সাম্প্রতিক পোস্ট

মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত হলেই খুশি কৃষক ‘বাবা’

মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত হলেই খুশি কৃষক ‘বাবা’

সাতক্ষীরা থেকে বাহলুল করিম 

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী বৈকারী ইউনিয়নের মৃগীডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ১৯৬৭ সালে একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম তাঁর। ছিলেন পরিবারে দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। হতদরিদ্র পরিবারে নানা প্রতিকূলতার মাঝে বড় হয়েছেন। মাধ্যমিকের তিনটি পরীক্ষা দিতে পারলেও হঠাৎ মায়ের মৃত্যুতে বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এখানেই শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয় তাঁকে। সেখান থেকেই মৃগীডাঙ্গা গ্রামের মজিবর রহমান নিজ সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন।

পারিবারিক জীবনে একে একে পাঁচ মেয়ের বাবা হন। কৃষিই তার একমাত্র আয়ের উৎস। মেয়েরা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলো। বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করালেন। এরই মধ্যে হঠাৎ ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যা তাঁর বাড়িঘর ও ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বন্যার সময় পাশের গ্রামে সেজো ভাইয়ের বাড়িতে থেকে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। পানি নেমে যাওয়ার পরে সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করেন। পুনরায় গড়ে তোলেন থাকার ঘর।

বন্যার কারণে পড়াশোনার সাময়িক ক্ষতি হলেও বড় মেয়েকে আবার স্কুলে পাঠান। এমনিভাবেই মেয়েদের স্কুলে যেতে অনুপ্রেরণা যোগান তিনি। কখনো মেয়েদের পড়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেননি। বরং সবসময় উৎসাহ যুগিয়েছেন।

Pic- 1

নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মালেয়শিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য কিছুটা জমি বিক্রি করে দালালের দারস্থ হন। দালাল টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। আর বিদেশ যাওয়া হলো না তার।

এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। স্বপ্ন পূরণ করার জন্য দিনমজুরের কাজ করে মেয়েদের পড়ার খরচ নির্বাহ করেন। মেয়েদের নিয়মিত স্কুল ও গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠাতেন।

ফজরের নামাজ আদায় করে মাঠে যেতেন। দুপুরবেলা বাড়িতে এসে যোহরের নামাজ আদায় করে বাইসাইকেলযোগে বেরিয়ে পড়তেন মেয়েদের গৃহশিক্ষকের বাড়ির উদ্দেশ্যে। মেয়েদের বাড়িতে এনে সবাই একসাথে দুপুরের খাবার খেতেন। মেয়েদের পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘুমাতেন না। প্রতিদিন ফজরের আযান দিলেই মেয়েদের পড়ার জন্য ঘুম থেকে ডেকে দিতেন।

তার বড় মেয়ে রেশমা খাতুন মানবিক বিভাগ থেকে ২০০৯ সালে মাধ্যমিক ও ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গ্রাম থেকে সাতক্ষীরা শহরে আসে। পড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালায় সে। এতে একটু স্বস্তির নিঃস্বাস নেন তার বাবা। বড় মেয়ে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে ২০১৫ সালে অনার্স শেষ করে বর্তমানে মাস্টার্স অধ্যয়নরত।

মেঝ মেয়ে ইয়াসমিন আরা ২০১১ সালে বি.কে. ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৮৮ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। সেজ মেয়ে শারমিন নাহার ২০১৪ সালে একই বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৭৫ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তারা দুইজন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৪.৮০ ও জিপিএ-৪.৮৪ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়। বর্তমানে দুইজনই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। অপর দুই মেয়ে সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

নিজে উচ্চ শিক্ষিত হতে পারেননি তাই মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার সহধর্মিনী সব সময় তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। চতুর্থ ও পঞ্চম মেয়েও ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে- এটাই তার প্রত্যাশা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: