সাম্প্রতিক পোস্ট

মহেন্দ্রর স্বপ্নের ঘর

দেবদাস মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি, উপকূলীয় অঞ্চল :

ঘরহীন বার্ধক্যের জীবন। অসহায়ত্বের এক জীবনের নাম মহেন্দ্র হালদার। জ্বীর্ণ শীর্ণ একাকী মানুষ। সত্তোরোর্ধ বয়সী গৃহহীন এই মানুষের দেখার কেউ নেই। ছেঁড়া খোড়া দরজা জানালহীন খুপড়ি ঘরে বসতি। সেই ঘরে সোঁদা মাটির বিছানা। ঝড় বৃষ্টি, বৈরী বাতাস আর বিষধর প্রাণীর সঙ্গে নিয়ত লড়ে যাওয়া জীবন। তবু মহেন্দ্র ভিক্ষায় বাঁচেন না। এই অসহায় একাকী জীবনে নিজেই রান্না করে আধাবেলা আর কখনও অনাহারী জীবন চলে।

নিজে ভাগ্যহীন হলেও একসময় অবশ্য মানুষের ভাগ্য গণনা করতেন। শিশুদের পড়াতেন। এজন্য এলাকার মানুষ তাকে মহেন্দ্র মাস্টার বলে ডাকতেন। নিজের তিন কাঠা জমির একটা ভিটে আছে। তবু তার এক জীবনে একটা বসতির ঘর ছিলনা। এমন দুর্ভাগা মহেন্দ্র নিজের ভিটে মাটিতে বহুদিন ধরে একটি ঘরের স্বপ্ন দেখেন। জীবনের ক্রান্তিকালে এসে সেই ঘরে তাঁর ঠাই হবে। একটা খাট, একটা মশারী, একটা টেবিল আর নিজের দরকারি জিনিসপত্র সাজানো থাকবে সেই ঘরে। সেই সাথে পাকা একটা ল্যাট্রিন। বাড়ির স্বপ্নটা পূরণ হলে আর বৃষ্টি ভেজা নয়, খুপড়ি ঘরে ঝড় আর বিষধর সাপের ভয়ে জবুথবু জীবন নয়। এই এক জীবনে এই স্বপ্নের ঘরটা দেখেই মরতে চান দুর্ভাগা মহেন্দ্র। হঠাৎ করেই মহেন্দ্রর স্বপ্নটা পূরণ হয়ে যায়।
devdas-pic9
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার চরখালী গ্রামের গৃহহীন বৃদ্ধ মহেন্দ্রর হালদার বুধবার স্বপ্নের (২১ সেপ্টেম্বর) বাড়িটার স্বপ্নলোকের  চাবি হাতে পেয়ে যান। মাটিতে পড়ে থাকা মহেন্দ্রর এখন পাকা ভিত্তির ওপর নতুন চকচকে টিনের একটা প্রশস্ত বাড়ি। পাকা ল্যাট্রিন। শোবার ঘরে নতুন খাট, বিছানা, বালিশ আর নতুন চাঁদর ও মশারী। সেই সাথে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র।

বুধবারের(২১ সেপ্টম্বর) সকালটা তাই দুর্ভাগা মহেন্দ্রর স্বপ্ন পূরণের দিন। মহেন্দ্রর স্বপ্নের বাড়ির আঙিনাজুড়ে শত লোকের আনাগোনা। নতুন ঘরে ওঠার ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী নতুন ঘরে সকালে নারায়ণ পূজা আর সন্ধ্যা রাতের কীর্তনের আয়োজন করেছেন। এজন্য তিনি গাঁয়ের শতাধিক মেহমানদের নিমন্ত্রণ করে রাতে ডালভাতেরও আয়োজনও করেছেন।
আশার কথা মহেন্দ্রর এই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে চার বন্ধুর উছিলায়। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির চার সহপাঠী বন্ধু উন্নয়নকর্মী সাহিদুর রহমান, আইসিডিডিআরবির গবেষক বিথি বিশ্বাস, ডা. মিশাল পাল এবং ডা. দীপা বড়–ুয়া মিলে ঘরহীন নিসঙ্গ বৃদ্ধ মহেন্দ্রর স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরে ময়মনসিংহের উন্নয়ন সংগঠন আসমানী এ মহতী কাজের সাথে যুক্ত হন। ২৫ দিনের মধ্যেই স্বপ্ন বাড়ি তৈরি হয়ে যায়।

যেভাবে স্বপ্নের ঘর
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. সাহিদুর রহমান আন্তর্জাতিক সার উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইএফডিসি-ইউএসএইড) একটি প্রকল্পের মনিটরিং কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। তার কর্ম এলাকা উপকূলীয় পিরোজপুর অঞ্চল । তাকে প্রায় ভা-ারিয়া কর্ম এলকায় যেতে চরখালী-ভা-ারিয়া সড়ক পার হতে হয়। সাহিদুর সড়কে কুঁজো হয়ে এক বৃদ্ধকে হেঁটে যেতে দেখেন প্রায়। শাক পাতা ভর্তি দুটো বাজারের ব্যাগ। সাহিদুরের বৃদ্ধের প্রতি কেন যেন কৌতুহল জাগে। তার খোঁজ জানতেই মোটরসাইকেল থামান। অনুমতি নিয়ে ছবিও তোলেন। কিন্তু বৃদ্ধের এ নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া নেই। পরে তাঁর বৃত্তান্ত জানতে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে ধরণা দেন, ঠিকানা সংগ্রহ করেন। এরপর একদিন বিকালে ¯্রফে বৃদ্ধের জীবন ও জীবিকা জানতেই চরখালী গ্রামে ওই বৃদ্ধের বাড়িতে যান।

সাহিদুর জানালেন, তিনি তার ঘর দেখে হতবাক হয়ে যান। বাড়ি নয় একটা লতা পাতার বাগান। সেখানে ডালপালা আর শত ছিন্ন মলিন কাপড় ছাওয়া খুপড়ি ঘর। ঘরহীন এই মানুষের কেউ নেই। যেন আদিম বসতি। একাকী এই মানুষের দুরাবস্থা দেখে সাহিদুর মানুষ হিসেবে আবেগ প্রবণ হন। তিনি মনস্থির করেন বৃদ্ধের এই আদিম বসতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। তিনি ওই ছেঁড়া খোড়া ঘরের ছবি তুলে গত ২৫ জুলাই  নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি মানবিক স্টাটাস লিখেন। সেখানে তারঁ মানবিক বন্ধুদের সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান। এভাবেই শুরু হয়ে যায় স্বপ্ন ঘর নির্মাণ প্রকল্প। সমমনা মানবিক মানুষের সহায়তা মিলে যায় দ্রুত। গত ২৫ আগস্ট বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। উদ্যোক্তা সাহিদুর রহমান ও সহকর্মী মঠবাড়িয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার কর্মকার মিলে এই কাজের তদারকি করেন।
devdas-pic8
মহেন্দ্র বৃত্তান্ত
ভা-ারিয়া উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দুরবর্তী গ্রাম চরখালী। নিভৃত গ্রামে এক চিলতে পাকা রাস্তা চলে গেছে বৃদ্ধ মহেন্দ্রর বাড়ি অবধি। তবে বিদ্যুতহীন গ্রাম। এই গ্রামের প্রয়াত বসন্ত হালদার ও মালতি রাণী দম্পতির বড় ছেলে মহেন্দ্র হালদার। এসএসসি পর্যন্ত লেখা পড়া করেছেন তিনি। এরপর পরের জমিতে কামলা খেটে জীবন ও জীবিকা চলছিল। মহেন্দ্রর ছোট ভাই জিতেন্দ্র হালদার  ৫ বছর আগে অসুখে মারা গেলে মহেন্দ্র চরম বিপাকে পড়ে যান। তাকে দেখার মতো আর কেউ থাকে না। না স্ত্রী, না সন্তান! কেউ নেই এই কুলে তাঁর। অসহায় মহেন্দ্র জমি জিরেত বলতে তিন কাঠার এক টুকরো ভিটে। সেখানে খুপড়ি তুলে চলছিল মহেন্দ্রর জীবন লড়াই। ২০ বছর আগে মহেন্দ্রকে এলাকার এক দুবর্ৃৃত্ত লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করলে তার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে যায়। সেই থেকে তার কুজো হয়ে বেঁচে থাকা। অর্থাভাবে চিকিৎসা না হওয়ায় সত্তোরোর্ধ বার্ধক্যের শরীরে নানা রকম রোগ এসে বাসা বাঁধে। এমন অসহায়ত্বের জীবনে নিদারুণ কষ্টে চলে তাঁর জীবন। গ্রামের জলাশয়ে জন্মে থাকা নানা জাতের শাক তুলে বাড়ি থেকে এক কিলো মিটার দুরে চরখালী ফেরীঘাটে বিক্রি করেন। এতে তার বড়জোর ৪০/৫০ টাকা রোজগার হয়। এদিয়ে আহার চলে তাঁর। নিজেই রান্না করে দুটো ডালভাত খান। মাছ কিংবা মাংস পেটে জোটার জীবন কোথায় নিজেই জানেন না। ঘরহীন জীবনে ছেঁড়া খোঁড়া খুপড়ি ঘরে এ যেন মুক্তির মৃত্যুর প্রহর গুণে বেঁচে থাকা। একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড নেই তাঁর। শাকপাতা কুড়ানোর জীবনে আর কোন আয়ের সংস্থানও নেই। চরখালী ফেরিঘাট বাজারের মসজিদের পাশে পতিত একটু জমিতে মসজিদ কমিটির কাছ থেকে চেয়ে নেন। সেখানে মহেন্দ্র শীতকালীন শাক সবজির আবাদ করেন। সেখানের রোজগার  থেকে মসজিদের উন্নয়নে কিছু দান করেন আর বাকিটা নিজে জীবন ধারণে ব্যয় করেন। কিন্তু বার্ধক্যের শরীরের এখন তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ভান্ডারিয়া পৌর শহরের সাংস্কৃতিক কর্মী আহসান ফেরদৌস তুহীন বলেন,“ মহেন্দ্র কাকুর কেউ নেই। ঘর নাই। এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রকল্পের ঘর আসে মহেন্দ্র কাকুর ঘর মেলে না। কেউ এই অসহায় বৃদ্ধের খোঁজও নেয় না। মহেন্দ্র কাকুর জন্য কয়েকজন শুভজন মিলে থাকার একটা ঘর তুলে দিয়ে জেনে নিজে দেখে এসেছি। এই মানবিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আশা করছি অসহায় মহেন্দ্র কাকুর শেষ জীবনের একটা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন তাঁ চিকিৎসা প্রয়োজন। একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড হলে বৃদ্ধের কিছুটা খাদ্যের সংস্থানও হত।”

অতঃপর ঠিকানা আসমানী
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির চার সহপাঠী বন্ধুর শুভ উদ্যোগে অসহায় মহেন্দ্রর ঘর নির্মাণ শেষ। ২১ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে থুপড়ি ঘরের মানবেতর জীবন থেকে সে স্বপ্নের নতুন ঘরে উঠেছেন। গতকাল বুধবার দুপরে চরথালী গ্রামে বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে নতুন ঘরভর্তি মানুষ। মহেন্দ্রর ঘরে নারায়ণ পূজা চলছিল তখন। স্থানীয় ক্ষিতীশ চন্দ্র মিস্ত্রী বলেন, “মহেন্দ্র কাকার ঘর ছিল না। আজ নতুন ঘর পেয়েছেন। আমরা আনন্দিত। নতুন ঘরে ওঠার আগে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নারায়ণ পূজা আর রাতে কীর্তন গানের আয়োজন করা হয়েছে। এজন্য শতাধিক মানুষকে রাতের খাবারেও আয়োজন করা হয়েছে। আমরা পাড়া প্রতিবেশী মিলে সহযোগিতা করছি।”
মহেন্দ্রর স্বপ্নের ঘর নির্মাণে সার্বক্ষণিক তদারককারী তরুণ আশীষ সাহা বলেন, “মহেন্দ্র হালদার হচ্ছেন পল্লী কবির এ যুগের আসমানী। তাই তার ঘরের নাম দেওয়া হয়েছে আসমানী। এমন একটি শুভ কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে পেরে সুখ অনুভব করছি।”
শুধু ঘর নয় মহেন্দ্রর জন্য খাট, নতুন বিছনা, হারিকেন, নুতন পোষাক, চেয়ার টেবিল, আলনা, হাড়ি পাতিল, সামিয়ানা, বইয়ের তাকসহ ঘরের ভেতরে উপসনালয়ের সিংহাসন দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে স্বাস্থ্য সম্মত একটি ল্যাট্রিন।
devdas-pic-1
মহেন্দ্র’র ভাষ্য
খুপড়ি ছেঁড়ে নতুন ঘরে উঠতে পেরে মহেন্দ্র হতবাক। আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না। ছলছল চোখে যেন সে বাক্য রুদ্ধ। কিছুই গুছিয়ে বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, “আমি একটা ঘরের স্বপ্ন দেখেছি। ভেবেছি স্বপ্নটা ন্বপ্নই থেকে যাবে। ভেবেছি এই খুপড়িতে একদিন মরে পড়ে থাকব। আজ আমার একটা স্বপ্ন পূরণের দিন। যারা এই স্বপ্ন পূরণ করে দিলেন তাদের আমার দেওয়ার কিছু নাই । শুধু বলি মানুষগুলো যেন ভালো থাকে । এখন মরে গেলেও জীবনে আর কোন দুঃখ নাই।”

স্থানীয়দের ভাষ্য
স্থানীয় একটি উন্নয়ন সংগঠনের উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মিনতি রানী মিস্ত্রী বলেন, “মহেন্দ্র দাদা বড় অসহায়। তার কোন ঘর ছিল না। খুপড়ি ঘরে থাকেন। তার কেউ দেখার ছিল না। খুপড়ি ঘরে ঝড় বৃষ্টিতে কত কষ্ট পেয়েছেন। এখন নতুন একটা টিনের ঘর হয়েছে তার। এটি অত্যন্ত সুখের ঘটনা। তবে আশ্চর্য লাগে আজ অবধি সরকারি ও বেসরকারিভাবে কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। কোন সহায়তাও মেলেনি। এখন ঘর হয়েছে বটে তবে সে খুব অসুস্থ চিকিৎসা প্রয়োজন। কিভাবে তার নিত্য আহারের সংস্থান হবে তা জানা নেই।” স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মনির হোসেন হাওলাদার বলেন, “মহেন্দ্র কাকু অসহায় সেটা জানি। তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ হয়েছে শুনেছি। আমি কাল পরশুর মধ্যে তাকে দেখতে যাব। তার বয়স্কভাতার কার্ড যাতে হয় সে উদ্যোগ নেব।” অন্যদিকে এ বিষয়ে ভা-ারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আতিকুল ইসলাম উজ্জল বলেন, “ঘরহীন অসহায় বৃদ্ধের জন্য ঘর তুলে দেওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব । মহেন্দ্রর জন্য কয়েকজন তরুণ ঘর নির্মাণ করেছেন বিষয়টি এ মুহুর্তে আমার জানা ছিল না। তবে এমন উদ্যোগ মহতী ও প্রশংসনীয়। আমি বৃদ্ধের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

happy wheels 2
%d bloggers like this: