সাম্প্রতিক পোস্ট

উন্নয়নের মূলধারায় ফিরে আসতে চায় প্রান্তিক ও দলিত জনগোষ্ঠী

মানিকগঞ্জ থেকে নজরুল ইসলাম

গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক ধরনের বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং তার ছোঁয়া আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও বহমান, তবে এই পরিবর্তনকে আমরা আমূল পরিবর্তন বা সামগ্রিক পরিবর্তন বলতে পারছিনা। নানা ধরনের ঘাত প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে বেড়েছে মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান। অন্যদিকে জনসংখ্যাধিক্য আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ হলো প্রান্তিক কৃষক, ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন ও ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী। এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ। এই বিশাল শ্রেণীর মধ্যে এখনো অর্থনৈতিক উন্নয়নের এসব সুফল হতে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র পেশাজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে থাকা এসব জনগোষ্ঠীকে মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, দেশে এখন উৎপাদনের সাথে যারা সরাসরি যুক্ত প্রান্তিক কৃষক-ক্ষেতমজুরের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ। বিভিন্ন ক্ষুদ্র পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৬ লাখেরও বেশি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হার প্রায় ২ শতাংশ। পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী।

35132820_193908828108145_3977749210610008064_n
পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে-সাঁওতাল, ওঁরাও, হো,মুন্ডা, চাকমা, মারমা, মুরং, ত্রিপুরা, ম্রো বোম, লুসাই, কুকি ও খুমিসহ নানা গোষ্ঠী। এদের মধ্যে আবার ৮০ শতাংশেরই বাস গ্রামাঞ্চলে। প্রকৃতিই এদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল হলেও প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা বিপর্যয়ের কারণে তাদের অস্তি¡ত আজ হুমকির মুখে। সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পাহারিদের তুলনায় অনেক বেশি বঞ্চিত। এসব সম্প্রদায়ের উল্লেখ সংখ্যক মানুষ এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছে বা নানা কারণে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে তাদের ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসগুলো ও নানা কারণে হুমকির মুখে। এই বিদ্যমান অবস্থা সরকার প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে এবং বর্তমান সরকার তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ২৩০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্প কতটুক তাদের উপকারে আসবে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হবে কি না সেটি আমরা পরবর্তীতে আলোচনা রাখব। পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এর মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বছরের পর বছর নিগ্রহের শিকার দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়। চরম অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন, উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এরা। জেলে, সন্যাসী, ঋষী, বেহারা, নাপিত, ধোপা, হাজাম, নিকারি, পাটনি, কাওড়া, তেলি, পাটিকর, ইত্যাদি তথাকথিত নিম্নবর্গ জনগোষ্ঠী, এ সম্প্রদায়ভুক্ত। সমাজের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিস্তর সামাজিক বৈষম্য।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে, দেশে প্রায় ৪৩ লাখ দলিত, ১৩ লাখ হরিজন ও ৭ লাখেরও বেশি বেদে রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে- বাঁশফোড়, ডোমার, রাউত, তেলেগু, হেলা, হাড়ি, লালবেগী, বাল্মিগী, ডোম ইত্যাদিই হরিজন সম্প্রদায়। যাযাবর জনগোষ্ঠী বেদে সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। বেদে জনগোষ্ঠীর শতকারা ৯৯ ভাগ মুসলিম সম্প্রদায় এবং ৯০ শতাংশই নিরক্ষর। আটটি গোত্রে বিভক্ত বেদে জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে- মালবেদে, সাপুরিয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইনি বেদে ইত্যাদি। এদের প্রধান পেশা ক্ষুদ্র ছিন্নমুল ব্যবসা, তাবিজ-কবজ বিক্রি, বনজী স্বাস্থ্যসেবা, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, বানর খেলা ও যাদু দেখানো।

DSC08007

পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বর্তমান সরকার ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে সাতটি জেলায় কাযক্রম শুরু করে। পরের অর্থবছরে নতুন ১৪ জেলাসহ মোট ২১টি জেলায় এ কর্মসুচি বাস্তবায়ন করা হয়। এখন আরো ১৪ জেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। (তথ্যসূত্র-দৈনিক বণিক বার্তা ১৩,১৪ জানুয়ারি ২০১৭,অর্থনীতি সমিতি ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন র্জানাল)

উল্লেখ্য প্রথম অর্থবছরের তালিকাতেই মানিকগঞ্জ জেলার কেবলমাত্র সদর উপজেলা এই প্রকল্পে অর্šÍভুক্ত হয়। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার সহকারি মো. রমজান আলী এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা যায়, এ কর্মসূচির আওতায় স্কুলগামী দলিত, হরিজন ও বেদে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিকে জনপ্রতি ৩০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৪৫০, উচ্চ মাধ্যমিক ৬০০ এবং উচ্চতর শিক্ষায় ১ হাজার টাকা হারে উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ৫০ বছর বা তদুর্দ্ধ বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল ব্যক্তিকে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে বিশেষ ভাতা দেয়া হয়। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম দলিত, হরিজন, ও বেদে জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আয়বর্ধনমুলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করে তাদেরকে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাই এই কর্মসুচির মূল উদ্দেশ্য। তবে প্রত্যেকটি সুবিধা পেতে হলে বিভিন্ন বিধি বিধান ও শর্ত প্রযোজ্য।

পৌরসভার পশ্চিম দাশরার বাসিন্দা মনি দাস সম্প্রদায় নীলিমা রাণী দাস বলেন, “আমার চার সন্তান প্রত্যেকেই লেখাপড়া করে এবং একই স্কুলে দুজন পড়ায় একজন উপবৃত্তি পেয়েছে অন্যজন পায়নি এবং এই সুবিধা নিতে গিয়ে কত রকমের হয়রানি, যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া খুবই জটিল। এগুলোর সুরহা হলে এই সম্প্রদায়ের মানুষ আরো সুফল পাবে বলে আমি মনে করি।” বারসিক মানিকগঞ্জ রিসোর্স সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে দলিতদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। ইতোমধ্যে বারসিক’র গবেষণায় ও তথ্য সংগ্রহে দলিত সম্প্রদায়ের একটি সঠিক তালিকা প্রস্তুত হয়। এই তালিকার মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, পৌরসভা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তারা দলিত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বারসিক র্কমএলাকা ও তার বাইরেও দলিতদের নিয়ে অনুসন্ধান করছে। হরিরামপুর, সদর, সিঙ্গাইর ও ঘিওরে মোট ১৪টি মন্দিরভিত্তিক দলিত কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু আছে। উপজেলা প্রশাসন বলছে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরো বৃদ্ধি করা হবে। অন্যদিকে আপাতত একই পরিবারে দুইজনকে উপবৃত্তি দেয়ার বিধান তাদের নেই।
মানিকগঞ্জ শহরস্থ খানবাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ মোল্লা বলেন, “সাধারণত যে কোন উপবৃত্তি পেতে হলে তাকে অবশ্যই একজন নিয়মিত ছাত্র হতে হবে। সেটির মানদন্ড হলো শতকরা আশি ভাগ উপস্থিতি, সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ ও গড়ে ৪০% নম্বর। এছাড়াও শ্রেণী শিক্ষকের হাতে রয়েছে কিছু নম্বর সবকিছু মিলিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই সুযোগ থাকলে কাউকে বঞ্চিত করার ইচ্ছা আমাদের নেই।”

DSC08009
মানিকগঞ্জ বিগত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মনজুর মুহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, “প্রান্তিক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার বহুমুখী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিভিন্ন কর্মমূখী প্রশিক্ষণের পর কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “কৃষি ও অকৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুফল ভোগী সদস্যদের মাঝে চলতি অর্থবছরে ১ হাজর কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের শস্য সংগ্রহ পরবর্তী সহযোগিতার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ শীর্ষক ৭৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।” তিনি বলেন, “এছাড়াও পিছিয়ে থাকা নারীদের অবস্থার উন্নয়নে নগরভিত্তিক মহিলা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এই সকল প্রকল্প ছাড়াও আরো অনেক নতুন প্রকল্প আগামী অর্থবছরে আসবে। এইভাবে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিশ্চিত আয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যাতে অর্থনীতির মূলধারায় তারা আরো অবদান রাখতে সক্ষম হয়।”

নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিশিষ্ট নারী নেত্রী শ্রী লক্ষী চ্যাটার্জী বলেন, “প্রকল্প হচ্ছে উন্নয়ন হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে নানান জটিলতা, শর্ত ও বিধি বিধানের বেড়াজালে বঞ্চিত হচ্ছে অনেকেই এবং সরকারি দলের সাথে যোগসাজস করে দুর্নীতিবাজ আমলারা পকেট ভরছে। এগুলো বন্ধ করতে না পারলে শুধু প্রকল্প দিয়ে তাদেরকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।”

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: