সাম্প্রতিক পোস্ট

জ্ঞানতাপস, শিক্ষাব্রতী অধ্যাপক যতীন সরকার

জ্ঞানতাপস, শিক্ষাব্রতী অধ্যাপক যতীন সরকার

নেত্রকোনা থেকে আওলাদ হোসেন রনি:
নেত্রকোনায় গত ১৮ আগস্ট ২০১৮ খ্রি: পালিত হয়েছে বাংলাদেশের সাম্যবাদী তাত্ত্বিক, লোক গবেষক, লেখক, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকারের ৮৩তম জন্মদিন। এ দিনে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠনের ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত করা হয় যতীন সরকারকে। জন্মদিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ‘জন্মদিন উদযাপন পরিষদ’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শক্তিমান লেখক, জনপ্রিয় বক্তা ও আমাদের প্রিয় শিক্ষকের ৮৩ তম জন্মদিনে রইল আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। তাঁর ৮৩ তম জন্মদিনে যতীন সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী বারসিক নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

39409477_2124457890900120_1744011512520900608_nঅধ্যাপক যতীন সরকার ২ ভাদ্র ১৩৪৩ বাংলা সন, ১৮ আগস্ট ১৯৩৬ ইংরেজি সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার চন্দপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র সরকার এবং মাতা বিমলাবালা সরকার। পিতামাতার তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়।
১৯৪৩ সালে তিনি রামপুর ফ্রিবোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ভর্তি হন নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ স্কুলে। দেশভাগের কারণে এখানে তাঁর লেখাপড়ার বিরতি ঘটে। এরপর ভর্তি হন চন্দপাড়ার পাশের গ্রাম বেখৈরহাটি স্কুলে। ১৯৫০ এর দাঙ্গার কারণে এ স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৫১ সালে অষ্টম শ্রেণি না দিয়ে মেট্রিক পাশ করেন ১৯৫৪ সালে। এসময় তাঁর পরিবার দারুণ অর্থাভাবে পড়ে গেলে রামপুর বাজারে চাটাই বিছিয়ে ডাল, পান, বিড়ি, বিস্কুট ইত্যাদি বিক্রির দোকান দিয়ে সংসারের খরচ যোগান কিছু দিন।
টিউশনির টাকা জমিয়ে ১৯৫৫ সালে আই. এ. ভর্তি হন নেত্রকোনা কলেজে। নেত্রকোনা কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৯ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষা দিয়েই আশুজিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর চাকরি নেন বারহাট্টা স্কুলে। দুই বছর চাকুরীর টাকা জমিয়ে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং এ বছরই বাংলার শিক্ষক হিসেবে গৌরিপুর হাইস্কুলে যোগদান করেন। ১৯৬৪ সালে যোগ দেন নাসিরাবাদ কলেজে এবং অবসরের পূর্ব পর্যন্ত এখানেই শিক্ষকতা করেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ‘ সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়-
বাঙ্গালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার, সংস্কৃতির সংগ্রাম, ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদের ভূত ভবিষ্যৎ, আমাদের চিন্তা চর্চার দিকদিগন্ত, ভাষা সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা, প্রাকৃত জনের জীবনদর্শন, দ্বি-জাতিত্ত্ব নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা, বাংলাদেশের কবিগান, ভাবনার মুক্ত বাতায়ন, বাংলা কবিতার মূলধারা ও নজরুল, বরণীয় জনের স্মৃতি কৃতি ও নীতি, বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি, গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, রাজনীতি ও দুর্নীতি বিষয়ক কথাবার্তা, আমার যেটুকো সাধ্য, আমার রবীন্দ্র অবলোকন, মানব মন, সমাজ ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা, বিচিত্রবিধ বিচার বিবেচনা, রবীন্দ্রনাথের গদ্য: প্রথম চল্লিশ বছর, কালের কপোল তলে, প্রান্তিক ভাবনাপুঞ্জ।
‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ ও ‘পাকিস্তানের ভূত-দর্শন’ তাঁর আত্মজীবনী মূলক রচনা।

এছাড়াও তিনি বিভিন্ন কৃতি মনীষির জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত জীবনীগ্রন্থগুলো হলো- চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার, সিরাজ উদ্দিন কাশিমপুরী, হরিচরণ আচার্য।
তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলো- রবীন্দ্র নাথের সোনারতরী, প্রসঙ্গ:মৌলবাদ, জালাল গীতিকা সমগ্র। এছাড়াও নির্বাচিত প্রবন্ধ, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলন সহ চার খন্ডের রচনাবলি অনুপম থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

39467333_1795502733890731_2724470538092150784_n১৯৬৭ সালে ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭), শ্রুতি স্বর্ণপদক (২০০৮), ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১১ পুরস্কার, ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০০৮ সালে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও আমরা সূর্যমুখী সম্মাননা, ২০০৯ সালে ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু পুরস্কার ও ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারসহ আরো অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
যতীন সরকার তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে ১৯৭৫ এ দেশের পটপরিবর্তনের পর ১৮ মাস বিনা বিচারে কারাবন্দি ছিলেন। তিনি দুইবার বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হয়েছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯০ এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টি ভাঙনের সময়ে পার্টি ভাঙনের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা বেশ সাহসোদীপ্ত ও প্রশংসাজনক। ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তাঁর ভূমিকা জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করে।

39441150_2124458047566771_1661980948587085824_nযতীন সরকারের স্ত্রী কানন সরকার, এক পুত্র সুমন সরকার ও এক কন্যা সুদীপ্তা সরকার। তাঁর ছোট ভাই শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার। বর্তমানে তিনি নেত্রকোনা শহরের সাতপাইস্থ ‘বানপ্রস্থ’তে বসবাস করছেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: