Posted in

জলবায়ু প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে শিখেছে পূর্ণিমা রানী

শ্যামনগর সাতক্ষীরা থেকে বিধান মধু
‘কালো মেঘ চারিদিকে অন্ধকার, কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে ঝড় শুরু হয়, সাথে বৃষ্টি। এর মধ্যে আমাদের বসতঘরের ২টি টিনের চাল উড়ে গেছে, চারিদিকের ভয়াবহ রূপ দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আর কিছু মনে করতে পারিনি। জ্ঞান ফেরার পরে নিজেকে একটি বাড়িতে আবিস্কার করলাম। অনেক ক্ষতি হয়েছিলো, বাড়ির পাশের রাস্তাঘাট, ক্ষেত, গরু,ছাগল সব কিছু শেষ হয়ে গিয়েছিলো।’


স্মরণকালের প্রথম দেখা ঝড় সিডরের ভয়াবহতার কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন কামালকাঠি গ্রামের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের অষ্টম শ্রেণী পড়য়া পূর্নিমা রানী মন্ডল। পেশায় একজন গৃহিনী। বর্তমান বয়স ৩৬ বছর। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিলো তার। ৪ সদস্য বিশিষ্ট সংসারে স্বামী, ১ মেয়ে ও ১ ছেলে। বর্তমানে মেয়ে নবম শ্্েরণীর ছাত্রী, ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ৮৮ বন্যার সময় তিনি অনেক ছোট ছিলেন বলে কিছুই মনে করতে পারেননি।
পরবর্তীতে তার ছোট্ট জীবনে অনেক ঝড়, বন্যা দেখেছেন, তার মধ্যে আইলা, আম্ফান, ফণি, বুলবুল অন্যতম। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি আইলা ঝড়ের অভিজ্ঞতার কথাও সহভাগিতা করেন।


তিনি বলেন, ‘এ ঝড়টিও কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়েছিলো। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, বাতাস, নদীতে প্রচুর পানি বৃদ্ধি পেয়েছিলো, বেড়ীবাঁধের কিছু কিছু জায়গায় ভেঙে আমাদের এলাকা দ্রত প্লাবিত হতে লাগল। আমি ছিলাম তখন ৫ কি ৬ মাসের অন্তঃসত্বা। চারিদিকে ছুটোছুটি! কে কোথায় যাবো। অনেকে বেড়ীবাঁধের উচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলো। ভাগ্য ভালো যে, আমাদের একটি বড় নৌকা ছিলো! গাছের সাথে বেঁধে তাতে আমাদের বাড়ির ছেলে বুড়োসহ প্রায় ২০ জন সারারাত নৌকার ওপরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। চারিদিকে পানির প্রচন্ড স্্েরাত ছিলো। যেখানে আমাদের জীবন বাঁচানোই দায় সেখানে হাস, মুরগি, গরু ছাগল কিছুই সাথে নেওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সকালে কোনো রকমে বেড়ীবাধের রাস্তায় উঠেছিলাম। কয়েক ঘণ্টার পর রাস্তা থেকে কে বা কারা আমাদের আরো একটি বড় নৌকায় করে নিরাপদ একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো। ঝড়ের পর যখন নিজের বাড়ি ফিরে আসলাম দেখলাম চারদিকে শুধু ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি। হতাশ হয়ে পড়লাম। শুধু ভাবছিলাম কি করে এত বড় ক্ষতি পুষিয়ে উঠব।’


আইলার দুঃসহ ভয়াবহতার কথা বলতে বলতে চোখের কোনায় জল চলে আসছিলো পুর্নিমা রানীর। পূর্ণিমা এবং তার স্বামী অন্যের ঘেরে জোন মজুরি দেন, এলাকায় কাজ না থাকলে মাঝে মাঝে ইটের ভাটায় কাজ করতে যেতে হয় তার স্বামীকে। মাঝে মাঝে নদীতে চিংড়ি পোনা ধরে পূির্ণমা রানী। দিন রাত পরিশ্রম করে অদম্য মনোবল নিয়ে হাটি হাটি পা পা করে অবশেষে পুর্ণিমা রানীর পরিবার এখন সে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। ভিটেবাড়িসহ ৩ শতক জায়গা আছে তাদের। কোথাও এতটুকু জায়গা ফাঁকা রাখেননি। সেখানে তিনি বিভিন্ন শাকসবজি লাগিয়েছেন যাতে কিছুটা পারিবারিক চাহিদা মেটানো যায়। বর্তমানে তাঁর ছোট বড় মিলে ১২টি ছাগল আছে। প্রতিবছর ছাগল বিক্রি করে তিনি পরিবারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটান। সিডর, আইলা, আম্ফান, ফণি, বুলবুল এর মত ঝড়ে এর সাথে সংগ্রাম করে স্বামী সন্তান নিয়ে কোন রকম কেটে যাচ্ছে তাঁর ।


কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে পূর্ণিমা বলেন, ‘এখন ঝড় বৃষ্টি বেশি হচ্ছে, আগে এতো হতো না। কারণ হিসেবে তার মতে, ‘মানুষ গাছপালা বেশি কেটে ফেলছে যার ফলে আইলা, আম্ফান, ফনি, বুলবুল এর মত দুর্যোগ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া নদীতে আগের চেয়ে লবণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে এ এলাকার মানুষের নানা ধরনের নিত্য নতুন রোগ তৈরি হচ্ছে। লবণ পানিতেই শুধু রান্না ছাড়া বর্তমানে সমস্ত কাজ করতে হয়। আশেপাশে দু’একটি মিষ্টি পানির আধার থাকলেও সারাবছর পানি থাকে না। বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরের পুকুরে গোসল করতে গেলে অনেক সময় মন্দ কথাও শুনতে হয়, বাধ্য হয়ে তাদের লবণ পানিতেই গোসল করতে হয়।’
পূর্ণিমা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারী প্রশিক্ষণ নিয়ে দুর্যোগ পূর্ব, দুর্যোগকালীন, দুর্যোগ পরবর্তী প্রস্তুতি ও জলবায়ু যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে সে বিষয়ে তিনি এখন অনেকটাই সচেতন। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাল্য বিয়ে ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে তার মেয়ের জন্য অনেক জায়গা থেকে বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজ নিতে শুরু করেছেন। তাঁর একটাই কথা মেয়েকে ১৮ বছরের আগে তিনি বিয়ে দিতে চান না। বাল্য বিয়ের কুফল সম্পর্কে তিনি এখন অনেক সচেতন।


পূর্ণিমা রানী বলেন, ‘এখানেই আমাদের থাকতে হবে। স্বামীর ভিটা মাটি ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। রাতারাতি আমাদেরকে কেউ উন্নয়ন করে দেবে না। আমাদের পরিবর্তন আমাদেরই করতে হবে। সুতরাং দূর্যোগ এর সাথে সাথে নিজেরা কিভাবে টিকে থাকব সেটা আমাদেরকেই ভাবতে হবে।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.