সাম্প্রতিক পোস্ট

বস্তা পদ্ধতিতে মরিচের জাত গবেষণা

কলমাকান্দা নেত্রকোনা থেকে খাইরুল ইসলাম অপু:
নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ও মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের পাদদেশের একটি গ্রাম চন্দ্রডিঙ্গা। গ্রামের চারিদিকে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বয়ে আসা ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়ায় ঘেরা গ্রামটি। শীতকালে ও শুষ্ক মৌসুমে ছড়াগুলো মৃতপ্রায় দেখা গেলেও বর্ষা মৌসুমে সবগুলো ছড়াই জীবন্ত হয়ে উঠে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হলে ছড়াগুলো জীবন্ত দানবে পরিণত হয়। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানির সাথে পাহাড়ি বালি ও কয়লা উত্তোলনের ফলে কয়লা কোয়ারির বালি ছড়াগুলো দিয়ে প্রবল ¯্রােতে ভেসে এসে ছড়ার বাঁধ ভেঙ্গে প্রতিবছর সীমান্ত এলাকার অনেক কৃষি জমি বালি পড়ে চাষের অনুপযোগি করে তোলে। প্রতিবছর সীমান্ত এলাকার কৃষক-কৃষাণীরা বসতভিটায় বা জমিতে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করলেও পাহাড়ি ঢলের ফলে তার ফল তারা বেশিরভাগ সময়ই ভোগ করতে পারেনা। পাহাড়ি ঢলে বসতভিটা ও চাষের জমিতে বালি পড়ার ফলে সেসব জমিতে কোন ফসলও ফলানো যাচ্ছেনা। অন্যদিকে বাজার অনেক দূরে হওয়ায় সীমান্ত এলাকার গ্রামের জনগোষ্ঠী তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সপ্তাহের বাজার থেকে সংগ্রহ করে। ফলে টাট্কা সবজি তারা খেতে পায়না। তাই বলে সীমান্ত গ্রামের কৃষকরা পাহাড়ি ঢল ও বালির ভয়ে হাতগুটিয়ে বসে না থেকে পাহাড়ি ঢল মোকাবেলা করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বালি জমিতে সবজি উৎপাদনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আবার কেউ কেউ অন্যের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন ধরণের গবেষণা করছেন।
নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের এমনই একজন গারো আদিবাসী কৃষাণী বেনুকা ম্রং (৫৭)। তিনি বসতভিটার সামান্য জমিতে প্রতি মৌসুমে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করেন। শিম ও অরহর কলাই এর মোটামুটি ফলন পেলেও অন্যান্য সবজির ফলন বালির জন্য তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। বর্ষা মৌসুমে রান্নার অত্যাবশকীয় উপাদান কাঁচা মরিচের দাম অনেক হয় (১৫০-২০০ টাকা/কেজি)। কিন্তু মরিচ ফসলটি পানি সহনশীল নয়। সামান্য জলাবদ্ধতায় মরিচ গাছ মরে যায়। সকলকে মরিচের জন্য বাজারের উপর নির্ভর করতে হয়। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের নাম খাড়ি বা নাখাম মিচ্চি। এর জন্য অনেক কাঁচা ঝালের প্রয়োজন হয়। সীমান্ত এলকার গ্রামগুলোতে পাহাড়ি ঢল প্রতি বর্ষা মৌসুমের নিত্য ঘটনা। আবার কিছু দিন বৃষ্টি না হলে/খরা হলে বালি গরম হয়ে গাছ মরে যায়। এছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে সীমান্তের গ্রামগুলোতে খাবার, গোসল ও সেচের পানির সংকট দেখা দেয়। তাই পাহাড়ি ঢল ও বালির কথা মাথায় রেখে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চাহিদার ভিত্তিতে কৃষাণী রেনুকা ¤্রং ২০টি সিমেন্টের বস্তায় মাটি ও পচা গোবর ভরে ৮ জাতের (কালো উব্দা, সবুজ উব্দা, সবুজ গোল, খাটো সবুজ উব্দা, সাদা উব্দা, সবুজ চিকন, ধানি) বস্তা পদ্ধতিতে মরিচের জাত গবেষণা করেছেন।


মরিচের পাশাপাশি তিনি বস্তায় পেঁপের পরীক্ষামূলক চাষ করেছেন। গ্রীষ্মকালের মরিচ ও পেঁপে চারা রোপণ করার পর চারার গোড়ায় খড় ও পচা ঘাস দিয়ে ঢেকে/মালচিং করে দিয়েছেন যাতে রোদের তাপে মাটি গরম হয়ে চারা মরে না যায় এবং বেশি সেচ দিতে না হয়। বস্তায় মাটি ভরে মরিচ চাষের ফলে বস্তাসহ গাছগুলো সহজেই নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা যায়। বস্তায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পচা গোবর ও ছাইয়ের মিশ্রণ দেয়ার ফলে পরবর্তীতে মরিচের জন্য কোন সার দেয়ার প্রয়োজন হয়না। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে মরিচ ও পেঁপে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে সকল গাছ মরিচে ভরে গেছে। পেঁপে গাছে পেঁপে ফল ধরতে আরম্ভ করেছে।
বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কৃষাণী রেনুকা ম্রং বলেন, ‘আমি প্রতিবছর শীত মৌসুমে (রবি) মরিচের বীজ বপন করি, কিন্তু প্রয়োজনমত সেচ দিতে না পারায় এবং বালি মাটি গরম হয়ে চারা মরে যায়। আবার গ্রীষ্ম মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে মরিচ ও পেঁপে গাছ জলাবদ্ধতায় মরে যায়। তাই গ্রামের একমাত্র শিম ছাড়া অন্য কোন সবজি কেউ চাষ করেন না। বারসিক’র খাইরুল ইসলাম অপু ভাইয়ের নিকট আমি প্রথম বস্তা পদ্ধতিতে মরিচ ও পেঁপে চাষের বিষয়ে জানতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবকিছু জানার পর ভালো মাটির সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে পঁচা গোবর মিশিয়ে রেখে খাইরুল ইসলাম অপুর নিকট মরিচের জাত গবেষণার আগ্রহের কথা জানাই এবং কিছু সিমেন্টের বস্তা সহযোগিতা চাই। তিনি সিমেন্টের বস্তা দিলে তার উপস্থিতিতেই বস্তার চারিপাশে চারটি ছিদ্র করে (পানি নিষ্কারশন, আলো-বাতাস চলাচলের জন্য) বস্তার তিন চর্তুথাংশ গোবর মিশ্রিত মাটি ভরে তাতে মরিচের চারা রোপণ করি। চারার গোড়ায় পঁচা ঘাস ও খড় দিয়ে ঢেকে দিই যাতে গাছের গোড়া দ্রুত শুকিয়ে না যায় এবং কম সেচ দিতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে চারার গোড়ায় সকাল বিকাল পানি দিয়ে চারাগুলো টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি পাওয়ার পর থেকে চারাগুলো দ্রুত বড় হয় এবং ফুল দিতে আরম্ভ করে। এখন মরিচ গাছগুলো তিন থেকে চার ফুট উচ্চতার হয়েছে এবং অনেক ফলন দিচ্ছে। তবে কালো ও সবুজ উব্দা মরিচের ফলন বেশি হয়েছে। আমি প্রতিটি জাতের পাঁকা মরিচ শুকিয়ে বীজের জন্য সংরক্ষণ করছি। আমি আগামী মৌসুমে আরো ব্যাপক আকারে বস্তা পদ্ধতিতে চাষের জন্য ও বিক্রির জন্য মরিচের চারা উৎপাদন করবো।’
কৃষাণী রেনুকা ম্রং বর্ষার আগে থেকে বাজার থেকে কোন মরিচ কিনে খান না। বস্তায় চাষকৃত মরিচ তুলে দৈনন্দিন মরিচের চাহিদা পুরণ করতে পারছেন। তিনি প্রত্যেক জাতের মরিচ পাকিয়ে বীজ করছেন। নিজে খাওয়ার পর তিনি আত্মীয়স্বজনকেও মরিচ দিয়েছেন। রেনুকা ¤্রং এর বস্তা পদ্ধতিতে মরিচ ও পেঁপে চাষের সফলতা দেখে গ্রামের অন্যান্য আদিবাসী (হাজং ও গারো) ও বাঙালি কৃষকরা অনুরূপ পদ্ধতিতে মরিচের চাষ করার জন্য রেনুকার নিকট বীজের চাহিদা দিয়েছেন। রেনুকা সকলকে সাধ্যমত বীজ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। রেনুকা ম্রং প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহকালীন সময় পর্যন্ত প্রায় তিন কেজি পাঁকা মরিচ শুকিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। পাঁচ কেজি বিক্রি করেছেন এবং গ্রামের সকলে প্রয়োজনে তার নিকট থেকে মরিচ নিয়ে যান।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, বস্তা পদ্ধতি পাহাড়ি ঢল, বালি জমি ও জলাবদ্ধ জমির জন্য একটি সঠিক ও সফল পদ্ধতি। পানি বৃদ্ধি পেলে বস্তাগুলো অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে স্থানান্তর করলেই হলো। অথবা তিনটি গাছের ডাল পুঁতে মাঁচা তৈরি করে তার উপর বস্তাটি উঠিয়ে দিলেই হলো। এ পদ্ধতিতে সহজেই পাহাড়ি ঢল, বালি মাটি ও জলাবদ্ধতা মোকাবেলা করে শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে মরিচসহ বৈচিত্র্যময় সবজি ও শস্য চাষ করে পারিবারিক চাহিদা পূরণ করা যায় এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে উন্নতি করতে পারবেন। রেনুকা ম্রং এর দেখাদেশি বস্তা পদ্ধতিতে মরিচ, পেঁপে ও শিমসহ বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ সীমান্ত এলাকার গ্রামের কৃষক-কৃষাণীদের নিকট বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: