সাম্প্রতিক পোস্ট

মালশিরা ধান কেড়ে নিয়েছে আশুজিয়ার কৃষকদের মন

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী
এখন অগ্রহায়ণ মাস চলছে। অগ্রাহায়ন মানেই সোনালি ধান ঘরে তোলার মাস। এ মাসে বাঙালির ঘরে ঘরে নতুন ধান তোলার ধুম লাগে। এমাসে যেদিকে তাকাই মাঠ ভরা শুধু বৈচিত্র্যময় ধান আর ধান। গ্রামাঞ্চলের মাঠগুলো এখন পাকা ধানের সোনালি আবরণে ঢেকে গেছে। কৃষকরা এখন মাঠের পাকা ধান কাটায় এবং নারীরা ধান শুকানো ও ঝাড়ার কাজে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। একটুকু অবসরের ফুসরত নেই কারোর। ধানের মুহু মুহু গন্ধে ভরপুর সকল কৃষকের ঘর। বৈশ্বিক মহামারী করোনার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রামের শিক্ষার্থী ছেলে-মেয়েদের কেউ ধান কাটা, মাড়াই ও খড় শুকানোয় ব্যস্ত সময় পার করছে। কৃষকরা বৈচিত্র্যময় জাতের ধান চাষ করেছে। কৃষকদের কেউ কেউ ব্রি-৪৯, ব্রি-৩২, ব্রি-৩৪, চিনিশাইল, কালিজিরা, তুলসিমালা, বিরই, বদ্দিরাজ, সুবাস ইত্যাদি জাত, আবার কেউ কেউ হাইব্রিড ধানের চাষ করেছেন।
এ ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে। আশুজিয়া গ্রামের কৃষকরা আমন ২০২০ মৌসুমে ব্রি-৩২, ব্রি-৪৯ ও স্থানীয় জাতের ‘মালশিরা’ ধান চাষ করেছেন। আশুজিয়া ইউনিয়নের আশুজিয়া ও পার্শ্ববতীয় গ্রামের অধিকাংশ কৃষকই মালশিরা ধানের চাষ করেছেন। আশুজিয়া গ্রামের কৃষকদের মালশিরা ধান চাষের কারণ ও ফলাফল সহভাগিতার জন্য গতকাল করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প সংখ্যক কৃষক ও কৃষাণীদের অংশগ্রহণে এক কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। মাঠ দিবসে আশুজিয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের মোট ২০ জন কৃষক-কৃষাণী (নারী-৪ জন) অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণীদের সকলেই চলতি আমন মৌসুমে তাদের জমিতে মালশিরা ধান চাষ করেছেন।


অনুষ্ঠানে কৃষক আবুল কালাম বলেন, ‘এবছর আমন মৌসুমে ইউনিয়নের ৮টি গ্রামে এবং পার্শ্ববর্তী মদন ইউনিয়নের দু’টি গ্রামের প্রায় ২৫০ একর জমিতে মালশিরা ধানের চাষ হয়েছে। ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। বিশেষভাবে অতিবৃষ্টিতে জলবদ্ধতার জন্য এবং দেরিতে পানি নামায় যেসব জমি চাষ করা যায়না সেসব সকল জমিতেই মালশিরা ধানটি চাষ হয়েছে। এ ধানটি দেরিতে বা নামিলা রোপণ করলেও ফলন দেয় এবং ৮-১০ দিন পানির নিচে থাকলেও তেমন ক্ষতি হয়না। প্রতি ১০ শতাংশ জমিতে সামান্য খরচ করে প্রায় ৬ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছি। এ ধানের ওজন বেশি হওয়ায় মাপে আয় হয়। আগামীতে মালশিরা ধানে গোটা এলাকা ভরে যাবে।’ কৃষক লিটন মিয়া বলেন, ‘আমি ০৫ কাঠা জমিতে (৫০ শতাংশ) মালশিরা ধান চাষ করেছি। আমার জমির উপর দিয়ে গ্রামের সমস্ত পানি বর্ষা মৌসুমে নেমে যায়। পর পর তিনবার জমির ধান পানিতে ডুবে গেলেও ধানের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। ফলনও ভালো হয়েছে। আগামীতে অন্যান্য জমিতেও আমি এ জাতটি চাষ করবো।’
আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে ধানের গোছা, শীষ, দানা, রোগ-বালাইয়ের উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। তারা শীষে ধানের গাথুঁনী, আকার ও রং দেখে ব্রি-৩২ ও ব্রি-৪৯ ধানের চেয়ে মালশিরা ধানটি এলাকার জন্য উপযোগি বলে মন্তব্য করেন। আগামীতে তারা বাজার থেকে ধানের কোন বীজ না কেনার আশা ব্যক্ত করেন।
এক্ষেত্রে আশুজিয়া গ্রামে মালশিরা ধানের প্রবেশ ও অন্যান্য গ্রামে সম্প্রসারণ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করছি।

আশুজিয়া গ্রামে যেভাবে মালশিরা ধানের প্রবেশ
২০১৬ সালে আমন মৌসুমে আশুজিয়া গ্রামের উদ্যোগী কৃষক ও গ্রাম্য গবাদি পশুর চিকিৎসক আবুল কালামের উদ্যোগে বারসিক’র সহযোগিতায় এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনের জন্য ১০টি স্থানীয় ধানের জাত নিয়ে গ্রামের কৃষকদের নেতৃত্বে প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করা হয়। সেই ১০টি জাতের মধ্যে রোগবালাই প্রতিরোধী, পানি সহনশীল, ভালো ফলন, দানা পুষ্ট ও চিটা কম, ধান গাছ হেলে পড়েনা, ধান দেখতে সুন্দর ও চিকন, ধানের ওজন বেশি, নামিলা/দেরিতে রোপণ করলেও ফলন পাওয়া যায় এসব বৈশিষ্টের ভিত্তিতে কৃষকরা মালশিরা ধানটি এলকার জন্য উপযোগি হিসেবে নির্বাচন করেন। ২০১৭ সালের আমন মৌসুমে গ্রামের ১০ জন কৃষক তাদের জমিতে মালশিরা ধান চাষ করে ভালো ফলন পায়। ২০১৮ সালের আমন মৌসুমে কৃষক আবুল কালাম ১২০ শতাংশ জমিতে মালশিরা ধান চাষ করলে মালশিরা ধান গ্রামের কৃষকদের নজর কাড়ে। ২০১৯ আমন মৌসুমে আশুজিয়া ও র্প্শ্ববর্তী গ্রাম পাড়াদূর্গাপুরের ৭০/৭৫ জন কৃষক মালশিরা ধান চাষ করে ভাল ফলন ঘরে তুলতে সক্ষম হয়। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা মালশিরা ধানের বীজ চাইলে কৃষকরা ২০২০ আমন মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণ করে রাখেন।

যেভাবে মালশিরা ধানের সম্প্রারণ ঘটেছে
আমন ২০১৯ মৌসুমে আশুজিয়া ও পাড়াদূর্গাপুর গ্রামের কৃষকরা তাদের প্রায় ২০ একর জমিতে মালশিরা ধান চাষ করে বেশ লাভবান হয়। বিশেষভাবে উৎপাদন খরচ খুবই কম, সার বিষ খুবই কম লাগে, ফলন ভালো ও ওজন বেশি, ধান চিকন ও গাছ হেলে পড়েনা, খেতেও ভালো হওয়ায় অন্যান্য কৃষকরাও এর বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। আমন ২০২০ মৌসুমে আশুজিয়া গ্রামের অনেক কৃষক নিজেদের জমিতে রোপনের জন্য মালশিরা ধানের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রির জন্যও চারা উৎপাদন করেন। তারা উদপাদিত মালশিরা ধানের চারা নিজেদের জমিতে রোপণের পর পার্শ্ববর্তী গ্রাম পাড়াদূর্গাপুর, নগুয়া, রাজিবপুর, কছনধারা এবং পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন মদনপুর এর মনাংসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের নিকট বিক্রি করেন। এবছর বন্যা কয়েক দফায় হওয়ায় অনেক এলাকার কৃষকদের ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চারা কিনে নিয়ে জমিতে চাষ করেন। মালশিরা দেরিতে রোপণ করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায় এবং ৮/১০ দিন পানিতে ডুবে থাকলেও নষ্ট হয় না এসব বিষয় জানার পর অন্য গ্রামের কৃষকরা মালশিরা ধানের চারা কিনে নিয়ে নিজেদের জমিতে চাষ করেছেন। বিশেষভাবে যেসব জমি নিচু, পানি নামতে দেরি হয় এবং একটু বৃষ্টিতেই ক্ষেত ডুবে যায় এমন প্রায় সকল জমিতে এবছর মালশিরা ধানের চাষ হয়েছে।

কৃষকদের মতে, মালশিরা ধানের চারা পরপর তিনবার পানিতে ডুবে গেলেও ধানের কোন ক্ষতি হয়নি। কৃষক আবুল কালামসহ অন্যান্য কৃষকদের মতে, আমন ২০২০ মৌসুমে ইউনিয়নের ৮টি গ্রামের ২৫০ একর জমিতে মালশিরা ধানের চাষ হয়েছে। মালশিরা ধান চাষীদের মতে, মালশিরা ধান ওজনে বেশি, তাই দেখতে অল্প দেখা গেলেও মাপলে (পরিমাপ) ওজনে অনেক হয়। এছাড়াও মালশিরা চালের ভাতের মার খেতেও সুস্বাদু এবং ভাত ঝরঝরে হয়। কৃষকদের মধে আগামী দু’এক বছরের মধ্যে আশুজিয়া ইউনিয়নের সকল জমি মালশিরা ধানে ভরে যাবে।

মালশিরা ধান যেমন আশুজিয়া ইউনিয়নের কৃষকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি হাজারো জাতের স্থানীয় জাতের ধান আমাদের দেশের কৃষক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিউটের বীজ ব্যাংক এবং বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ সংগ্রহ করে কৃষক আবুল কালামের মত করে দেশের অন্যান্য কৃষকরাও নিজেদের মত করে একাধিক জাত নিয়ে গবেষণা করলে মালশিরা’র মত আরো অনেক এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচন করা সম্ভব হবে। আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হবে বৈচিত্র্যময় জাতের ধানে এবং কৃষকদেরও নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে বাজারের উপর।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: