সাম্প্রতিক পোস্ট

বন্যার পানিতেও মাথা তুলে কাইশ্যাবিন্নি ধান

হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ থেকে সত্যরঞ্জন সাহা

একসময় গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে ছিল ধানবৈচিত্র্য। গোবর সার দিয়ে সবচেয়ে কম খরচে ধান আবাদ হতো মাঠে মাঠে। বাংলাদেশে আমন মৌসুমে ধান চাষে সম্পূর্ণ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতায় কখনও বন্যা, কখনও খরা কিংবা কখনও জলাবদ্ধতা দেখা দিলে কৃষকদের আবাদ ব্যাহত হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করার জন্য তাই কৃষকরা বন্যা, খরা ও গভীর পানি সহনশীল ধান জাত উদ্ভাবন করতেন। আমন মৌসুমে কৃষকদের মাঠে নানান ধানবৈচিত্র্য দেখা যেতো। কৃষকগণ হরেক রকমের ধানি জমির (উঁচু, নিচু, মাঝারি) অবস্থা বুঝে চাষাবাদ করতেন। ধানের ফলন কম হলেও ধানের জাতগুলো দুর্যোগ মোকাবেলায় সহনীয় ছিল। বর্তমানে দুর্যোগ সহনশীল ধান আবাদ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও মানিকগঞ্জের সুশীল রায় বন্যার পানিতে কাইশ্যাবিন্নি ধান আবাদ করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

img_20161019_1123

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার স্বল্পনন্দপুর গ্রামের কৃষক সুশীল রায় (৫০) জানান, তাদের এলাকায় প্রতিবছরই বন্যার পানি আসে। বন্যা সহনশীল ধানের জাত চাষে ফলন কম হওয়ায় কৃষকদের চাষাবাদে আগ্রহ কম। কৃষকরা চান আমন মৌসুমে উৎপাদনশীল ও বন্যা সহনশীল জাতের ধান। এ বছরের বন্যায় হাটিপাড়া ইউনিয়নে মাঠের সকল ধান বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। একমাত্র স্বল্পনন্দপুর মাঠে বন্যার কারণে আমন মৌসুমে কোন ধরনের ধান না পাওয়া গেলেও, ১৮ শতাংশ জমিতে দেখা যায় কাইশ্যাবিন্নি ধান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কার্তিক মাসে কাইশ্যাবিন্নি ধানের থোর আসায় দেখে কৃষকগণ আনন্দিত।

img_20161019_1125-copy

কৃষক পর্যায়ে আলোচনা করে জানা যায়, স্বল্পনন্দপুর গ্রামের কৃষক গুরুদাস মন্ডল প্রায়োগিক কৃষি গবেষণা প্লট থেকে বাছাই করে কাইশ্যাবিন্নি ধানের জাত সংগ্রহ করেন সুশীল রায়। গত দুই বছর ফলন ভালো হওয়ায় জাতটি চাষ করে বীজ সংরক্ষণ করে আবার আবাদ করেন তিনি। এবছর বন্যার পানিতে অন্যান্য ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বল্পনন্দপুর মাঠের ১৮ শতাংশ জমিতে চাষ দিয়ে কাইশ্যাবিন্নি ধান রোপণ করেন তিনি। রোপণের ৫ দিন পর হঠাৎ বন্যার পানি এসে ধান তলীয়ে যায়। কাইশ্যাবিন্নি ধানটি ২০ দিন পানির নিচে থাকে। পরে আস্তে আস্তে জেগে উঠে। মাঠের সকল জাতের ধান নষ্ট হলেও কাইশ্যাবিন্নি ধান কোনমতে বেঁচে ছিল। বেঁচে থাকা দুই একটি ধানের চারা কুশি ছেড়ে গুছি মোটা ও ধানের গাছ বড় হয়। বন্যার পরে ধানের অবস্থা ভালো না থাকায় এলাকার কৃষকগণ মনে করেন ধান হবে না। কিন্তু কৃষকদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে স্বল্পনন্দপুর ধানের মাঠে কাইশ্যাবিন্নি ধানে থোর বের হয়েছে। কাইশ্যাবিন্নি ধানের জমিতে লম্বা শীষে সুন্দর ধান হয়েছে। এই ধান দেখে কৃষকরা আশাবাদী হচ্ছেন। তারা এই কাইশ্যাবিন্নি ধানকে ভালো ফলন ও দুর্যোগ সহনশীল জাত হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ অবস্থায় কাইশ্যাবিন্নি ধানের জাত চাষ করার জন্য ইতিমধ্যে ১২ জন কৃষক বীজ ধান পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কৃষকগণ মনে করেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকদের বাঁচতে হলে কম খরচে বেশি উৎপাদনশীল চাষাবাদে সফল হতে হবে। এলাকা উপযোগী ও দুর্যোগ সহনশীল বিভিন্ন জাতের ধান চাষে কৃষকগণ আত্মবিশ্বাসী হলে ধানবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে। ধানবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেলে কৃষকরা তাদের নিজের ইচ্ছায় বীজ সংরক্ষণ করবেন এবং পরবর্তীতে চাষ করতে পারবেন। এতে কৃষকরা বাঁচবেন; চাষবাসে লাভবান হবেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: