সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রবীণরা নবীনদের বন্ধু

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষ জন্মগ্রহণের পর থেকে তাকে জীবনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আর এ ধাপ শৈশব, কৈশর, যুবক এবং পরবর্তীতে প্রবীণ হতে হয়। এটা প্রকৃতির বা সৃষ্টিকর্তার এক নিয়ম। পৃথিবীতে এমন কোন কিছু আবিষ্কার হয়নি যা দিয়ে তাকে প্রবীণ হওয়া আটকানো যাবে। আর প্রত্যেক মানুষ এ ধাপগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অবদান রেখে যায়। যেমন কোন শিশু জন্মেও পর তাকে বসা থেকে শুরু করে হামাগুড়ি, হাটাচলা, আদো আদো বুলি শেখা, খাওয়া, কোন কিছুর সাথে পরিচিতিকরণ, শিক্ষাদানসহ সমাজ ও রাস্ট্রের বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা রাখতে তাঁদের অবদান অগ্রগণ্য।

pic-1
সময়ের বিবর্তনে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রবীণদের অবদানকে তুচ্ছ মনে করি; এমনকি সেটা ভুলে যাই। যারা ছিল আমাদের পথ প্রদর্শক যাদের দেখানো পথেই আমাদের সব কিছু শুরু হয়। অথচ আমরা অনেকেই ভাবিনা তাদের সেই অবদানের কথা! এই প্রবীণ ব্যক্তিটি তো অন্য কেউ নয় তিনি আমার বাবা, মা, কাকা-কাকি, দাদা -দাদি বা আমার প্রতিবেশী, আমার আপনজন। তারা এখন সমাজ জীবনের এ ধাপ পার করতে করতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। না পারছেন ভালো খাবার খেতে, না পাচ্ছেন ভালো চিকিৎসা, ভালো বাসস্থান, ভালো ব্যবহারসহ সরকারি সুযোগ সুবিধা। তাদের মধ্যে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে দিনপাতি করছেন। কিন্তু তাঁদের অবদানের কথা ভেবে তাদেরকে শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা, তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

pic-2
বিগত সময়ে মাঠ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে একক বা দলীয় বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে প্রবীণদের উপরোক্ত সমস্যার কথা উঠে এসেছে। বারসিক দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষকে ও তাদের শক্তিকে জানার এবং সাথে আশেপাশের পরিবেশ, প্রকৃতির সাথে এবং পারস্পারিক সম্পর্ককে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে। সাথে বিভিন্ন ধরনে সমস্যা, সুযোগ ও সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বারসিক যেখানে সমাজের সকল শ্রেণী, পেশা ও বিভিন্ন বয়সের মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরির মানসিকতায় কাজ করছে সেখানে আমাদের প্রবীণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত।

সে লক্ষ্যে গত ৭ মার্চ শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নে জয়নগর গ্রামে জয়নগর কৃষি নারী সংগঠনের উদ্যোগে ও বারসিকের সহযোগিতায় নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিসহ পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ‘প্রবীণরা নবীনদের বন্ধু’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা ও গল্পের আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে জয়নগর গ্রামের কৃষক-কৃষাণী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭৬ জন অংশগ্রহণ করেন।

pic-3
অনুষ্ঠানে প্রবীণ কৃষক নুর আহম্মদ গাজীর সভাপতিত্বে ও বারসিক কর্মকর্তা বিশ^জিৎ মন্ডলের সঞ্চালনায় আলোচনায় সভা ও গল্পের আসরে অংশগ্রহণ করেন প্রবীণ ব্যক্তি মো. আমিনুর রহমান, আব্দুল গফুর, নুর আহম্মদ, লুৎফর রহমান ও নুর আলম মোড়ল। গল্পের আসরে এই ৫ প্রবীণ ব্যক্তি আগেকার দিনের পরিবেশ কেমন ছিল, এলাকাতে কিকি প্রাণসম্পদ ছিল, রাস্তাঘাটের অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের অবস্থা, খাদ্যের মান, চিকিৎসা পদ্ধতি, বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান কেমন ছিলো তা গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেন।

গল্পের আসরের পর আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন শিক্ষক নুরজাহান, প্রবীণ কৃষক নুর আহম্মদ, আব্দুল গফুর, উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলাম, শিক্ষার্থী আমিনা, মরিয়ম ও বারসিক কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ জোয়ারদার। বক্তরা বলেন, “এখন আর আগের মতো পরিবেশ নেই, এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি কিন্তু সে খাবার শুধু বেঁচে থাকার জন্য খাই। খাওয়ারে নেই কোন স্বাদ। আগে একবেলা খেয়ে তা হজম করার জন্য খেলাধুলা ও কাজ করতে হতো তা না হলে ক্ষুদা লাগতো না। আমাদের এখানে অনেকেই ছিল খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতা হতো আর এখন যেসব খাবার তা একবার মুখে দিলে আর খেতে মন চায় না। এখন মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত এমন কোন পরিবারে নেই যে পরিবারে অসুস্থ্য ব্যক্তি নেই।”

pic-4
আলোচনায় অপর এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, ‘এখন যুব সমাজে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে। আগে যেমন বিভিন্ন ধরনের গান বাজনাসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদন ছিল। এখন যুবরা মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাদের পারিপাশি^ক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা কমে যাচ্ছে। আর আমরা যারা প্রবীণ তারা তো বাদ পড়ার খাতে পড়েছি। ছেলে মেয়ে ও পরিবারের সাথে একসাথে তাল মিলিয়ে টিভি দেখতে, তাদের কোন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারি না। আমরা যে আমাদের সন্তানদের মানুষ করেছি কত কষ্ট করে এখনকার ছেলে ও ছেলের বৌরা তা মানতে চায় না। তাই তো এখন রাস্তায় বের হলে অনেক বৃদ্ধ ভিক্ষুক দেখা যায়। টিভি ও খবরের পাতা খুললে শুনতে পাই পিতা মাতার নির্যাতনের খবর। আর এ নির্যাতন শুধু অশিক্ষিত মানুষ নয় আমাদের শিক্ষিত ব্যক্তিরা এসব কাজ করেন। আমরা সন্তানদের যেমন শিক্ষা দেবো আমাদের সন্তারাও কিন্তু তেমন শিখবে তারা চোখে যা দেখবে তাই করবে। এটা আমাদের মনে রাখা উচিৎ।’

pic-5
অংশগ্রহণকারী নবীন শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের প্রবীণদেরকে শ্রদ্ধা করতে হবে। তাঁরা তো আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। আজকে আমরা তো আমাদের না জানা অনেক কিছু তাঁদের মুখ দিয়ে শুনতে পেলাম। তাঁরা যে গল্পগুলো বললেন তা যেন রূপকথার মতো মনে হয়েছে আমাদের কাছে। আমাদের চারপাশ সম্পর্কে আরো ভালো করে জানতে হলে তাঁদের খুবই দরকার। প্রবীণরা সত্যিকার অর্থেই আমাদের বন্ধু।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: