সাম্প্রতিক পোস্ট

আনোয়ার হোসেন একজন সবুজ মনের মানুষ

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

বিশাল সবুজ ভুবনে হাজারো গাছের চারা দক্ষিণের বাতাসে দোল খেয়ে যাচ্ছে। এটা দেখে পথচারচারীদের মন ভরে ওঠে। পথচারীরা বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে একটিবারের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায়। বাড়ির চারিদিকে সবুজের সমারোহ দেখে প্রতিবেশীরা তাকে সবুজ মনের মানুষ বলে ডাকে। এই সবুজ মনের মানুষটি আর কেউ নন, তিনি নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন।

20190611_101422-W600
মা-বাবা ও ভাই-বোনকে নিয়ে ৪৫ উর্ধ্ব বয়সী আনোয়ার হোসেনের ৮ জনের সংসার। অভাবের কারণে ৫ম শ্রেণীর বেশি পড়াশুনা করা হয়নি তাঁর। প্রথম সন্তান হওয়ায় পরিবারে খরচ যোগাতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি সংসারে হাল ধরেন। এভাবে প্রায় ১৫ বছর কেটে যায়। দৈনিক কাজের উদ্দেশ্যে অন্যত্র যাওয়ার পথে গ্রামের খাইরুল মিয়ার গাছের চারার নার্সারি দেখে দেখে তার মনেও স্বপ্ন জাগে অনুরূপ একটি নার্সারি গড়ে তোলার। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই তিনি ছুটে যেতেন খাইরুল মিয়ার নার্সারিতে, দেখতেন কিভাবে খাইরুল মিয়া কাজ করেন, তার কাছে বসে নার্সারির কাজ কর্ম বোঝার চেষ্টা করতেন।

আনোয়ার হোসেনের নিজের কোন জমি ছিল না। তাই তিনি প্রথমে বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন জাতের ফলের গাছের চারা রোপণ করেন এবং অন্যের জমি লিজ নিয়ে ছোট আকারে নার্সারিতে বিভিন্ন জাতের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন করতে থাকেন। প্রথম বছরে নার্সারির চারা বিক্রি করে খরচ বাদে ৩০ হাজার আয় করেন। পরের বছর ২০ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন জাতের ১০/১৫ হাজার চারা উৎপাদন করেন। এসব চারা বিক্রি করে ওই বছরে তিনি আয় করেন ৪৫ হাজার টাকা। নার্সারি থেকে ভালো লাভ হওয়ায় তিনি নার্সারির কাজে আরও মনোযোগী হন। মদনপুর গ্রামের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিনের নিকট তিনি নার্সারির উন্নয়নে প্রায় সময়ই বুদ্ধি পরামর্শ নিতেন। প্রতি বছরের আয়কৃত টাকা তিনি ব্যাংকে জমা রাখেন। এভাবে ৮/৯ বছর কষ্টের পর তিনি সুখের দেখা পান। বিয়ে করেন মদনপুর ইউনিয়নের ঢুলিগাতি গ্রামের সাধারণ এক পরিবারের মেয়ে মমতা আক্তারকে। স্ত্রী মমতা আক্তার আনোয়ার হোসেনের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে নার্সারির কাজে সর্বদা সহযোগিতা করতে থাকে। নিজে লেখাপড়া করতে না পারায় আনোয়ার হোসেন ভাই-বোনদেরকে লেখাপড়া শোখানোর জন্য মনস্থির করেন। তার এ স্বপ্ন এখন সফলতার দ্বার প্রান্তে উকি দিতে শুরু করেছে।

20190611_101436-W600
আনোয়ার হোসেন নার্সারির আয় দিয়ে তিন ভাইকে অনার্স ও মাষ্টার্স পর্যন্ত লেখাপড়া করিয়েছেন। তৈরি করেছেন ৩৫ হাত লম্বা ইটের দালান বাড়ি। নার্সারির উপার্জিত টাকা দিয়ে ৭০ শতাংশ জমি কিনেছেন। বর্তমানে তার নার্সারিতে ফলজ, বনজ ও ঔষধি জাতের প্রায় ৩ লাখ চারা রয়েছে। জাতগুলোর মধ্যে পেয়ারা, আমড়া, আম, জাম, জামরুল, চালতা, লিচু, হরিতকি, আমলকী, লেবু, নিম, মেহগনি। নার্সারিতে দৈনিক তিনজন শ্রমিক কাজ করেন। মোট ৩৫ জাতের গাছের চারা রয়েছে নার্সারিতে। এর মধ্যে ৬ জাতের আম, ৬ জাতের পেয়ারা, ৫ জাতের লেবু, ৩ জাতের জলপাই, ৫ জাতের কাঁঠাল, ৫ জাতের আমড়া, ৩ জাতের কামরাঙ্গা, ২ জাতের নিম। আনোয়ার হোসেনের বাড়ি সবুজের ভরপুর। তিনি নার্সারিতে উৎপাদিত চারাগুলো বিক্রি করেন ফচিকা বাজার, মদনপুর বাজার, রামপুর বাজার ও কেন্দুয়া বাজারে। তিনি গাছের চারা বাজারে পরিবহনের জন্য পিকাপ কিনেছেন।

20190611_101441-W600
আনোয়ার হোসেন এ বিষয়ে বলেন,‘জমি কম থাকলেও জীবনে ভালোভাবে চলা যায়। নিজের বুদ্ধি ও অন্যের পরামর্শ জীবনে অনেক বড় কাজে লাগে। আজ নার্সারির বিষয়ে খাইরুল ভাইয়ের পরামর্শ, জামাল উদ্দিন স্যারের বুদ্ধি ও পরামর্শ আমাকে নার্সারি করে সফলতা পেতে সহায়তা করেছে। এর প্রধান কারণ আমার চেষ্টা ও শ্রম। আমি এটি সফল করতে অনেক শ্রম দিয়েছি, সারা দিন পরিশ্রম করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবার তেমন জমি ছিল না, কোন রকমে খাইয়া না খাইয়া সংসার চালাইতে হইছে। আমি ভাই-বোনদের মধ্যে সকলের বড়, কি করমু ভাইবা পাইতামনা। আইজকা আমার জীবনের স্বপ্ন পূরণ হইছে। আমি চাই আমার নার্সারি অনেক বড় হোক, বাকী জীবনটা যেন নার্সারির কাজ কইরা যাইতে পারি।’

নার্সারি ছাড়াও আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে গোয়াল ভরা গরু, হাসঁ-মুরগি, কবুতুর ও পুকুর ভরা মাছ রয়েছে। এগুলো তিনি স্ত্রীকে নিজেই সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। আনোয়ার হোসেন একজন দক্ষ কৃষক। কর্মের জন্যই আনোয়ার হোসেনকে মদনপুর গ্রামের সকলে এখন তাকে এক নামে চিনেন। নিজের উদ্যোগে কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক সভা করা এবং কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করেন। তার নার্সারি দেখে গ্রামে ছোট ছোট আরও চারটি নার্সারি গড়ে ওঠেছে। সেই সব নার্সারিতে আনোয়ার হোসেন সময় ও বৃদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন, নার্সারির মালিকদের সাথে কিভাবে গাছের সংখ্যা বাড়ানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেন। তার বর্তমানে অন্যতম একটি স্বপ্ন এলাকায় ঔষধি গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। প্রতিবছর তিনি নিজ এলাকা ও বাইরে অনেক মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে বৈচিত্র্যময় গাছের চারা বিতরণ করে থাকেন। পরিবেশ রক্ষায় আনোয়ার হোসেনের অনেক অবদান এলাকার অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বৃক্ষ রোপণ করছেন।

জিরো থেকে হিরো হওয়ার অনেক গল্প প্রায়শই বিভিন্ন মাধ্যমে নজরে আসে। হাতের কাছেই যে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, সেগুলো আমাদের নজরে পড়ে না। এমনই জিরো থেকে হিরো সবুজ মনের মানুষ আনোয়ার হোসেন। যিনি তার কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য চেষ্টায় মজুর থেকে একজন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। বৈচিত্র্যময় গাছের চারা উৎপাদন করে এলাকার বৃক্ষ বৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নিজের মনের ন্যায় জনগোষ্ঠীর চাহিদানুযায়ী বৈচিত্র্যময় জাতের চারার যোগান দিয়ে প্রকৃতির অবয়ব সবুজ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: