Posted in

প্রবীণদের যোগ্য সম্মান দিই

রাজশাহী থেকে ইসমত জেরিন

 

গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের পূজাতলা গ্রামে বাস করেন ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আব্দুল মতিন বিশ্বাস।পরিবারে ছেলে, ছেলের স্ত্রী, একটি নাতি এবং তিনি নিজে মোট ৪ জন সদস্য।ছেলে কৃষক আর তিনি গ্রামের একমাত্র বাঁশের তৈরি জিনিসের কারিগড়। বাঁশ বেতের কাজ ছাড়াও তিনি সারাবছর বাড়ির পাশে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন। পরিবারের কৃষক ছেলের উপার্জনের পাশাপাশি একটি অংশ আব্দুল মতিন বিশ্বাসের এই কাজ থেকেই আসে।পরিবারের ছেলে আর বউমার সহযোগিতায় বাড়ির পাশে ৩ শতক জমিতে সারাবছর চাষ করেন বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের বাঁশের জিনিসপত্র।বাঁশের তৈরি জিনিসের মধ্যে রয়েছে ঝাঁকা, বসার মোড়া, মুরগি ঢাকা টোপা, গাছ ঘেরা খাঁচা/জাফরি, পাখা, ঢাকি, মাছ ধরা ডারকি, খোলই, মাছ মারা জাল।সবজি চাষের মধ্যে রয়েছে লালশাক, পুইশাক, সিম, ঢ়েড়স, বেগুন, পেঁয়াজ, রসুন, চাল কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, করলা, লাউ, ধুমা, তরই, বিন্নি মরিচ ছাড়াও আম, পেয়ারা, ডালিম, কাগজি লেবু, জাম, বরই ইত্যাদি ফলের গাছ। সন্তান ও সন্তানের স্ত্রীর সহযোগিতায় আব্দুল মতিন আপন মনে কাজ করে যাচ্ছেন। ৮৫ বছর বয়সেও তিনি সন্তানের সংসারে রেখেছেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদান!0

আব্দুল মতিন তাই তার পরিবারের কোন সদস্যের কাছেই বোঝা হিসেবে দাঁড়াননি! কারণ তিনি তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়েই সমাজ ও সংসারে অবদান রেখে চলেছেন। তার পরামর্শে তার সন্তান কৃষিকাজ করে সফল হয়েছেন। অন্যদিকে বসতভিটায় সবজি চাষের ক্ষেত্রে তিনি তার বউমার সহযোগিতা পান। পরস্পরের ভেতরে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সম্পর্ক স্থাপন করার মধ্য দিয়ে কেউ কারও বোঝা হিসেবে দাঁড়াননি। অন্যদিকে প্রবীণ পিতা ও শ্বশুরের প্রতি সন্তান ও বউমার শ্রদ্ধা আছে বলেই আব্দুল মতিন এই বয়সেও তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একজন মানব সম্পদ হিসেবে আর্বিভূত হতে পেরেছেন। সংসারের ভেতরে বিরাজ করা সুন্দর সম্পর্ক প্রতিবেশিদের মধ্যেও সহভাগিতার করেন আব্দুল মতিন। তাই তো তার চাষ করার সবজি তিনি পাড়াপ্রতিবেশিদের সাথে সহভাগিতা করেন। 02পরবর্তী মৌসুমে যাতে তিনি নির্বিঘ্নে সবজি চাষ করতে পারেন সেজন্য তার বউমা সবজির বীজগুলো সংরক্ষণ করে রাখেন। এ সম্পর্কে আব্দুল মতিন বিশ্বাসের বউমা সিমি আক্তার বলেন, “আমরা শুধু নিজে সবজি খাই না বাড়ির আশেপাশের প্রায় ২০ ঘরে সবজি ও সবজি বীজ এমনিই দিয়ে দেই, সবজির বীজ দেই যাতে তারাও বাড়ির হাতে তৈরি সবজি খেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেখাদেখি পাশের বাড়ির সেলিনা চাচী ও এবারে পুইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ঢেড়শের সবজির বাগান করেছে।” এই প্রসঙ্গে আব্দুল মতিন বলেন, “আমরা পরিবারের পরস্পরকে সহযোগিতা করি। আমার ছেলে ও ছেলের বউ আমার কাজকে গুরুত্ব দেয়। তারা আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। আমিও সাধ্য মতো চেষ্টা করি সংসারে কিছু করার জন্য।” তিনি যখন থাকবেন না তখন তার গ্রামে বাঁশ বেতের শিল্পের কাজ আর কেউ করবে না ভেবে ভেতরে তিনি খুব কষ্ট পান। তিনি বলেন, “এ গ্রামে কেউ বাঁশের তৈরি জিনিস বানাতে পারে না। আমি পারি বলেই তো মানুষ আমাকে চেনে, আমাকে শ্রদ্ধাও করে। কিন্তু কষ্ট হলো এখনকার ছেলেরা আর এগুলো শিখতে চায় না, তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহ নাই।”

উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিরা প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ তে প্রবীণদের এই সংজ্ঞায়ন মেনে চলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রবীণদের ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে স্বাস্থ্যহীনতা ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা। অতীতে প্রবীণরা যৌথ পরিবারের সকলের নিকট থেকে সেবা ও যত্ন পেতেন। 01পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানপ্রদর্শনের।কিন্তু বর্তমানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক নানা কারণে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে! যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় প্রবীণরা হারাচ্ছে তাদের প্রতি সহানুভূতি। দিনে দিনে প্রবীণদের প্রতি বাড়ছে অবহেলা, তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন! প্রবীণ আব্দুল মতিন বিশ্বাসের পরিবারের মতো সমাজে এখনও কিছু পরিবার রয়েছে যারা অতীতের পারিবারিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চর্চা ধরে রেখেছেন।

আমাদের সমাজের অন্যান্য পরিবারের প্রবীণরা যেখানে একক পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতায় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারছেনা অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে সেখানে আব্দুল মতিন বিশ্বাস এখনও একসাথে পরিবারের প্রধান হয়ে সুখ দুঃখের ভাগাভাগি করে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করছেন।পরিবারের যেই মানুষটি একদিন আমাদের সকলের চাহিদা মেটানোর গুরু দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাই আজ সেই মানুষটির দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, চর্চা, ভাললাগা, ইচ্ছার মূল্যায়ন করি তাহলে হয়তো এই অভিজ্ঞ মানুষটিই পরিবারের জন্য বোঝা না হয়ে সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

 

 

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.