Posted in

গৃহপালিত প্রাণিসম্পদ নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে কৃষকদের

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
প্রত্যেক মানুষই সম্পদশালী। বস্তুগত এবং অবস্তুগত সম্পদে পরিপূর্ণ একজন মানুষের জীবন। তবে বস্তুগত সম্পদকে ঘিরেই রচিত হয় তাঁদের জীবনযাত্রা। বর্তমান সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের বস্তুগত সম্পদ অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন কৃষকের বস্তুগত সম্পদ হলো তাঁর কৃষিজমি, প্রাণিসম্পদ, বীজ ইত্যাদি। এসকল সম্পদ যখন অনাকাঙ্খিত ক্ষতির সম্মুখিন হয় তখন তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যোগ হয় বাড়তি দুশ্চিন্তা।


নেত্রকোণা অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট অকাল বন্যায় কৃষকগণ তাঁদের গৃহপালিত প্রাণিসম্পদ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কিছু না কিছু প্রাণিসম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতর ইত্যাদি। অত্র এলাকায় পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশেষ করে গরু পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কৃষকগণ নানা সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন।


বছরে ধান চাষের দুইটি মৌসুম (আমন ও বোরো) বাদ দিলে অন্যান্য সময় ধানের জমিগুলো পতিত বা উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে। এসকল পতিত জমিতে তখন প্রচুর পরিমাণে ঘাস জন্মায়। আর এই সময়ে গেরস্থরা তাঁদের গরুগুলোকে ঘাস খাওয়ার জন্য ওই জমিতে দিয়ে রাখে। আবার জমি বা জমির আইল থেকে ঘাস সংগ্রহ করে গরুকে খাওয়ানো হয়। তাছাড়া শুকনো খড়বিচালি তো আছেই।


কিন্তু এবছর প্রচুর বৃষ্টিপাতে ধানের জমিগুলোতে কোথাও হাঁটু পানি বা কোথাও তারও বেশি। এই অবস্থায় গরুকে খোলা জমিতে রাখা যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে বড় রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় সারাদিন বেঁধে রাখতে হচ্ছে। রাস্তায় রেখে দেয়ার কারণে গরুগুলো মাঝে মাঝে দূর্ঘটনার শিকারও হচ্ছে। একদিকে গরু চড়ানোর সমস্যা অন্যদিকে ঘাসও সংগ্রহ করা যাচ্ছেনা। যার ফলে গরুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।


এটাতো গেল গরুর খাবারের সমস্যা। তারচেয়েও ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে রাতে গরু চুরি যাওয়ার আশংকা। নদীর পানি বেড়ে যাওয়া এবং জমিগুলো পানিতে ডুবে থাকাকেই এর কারণ বলে মনে করছেন কৃষকগণ। গ্রাম থেকে গরু চুরি করে নদী পথে পালিয়ে যাওয়ার মতো দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রতি বছরই ঘটে। তবে এবছরের বিষয়টি একটু ভিন্ন। কারণ প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামকেই ঘিরে রেখেছে অতিবৃষ্টির পানি। তাছাড়া নদীর বাড়তি পানি তো আছেই। একারণেই নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা গরু চুরি যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।


সাধারণত গ্রামের গোয়াল ঘরগুলো বসতঘর থেকে একটু দূরে তৈরি করা হয়। এবং এই ঘরে রাতে কেউ থাকেও না। বাড়ির কারো যদি রাতে ঘুম ভাঙ্গে তখন হয়তো গোয়ালে উঁকি দিয়ে গরুগুলোকে দেখে আসে। কিন্তু সেটাও নিয়মিত নয়। তাই রাতে গরু চুরি করে নৌকা বা ট্রলারের সাহায্যে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়া খুবই সহজ।
সামনে ঈদুল আযহা। এই পরবকে সামনে রেখে অনেক কৃষক ষাঁড় বা গাভী বিক্রি করার অপেক্ষায় থাকেন। কারণ এই সময়ে বিক্রি করলে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা লাভবান হতে পারেন। এলাকার চরম দূর্যোগের সময় যদি কোনো কৃষকের কষ্টে পালিত গরু চুরি হয়ে যায় তবে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই বিপর্যয়ের সম্ভাবনায় অনেক কৃষক কম মূল্যে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।


দিনে গরুর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা এবং রাতে না ঘুমিয়ে পাহারা দেয়া কৃষকদের এখন প্রতিদিনের বাড়তি চাপ। ধানের তুষ, ভাতের মাড়, আত্মীয় বা প্রতিবেশির বাড়ি থেকে খড় সংগ্রহ করে সেই খাদ্যের অভাব পূরণ করছেন। আবার রাতে প্রতিটি বাড়ির পুরুষ সদস্যরা পালা করে গোয়াল ঘর পাহারা দিচ্ছেন। এছাড়াও নারীরা বাইরে না গিয়ে ঘর থেকে টর্চ এর আলো ফেলে গোয়াল ঘরের দিকে নজর রাখছেন। এভাবেই প্রতিদিন ও রাত কাটছে কৃষকদের।
চলমান সময়ে কৃষি ও কৃষকের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল। এই অবস্থায় তাঁরা সচেতনতার সাথে প্রকৃতি হয়তো সব সময় আমাদের অনুকূলে থাকেনা। কিন্তু তাই বলে প্রকৃতির বিরুপ প্রভাবকে সহ্য করেও কৃষকরা বসে থাকেন না। তাঁদের নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা দিয়েই তাঁরা নিজেদের মতো করে সমস্যা মোকাবেলা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং টিকে আছেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.