সাম্প্রতিক পোস্ট

ভোক্তার আচরণ ও প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ

মানিকগঞ্জ থেকে মো.নজরুল ইসলাম

আমরা জানি, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের সাধারণ কার্যবলীর সমষ্টিই হলো অর্থনীতি। জীবনযুদ্ধে প্রান্তিক পর্যায়ের নাগরিকগণ অর্থনীতির সংজ্ঞা না জানলেও আয়-ব্যয়, লাভ-ক্ষতি, সঞ্চয়-বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও উন্নতির হিসাব নিকাশ তার মতো করে বুঝতে পারে। একজন ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের অথনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রাখলেও সেটি তার অজ্ঞাতই থেকে যায়। অর্থনীতির ভাষায় সাধারণত একজন মানুষ তার জীবনের প্রথম ভাগে ও শেষ ভাগে নির্ভরশীল নাগরিক থাকে এবং মধ্যভাগে সে সরাসরি আয়ের সাথে যুক্ত থাকে। মধ্যভাগের আয় থেকে ভোগ পরবর্তী তাকে সঞ্চয়ও করতে হয়। এই ধরনের কর্মকান্ডে ব্যক্তির আচরণের উপর নির্ভর করবে তার স্বয়ম্ভুত ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ।


মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন মানরা গ্রামের শামেলা বেগম (৪৬)। তিনি ছোট বেলায় বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে তজিমুদ্দিনের সংসার করতে ছিলেন। তার স্বামী শ^শুরবাড়ি ও নিজের সম্পদ মিলিয়ে বিদেশে পারি জমালেও ভালো করতে না পারায় তাকে ছেড়ে অন্যত্রে চলে যান। শামেলা বেগমের ঘরে দুই সন্তান। স্বামীর ও বাবার বাড়ি জায়গা না পেয়ে তিনি তরা ব্রিজের নিচে ভাসমান বসতি গড়েন এবং চা বিক্রি করেন। শামেলা বেগম বলেন, ‘আমি বাবার সাথেও চায়ের দোকানে যোগাল দিয়েছি এখনও তাই করছি কপাল। দুই টাকা কাপ চা বিক্রি করে বাবা বিরাট সংসার চালাতেরন আর এখন ৫ টাকা কাপ চা বিক্রি করেও কিস্তির ঘরে যেতে হয়। উন্নতি কারে কয় বুঝতেছিনা। প্রতিদিন গড়ে ১৫০-১৮০ কাপ চা বিক্রি করি। দুধ চায়ে লাভ কম হলেও প্রতি কাপে ১ টাকা থাকে রঙ চায়ে ২ টাকা থাকার কথা হলেও এত বেচাবিক্রি করি সন্ধ্যায় সবাইকে দেয়ার পর কিস্তির টাকায় গন্ডগোল বাঁধে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দোকান থেকে বাকি করি চিনি, চাপাতি, গ্যাসের বোতল আর দুধ নগদে কিনতে হয়। কিছু বেকারি ও শুকনো মাল রাখি এটিও নগদ দিয়েই রাখতে হয়। পানে কিছু লাভ হলেও পানের দাম চরা, সুপারির ও জর্দার দাম চড়া। এখন চিনি ও দুধের দাম বাড়তি। চা পাতার রয়েছে দামের নানান রকম। ভাসমান দোকান করেও শান্তি নাই। মাঝে মাঝে এলাকার পুলাপানসহ পুলিশকেও টাকা দিতে হয়, তা না হলে ঘর ভেঙ্গে দেয়ার হুমকি দেয় এবং কয়েকবার ভেঙ্গেও দিয়েছে। এতসব কিছু মোকাবেলা করে মোটামুটি ভালোই ছিলাম সঞ্চয় করতে পারি নাই। সংসারে বড় কিছু করতে হলে কিস্তি উঠিয়েই করতে হয়। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি কিস্তি উঠিয়ে। এখন আর পারছি না, ঋণের বোঝা সারতে পারলে অন্যকিছু করার চিন্তা আছে। এই কাজের কোন নিয়মনীতি নাই, যার যখন মনে হয় সেই দোকান দিয়ে বসে। এখানে আমি একা ভালোই ছিলাম এখন আরো তিনটি দোকান হওয়াতে বেচাকেনায় ধস নেমেছে।’

অন্যদিকে মানিকগঞ্জ ঘিওর অঞ্চলের নালী ইউনিয়নের নালী বাজারের শিক্ষিত যুবক মো. হাসান মিয়া বাড়ির কৃষি কাজের পাশাপাশি একবেলা চা বিক্রি করেন। হাসান মিয়া বলেন, ‘আমি ছাত্র জীবনে মানিকগঞ্জে ২০১৩ সালে বারসিক আয়োজিত তিনদিনব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব ও কর্তব্য শীর্ষক কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে পরিবেশ প্রতিবেশ লোকয়ত চর্চা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুকি মোকাবেলায় আমরা কি করতে পারি সেই বিষয়ে ধারণা পেয়েছি। এছাড়াও আমি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে স্ব কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে সাহসী হয়েছি। আমি ডিগ্রী পাস করে আমার মনমত চাকরি না পাওয়াতে বসে না থেকে বাড়িতে কৃষিকাজে সময় দেই আর বাকি সময় বাজারে চা বিক্রি করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষের বেশ উন্নতি হয়েছে কারণ আমাদের বাজারে আগে এত চায়ের দোকান ছিলো না এখন ৮টি চায়ের দোকান প্রতিযোগিতা করে চলতে হয়। সমস্য হলো ভোক্তারা এক দোকানে বাকি করে আরেক দোকানে যায়। এভাবে দোকানদার ঋণের মধ্যে নিমজ্জিত হয়। আমি চা, কফি, পানে একটু ভিন্নমাত্রা দেয়ার চেষ্টা করি। খাঁটি গাভীর দুধের চা, নিজ হাতে তৈরি গ্রীণ টি ও মসলা চা ভালোই চলে। আমার কাছে লাল চিনি ও গুড়ের ব্যবস্থা থাকলেও মানুষ গুণগতমান বুঝে না বলে সাদা চিনি বেশি দিতে হয়। চিনির ও গ্যাসের দাম বেশি হওয়ায় লাভ খুবই কম হয়। তারপরও আড্ডা ও সময় কাটে, মানুষেরও বেশ বিনোদন হচ্ছে।’


আমরা বাজারে লক্ষ্য করি যে প্রতিটা দোকানেই টেলিভিশন থাকাতে প্রকারান্তরে মানুষের মনোজগত টেলিভিশন দ্বারা আসক্ত হচ্ছে। মানুষের বাজে খরচ বৃদ্ধির পাশাপশি সময়ের প্রতি অসেচতনতার ফলে রোজগার হ্রাস পেয়ে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং পারিবারিককাজে বিনিয়োগের সময় তাকে ঋণের বোঝা টানতেই হচ্ছে। গ্রামীণ বেশিরভাগ প্রান্তিক পরিবারগুলো এখন সামাজিকতা রক্ষার নামে তার অজান্তেই বিনিময় ক্ষেত্রে অনৈতিকতার পাশাপাশি ঋণের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে আরো সচেতনতা বাড়ানো দরকার বলে আমরা মনে করি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: