সাম্প্রতিক পোস্ট

মানিকগঞ্জে ধান চাষে স্থানীয় জাতের প্রভাব

::মানিকগঞ্জ থেকে কৃষিবিদ মো. জিল্লুর রহমান::

ভূমিকা
ধান বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য। বিশ্বে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ অন্যতম। ধান  উৎপাদনে ব্যবহৃত  মোট জমি এবং উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থতম এবং হেক্টর প্রতি ফলন উৎপাদনে ৬ষ্ঠতম স্থান অধিকার করেছে। এ দেশের উষ্ণ ও আদ্র জলবায়ু ধান চাষের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এ তিন মৌসুমে ধান ব্যাপকভাবে চাষ করা হয় এবং যা দেশের মোট আবাদযোগ্য ৮০% জমিতে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রতিবছর দুই মিলিয়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরবর্তী ২০ বছরে ৩০ মিলিয়ন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সীমিত ভূমি সম্পদ ও উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্বের কারণে ধানের জমি কোন ক্রমেই বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। বর্ধিত ধান উৎপাদনের জন্য সম্ভাব্য চলমান চাষাবাদে বিভিন্ন জাতের জন্য উৎকৃষ্ট ফসল ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। প্রতিটি জাত কোন নির্দিষ্ট পরিবেশে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বহন করে যা কোন বিশেষ ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলের সমস্যার ধরণ আলাদা । মানিকগঞ্জ জেলা দুটি কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চল নিয়ে গঠিত। নিন্ম গঙ্গা প্লাবনভূমি যা মানিকগঞ্জ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও নবীন ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা প্লাবণভূমি যা উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত। জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জমির ধরণ নীচু ও মাঝারি নীচু  এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জমি নীচু, মাঝারি নীচু ও মাঝারি উঁচু প্রকৃতির। জেলায় মূলতঃ আমন ও বোরো দুটি মৌসুমে ধানচাষ লক্ষ্য করা যায়। এ দুটি কৃষি প্রতিবেশে জমির ধরণ অনুযায়ী আমন মৌসুমে ধান চাষে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হলেও বোরো মৌসুমে এরূপ ভিন্নতা  লক্ষ্য করা যায় না।

মানিকগঞ্জ জেলার কৃষি পরিস্থিতি
মানিকগঞ্জ জেলায় কৃষিতে বেশ কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ধান চাষের জন্য এ এলাকার সমস্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ এলাকার অন্যতম এ মানিকগঞ্জ। বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতিবছর এ এলাকা অতিবৃষ্টি বা বন্যার কারণে প্লাবিত হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে নীচু জমিতে জলাবদ্ধতা লেগে থাকে। বোরো ধান কাটার পর জমিতে পানি  থাকলে তা আমন ধান চাষের আওতায় আসে না। অবশিষ্ট জমিতে প্রতিবছর বপনের মাধ্যমে গভীর পানির ধান হিজল দিঘা ও ভায়াইল্যা এবং উঁচু জমিতে ঢেপু ধান চাষ করা হয়। এ জাতগুলোর ফলন খুবই কম এবং ধান চাষ বৈচিত্র্যতা হারিয়ে আজ হুমকির মুখে। একই সাথে  জমি তার স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ফেলছে।

বোরো মৌসুম দেশের অন্যান্য এলাকায় মধ্য কার্তিক হতে শুরু হলেও এ এলাকায় শুরু হয়  মধ্য মাঘ মাসে। অধিকাংশ জমিতে আমন মৌসুমে ধান উত্তোলনের পর সরিষা চাষ করা হয়। ফলে বোরো মৌসুম পিছিয়ে পড়েছে। আবার অনেকে এ সময় অতিরিক্ত ঠান্ডার হাত থেকে ফসলকে রক্ষার জন দেরিতে বোরো ধানের রোপণ শুরু করেন। মানিকগঞ্জ এলাকায় বোরো  মৌসুমে মাত্র ২টি জাত ব্রিধান ২৮ ও ব্রিধান ২৯ চাষ করা হয়। ব্রিধান ২৮ চাষের পরিমাণ খুবই সীমিত। মূলতঃ মাত্র একটি ধানজাত ব্রিধান ২৯ চাষ হওয়ায় একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা শক্তি, পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অপরদিকে রোগ পোকামাকড়ের উপদ্রব, যথেচ্ছা রাসায়নিক সার ও বিষের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বাধাগুলো দূর করার জন্য স্বল্পমেয়াদী জাতের বিশেষ প্রয়োজন। অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে বর্তমান অনুখাদ্যের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, মাটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে বেলে মাটির রূপ ধারণ করছে। ফসলের মান ও ফলনে ব্যাপক ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং উক্ত মাটি ফসল চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ধান চাষের খরচ বেড়েই চলেছে এবং এ উচ্চ ফলনশীল জাতটির বৈশিষ্ট্য বেশি খাবারে বেশি ফলন। ফলে কম খাবারে বেশি ফলন দিতে সক্ষম এমন জাতের প্রয়োজন।

আমাদের দেশের সেচের পানির সরবরাহ নিশ্চিতকরণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে উঠে না। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় ফসল চাষের ফলে মাটি তার রূপ পরিবর্তন করায় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা  লোপ পাচ্ছে।  ফলে মাত্রাতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ পরিমাণ পানি নিশ্চিতকরণ প্রায় ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এজন্য খরা সহনশীল জাতের বিশেষ প্রয়োজন। ফসল চাষে বৈচিত্র্যিতা না থাকার কারণে রোগ-পোকা আক্রমণের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের খাবারে বিষাক্ততার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে মাটিতে বসবাসকারী অনুজীব তার আবাসস্থল হারাবে এবং মাটিতে কোন জৈব পদার্থ উদ্ভিদের খাবার উপযোগী হবে না। ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এতে উদ্ভিজ্জ খাদ্যের উপর নির্ভরশীল প্রতিটি জীব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য ফসল চাষের বৈচিত্র্যতার সাথে রোগবালাই প্রতিরোধী জাত প্রয়োজন। ধান চাষে এসব সমস্যা সমাধান খুবই প্রয়োজন বলে কৃষকরা মনে করেন।

সমস্যা সমাধানে কৃষকের প্রায়োগিক গবেষণা
বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে ব্যবহারিক গবেষণার ক্ষেত্র খুবই সীমিত। সরকারি উদ্যোগে কিছু প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে যা প্রকৃতপক্ষে যথেষ্ট নয়। পরিবেশ ও প্রতিবেশের কথা বিবেচনায় না এনে শুধু অধিক ফলনের জন্য কিছু ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশে ফসল জাতের উপযোগিতা যাচাই ও উন্নয়নের জন্য কোন প্রায়োগিক গবেষণা নেই বললেই চলে। বেসরকারী গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বারসিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জলবায়ুর বিষয় বিবেচনায় এনে কৃষক নেতৃত্বে প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় ধানজাতের উপযোগিতা যাচাই ও উন্নয়নের কাজ পরিচালনা করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসাবে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ধানের উপর কৃষকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গবেষণার কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। কৃষক নেতৃত্বে গবেষণা কাজটি সম্পূর্ণ জৈবিক উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ গবেষণার কয়েকটি দিক রয়েছে, তা হলো-জাত নির্বাচন, জাত সংরক্ষণ, জাতের উন্নয়ন, ফসল বীজ বর্ধন ও কৃষক পর্যায়ে ক্ষুদ্র পরিসরে পরীক্ষা। গবেষণার কাজের স্তরগুলো হলো-সমস্যা চিহ্নিতকরণ, বীজ অনুসন্ধান, সম্ভাবনাময় জাতের পরীক্ষা ও উন্নয়ন, জাত নির্বাচন ও কৃষক পর্যায়ে জাতের সম্প্রসারণ।

গবেষণা প্রক্রিয়ায় প্রথমে সমস্যার আলোকে ধান বীজ সংগ্রহ করে বীজ বপন উপযোগী করা হয়। জমি প্রস্ততির পর বীজ বপন বা চারা রোপণ করা হয়। আন্তঃপরিচর্যাজনিত যাবতীয় কাজ ও প্রয়োজনীয় তথ্য কৃষকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পাদিত ও  সংগ্রহ করা হয়। মাঠ দিবসের মাধ্যমে কৃষক কর্তৃক জাতগুলো নির্বাচন ও কর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি জাত সংরক্ষণের জন্য যাবতীয় কাজ করা হয়। পরবর্তী মৌসুমে নির্বাচিত জাতগুলো ক্ষুদ্র পরিসরে পরীক্ষা, বীজ বর্ধন ও সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের মাঝে বীজ বিতরণ করা হয়। জাতগুলোর উন্নয়নের জন্য এলাকার চাহিদা মেটাতে সক্ষম এমন জাত ছাড়াও সংরক্ষিত জাতগুলো নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাজ বীজ বপন থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত চলমান থাকে। এ প্রক্রিয়ার শেষে ধানের শীষ বাছাই করা হয়। ধানের শীষের আকার, ধানের গাঁথুনী ও সংখ্যা, ধানের আকার, গাছে বা শীষে রোগবালাই এর অবস্থা, ধানের রঙ, পুষ্প উৎপাদনের সময় ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য দেখে ধানের শীষ নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত শীষগুলো সংগ্রহ করে মাড়াই করার পর একত্র করে শুকানো হয়। সর্বোপরি বায়ুরোধী কোন পাত্রে বীজ হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিবছর আদর্শ জাতও চাষ করা হয় এবং এগুলোর সাথে নির্বাচিত বীজ থেকে সৃষ্ট উদ্ভিদের তুলনা করা হয়। এভাবে বীজগুলো প্রতিবছর চাষ করা হয়। অধিক পরিমাণে বীজ উৎপাদন করে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী তা প্রদান হয়।

প্রায়োগিক গবেষণার অগ্রগতি

কৃষকদের পছন্দ অনুযায়ী উল্লেখিত সমস্যাগুলোর আলোকে এলাকা উপযোগী জাত নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মানিকগঞ্জ জেলায়  ৫টি মূল পরীক্ষণ প্লটে কৃষক নেতৃত্বে মাঠ গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রথম ২০১০ সালে ৪৫টি ধানজাত নিয়ে গবেষণা কাজ  শুরু হয়েছিল। বর্তমানে গবেষণায় মোট জাত ২১৫টি তন্মধ্যে আমন মৌসুমের ১৪৯টি এবং বোরো মৌসুমের ৬৬টি জাত। বর্তমানে ২৪টি ধানজাত নির্বাচন গবেষণায়, ১৩টি জাত  বর্ধন গবেষায় ও  ১৭৮টি জাত সংরক্ষণে রয়েছে। এলাকায় এ পর্যন্ত মোট ৫৯টি জাত ৫৪৮ জন কৃষক কর্র্তৃক নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচিত জাতগুলো ক্ষুদ্র পরিসরে পরীক্ষার জন্য মোট ৬৬৫ কেজি ধান বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে মোট ৫২ বিঘা জমিতে এলাকার কৃষক কর্র্তৃক নির্বাচিত ধানজাতগুলো চাষ ও বীজ বর্ধন হয়েছে। নির্বাচিত জাতগুলোর মধ্য হতে কৃষক নিজস্ব জমিতে পরীক্ষার পর মোট ১৪টি জাত এলাকায় চাষ চলমান রয়েছে এবং এজাতগুলোর বীজ বর্ধন এবং  কৃষক-কৃষক ধানজাতগুলো সম্প্রসারণ হচ্ছে। এজাতগুলোর মধ্যে আমন মৌসুমের জাতগুলো হলো-আমশাইল, লক্ষ্মীদিঘা, কাঁচকলম, নোয়াটি, আজলদিঘা, মোল্লাদিঘা ও হিজলদিঘা  এবং বোরো মৌসুমের জাতগুলো হলো-কাইশ্যাবিন্নি, মকবুল, মিনিকেট, চিনিগুড়া, বাঁশমতি, বেগুনবিচি ও রাজভোগ। এ পর্যন্ত মোট বর্ধনকৃত অবস্থার বিবেচনায় সর্বোচ্চ ২৫% কৃষক কাইশ্যাবিন্নি, ১৯% কৃষক মিনিকেট, ১৮% কৃষক মকবুল ও ১৬% কৃষক আমশাইল জাত তাদের নিজস্ব জমিতে বর্ধনের কাজ করছেন। সর্বোচ্চ ফলনশীল জাত কাইশ্যাবিন্নি ও মকবুল উভয়ই ৬.৪২ টন/হে: এবং জীবনকাল ১৩৩দিন ও ১২৯দিন। মিনিকেট, আমশাইল, বাঁশমতি ও ডিএস১ কম খরচে চাষ করা যায়।

কৃষক কর্তৃক নির্বাচিত ধানের এজাতগুলো কৃষকের শ্রেণী প্রবর্তক দল, অগ্রগ্রহণকারী দল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। অগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, পশ্চাদপদ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ও দীর্ঘসূত্রী দলের মধ্যে সহজেই জাতগুলো গ্রহণকারী দলের কৃষকের মাধ্যমে খুব কম সময়েই সম্প্রসারিত হবে বলে কৃষকরা আশা করেন। এতে কৃষকরা  বৈচিত্র্যপূর্ণ, গভীর পানির, স্বল্পমেয়াদী,  কম খরচে ও ফলনশীল জাত চাষ করতে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: