্থান করছেন।

হাওর বীজঘর স্থাপনের পর থেকে কৃষক-কৃষাণীরা মৌসুমভিত্তিক শাকসবজি যেমন- করলা, আলু, মরিচ, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, খিরা, শসা, ফুলকপি, বাধাকপি, ডাটা, পালংশাক, পুইশাক, লালশাক, ঢ়েড়স, শালগম, ইত্যাদি, মসলা ফসল যেমন- ধনিয়া, গুয়ামুড়ি, কালজিরা, পেয়াজ, রসুন ইত্যাদি এবং শস্য ফসল যেমন-সরিষা, বাদাম ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করছেন এবং অধিকাংশ ফসলের বীজ নিজেরা সংরক্ষণ করছেন।
হাওর বীজঘরের ফলে হাওরের কৃষকরা কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবেলা ও অভিযোজনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বীজঘরে বীজ সংরক্ষণ ও পরস্পরের মধ্যে বীজ বিনিময়ের ফলে হাওরের কৃষকদের মধ্যে পারস্পারিক সর্ম্পক উন্নয়ন ও আন্তঃনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শস্য ফসলের বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকরা একদিন হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ধানের বিকল্প ফসল চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে হাওরের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দুর্যোগ মোকাবেলা ও অভিযোজনে সক্ষমতা হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: