সাম্প্রতিক পোস্ট

বিলুপ্তির পথে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী জামনগরের শাঁখা শিল্প

 রাজশাহী থেকে উপেন রবিদাস ও অমৃত সরকার
রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে জামনগর গ্রাম। গ্রামটি নাটোর জেলার বাগাতীপাড়া উপজেলার জামনগড়র ইউনিয়নের অর্ন্তভূক্ত। আয়তনের দিক থেকে উক্ত ইউনিয়নের সব থেকে বড় গ্রাম হচ্ছে জামনগর। এই গ্রামে হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস করেন। হিন্দুদের মধ্য আবার ৩৬টি বর্ণের মানুষও রয়েছে এই গ্রামে। এই গ্রামে ১৭টি পাড়া রয়েছে। এর মধ্য শাখাঁড়িপাড়া অন্যতম। এই পাড়ার বসবাসকারীরা শাঁখা তৈরির কাজের সাথে যুক্ত। শাঁখারিপাড়ায় মোট ১১০টি পরিবার বসবাস করে। সবাই এই শাঁখা তৈরির কাজের সাথে যুক্ত।
Shaka.jpg-1
কাঁচামাল সংগ্রহ ও শাঁখের করাত
জামনগর গ্রামের শাঁখারিপাড়ার শ্রী পল্টন ধর ও শ্রী তুলসী সেন চট্্রগ্রাম থেকে এমসির মাধ্যমে কাঁচা শঙ্খ সংগ্রহ করেন। ভারত মহাসাগড়ে জন্মানো শঙ্খই এই শাখা তৈরির জন্য সব থেকে উৎকৃষ্ট। যা আসে দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা থেকে। এর মধ্য কৌড়ি, জাজির, কাচ্চাম, পাটি ও খগা নামের শঙ্খগুলোই সব থেকে উৎকৃষ্ট। কাঁচা শঙ্খ সংগ্রহ করার পর রোদে শুখিয়ে বস্তা বন্দী করে রাখা হয় প্রায় ২০-২৫ দিন এর গুনগত মান উন্নয়নের জন্য। শাঁখের করাতৎ বাংলায় একটি প্রচলিত শব্দ। এই করাত দিয়েই শঙ্খগুলোকে কাটা হয় যদিও বর্তমানে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্র এই শাঁখের করাতের স্থান দখল করেছে। তবে এই গ্রামের বাসিন্দারা শঙ্খগুলোকে শাঁখের করাত দিয়েই কাটেন। শঙ্খ কাটার পর এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত মানুষেরা কাঁচা শাঁখাগুলো হালা (এক হালা=৫০ জোরা) হিসাবে কিনে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে মসৃণ ও নঁকশা তৈরির কাজ করেন। এক হালা শাঁখা ১৪-১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। এই প্রসঙ্গে গত ১৫ বছর ধরে শঙ্খ আমদানির সাথে জড়িত শ্রী পল্টন ধর বলেন, “আগের তুলনায় এখন এই শঙ্খ চট্রগ্রাম থেকে আমাদের গ্রামে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগে যার কারণে এর প্রভাব সব খানেই পড়ছে।”

ঋনের জালে আবদ্ধ শাঁখা শিল্পীরা
শাঁখারিপাড়ার মোট পরিবারের মধ্য ১০০টি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে কাঁচা শাঁখা তৈরি করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। তাঁরা হালা হিসাবে কাঁচা শাঁখা সংগ্রহ করে বাড়িতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রচালিত ডিজাইন মেশিনে প্রথমে শাঁখাগুলো মসৃণ করে নেন। এরপর সেগুলো কোন সময় র‌্যাত (এক প্রকার হাতদ্বারা চালিত করাত) আবার কোন সময় ডিজাইন মেশিন দ্বারা শাঁখাতে বিভিন্ন নকশা আঁেকন ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায়। এই কাজগুলোর সাথে পরিবারের নারী-পুরুষ উভয় সদস্যই জড়িত থাকেন। এক জোরা শাঁখা মসৃণ থেকে শুরু করে ফিনিশিং পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দু’দিন বাড়ির পুরুষ সদস্য পাশের জেলা বা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ফেরী করে শাঁখাগুলো বিক্রয় করেন। সাধারণত ১.সোনা বান্ধানো ২.গুরু দক্ষিণা ৩.ব্রেসলেট ৪.বাউটি ৫.চিকন ৬.মগরমুখ এই ছয় ধরনের শাখা তৈরি হয়ে থাকে। তবে সোনা বান্ধানো ও গুরু দক্ষিণা এই শাঁখাগুলোর বেশির ভাগই তৈরি করেন গ্রামের ২১টি ধনী পরিবারগুলো যারা এই শাঁখা বিক্রয় করেন পাশের জেলা নাটোর, পাবনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন জুয়েলারি ও শাঁখা বিক্রয় দোকানে। গ্রামের বাকি ৮০টি পরিবারের মধ্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার মহাজনের বাড়িতে শ্রম বিক্রয় করে দৈনিক মজুরিতে, আবার কোন কোন পরিবার তুলনামূলক কম দামের শাঁখা, গরুর গলার ছালি, আংটি, প্রসাধনী হিসাবে শঙ্খের পাউডার বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অধিকাংশ পরিবারই কাঁচা শাখা কেনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন। যে পরিবারগুলোর বাড়ির ভিটা ও শাঁখা তৈরির কাজই সম্বল সে পরিবারগুলোই ঋণের জালে বন্দী। তাই তাদেরকে একমাসে শাঁখা বিক্রয়ের টাকার একটি বড় অংশ ঋণের টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়। আবার পরিবারের খাদ্য চাহিদা ও চিকিৎসার জন্য অনেকসময় তাদেরকে ধরণা দিতে হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দরজায়। এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত শ্রী ভব বলেন, “এখন আমাদের শাঁখা আর আগের মত বিক্রয় হয় না। কারণ ক্রেতারা মনে করেন আমাদের শাঁখার মান কম। এখন তো অনেকেই ভারতীয় শাঁখা পছন্দ করেন। কারণ এগুলো দেখতে সুন্দর দামে কম। মান ভালো না হলেও সেই শাঁখাই আমাদের শাঁখার স্থান দখল করে নিচ্ছে।”
Shaka
বিলুপ্তির পথে ঐহিত্যবাহী এই পেশা
অতীতের একসময় বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, রংপুর জেলায় চাহিদা মত শাঁখার যোগান দিত এই জামনগর গ্রামের শাঁখা শিল্পীরা। সে সময় খুব অল্প খরচে শঙ্খ সংগ্রহ করা যেত। চাহিদা ও ব্যবহারকারীর সংখ্যায় ছিল বেশি। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই শিল্পের সুদিন শেষ হতে থাকে। মূলত অসাধূ ব্যবসায়ীদের চোরাই পথে ভারত থেকে শাঁখা আমদানী এবং সঠিক পথে আমদানিতে অনিয়মের কারণেই এক সময়ের সমৃদ্ধ এই শিল্প আজ তার জৌলুস হারাচ্ছে। অন্যদিকে ঋণের জাল, মুনাফা কম এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কারণে শাঁখা শিল্পীরা নিজেদের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ধরে রাখতে পারছেন না; অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে ধীরে ধীরে এই পেশা বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

উপসংহার
ঐতিহাসিক এই শাঁখা তৈরি ও বিক্রয়ের সাথে সম্পৃক্ত সকল বিষয়গুলোতে যদি সরকারি বা বে-সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকতো তাহলে এই পেশার শিল্পীরা এই পেশা ধরে রাখার ক্ষেত্র আগ্রহী হতো। কেননা নানান কারণে এ পেশা থেকে তারা লাভবান হতে পারছেন না। বরং এ পেশা চালাতে গিয়ে তারা ঋণের জালে আবদ্ধ হয়েছেন। এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সুদিন ফিরানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে এগিয়ে আসা উচিত বলে আমরা মনে করি।

happy wheels 2
%d bloggers like this: