সাম্প্রতিক পোস্ট

কম পানিনির্ভর শস্য-ফসল আবাদ করে পানি সঙ্কট মোকাবেলা করছেন বরেন্দা গ্রামের কৃষকরা

রাজশাহী থেকে অমিত সরকার

পানি সংকট নিয়ে কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যেমে প্রকাশিত হচ্ছে নানান সংবাদ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনও নানান সভা, সেমিনারও আয়োজন করছে পানি সঙ্কট নিরসনের উপায় বের করার জন্য। আবার অনেকেই বিস্তর গবেষণা করেছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সঙ্কটের নেপথ্য কারণ জানার জন্য, পানি সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান বের করার জন্য! কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের এ পানি সঙ্কট এখনও রয়েছে এবং দিনকে দিন তীব্র আকার ধারণ করছে! বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো কোনো জায়গায় পানির এমনই সঙ্কট হয়েছে যে, প্রকৃতির দান এই পানিকে মানুষ নগদ টাকায় কিনতে বাধ্য হচেছন! রাজশাহীর তানোর উপজেলার ঝিনাইখোর গ্রামের মানুষ প্রতি কলস পানি পাঁচ টাকা দরে ক্রয় করছেন (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২ মার্চ ২০১৬)। দৈনিক চাঁপাইচিত্র ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, “খাবার পানির চরম সংকটে পড়তে যাচ্ছে বরেন্দ্রর ৩ পৌরসভা ও ১৫ ইউনিয়ন”! এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় বরেন্দ্র অঞ্চলের তিনটি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নকে অতি ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ পানি সঙ্কটের কারণে শস্য-ফসল উৎপাদনেও বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের। পানি সঙ্কটের কারণে অনেকের জমি যেমন অনাবাদী থেকেছে তেমনিভাবে ধানসহ অন্যান্য পানিনির্ভর শস্য-ফসল আবাদে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে!
water-1বরেন্দ্র মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। হাজারো বছর ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা ধানসহ বিভিন্ন শস্য, ফসল উদ্ভাবন করেছেন যা চাষ করতে খুব কম পানি লাগে। কিন্তু ‘আধুনিক কৃষির’ প্রচলনে বরেন্দ্র এলাকা আজ সেসব কম পানির শস্য, ফসলের জাত হারিয়ে ফেলেছে। এই প্রসঙ্গে বরেন্দা গ্রামের কৃষাণী আমিরুণ বেওয়া (৭৫) বলেন, “আগের কোদা, ভূট্টা, গম আর ধানগুলি নাই। এখন পানি ছাড়া ধান হয় না, সার-বিষ ছাড়া কিছুই হয় না।” বস্তুত, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট কিন্তু নতুন কোন ইস্যু নয়। বরেন্দা গ্রামের প্রবীণ কৃষক মো. মুনসুর আলী (৬৫) বলেন, “এক যুগেরও আগে থেকে এ সংকট চলে আসছে এবং সমাধানের জন্য বারবারই বিকল্প পথ বা উপায়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন সমাধান হয়নি!” তবে পানি সঙ্কট সমাধানের জন্য মুনসুর আলীরা সরকার বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকেননি। নিজেরাই নিজেদের চেষ্টায় খুঁজেছেন পানি সংকটের সমাধান। নিজেদের চেষ্টায় আবারো সেই বরেন্দ্র উপযোগী আবাদের ধারা ফিরিয়ে আনবার পরিশ্রম করছেন। উদ্যোগী হয়েছেন এলাকা উপযোগী এবং কম পানি নির্ভর শস্য-ফসল সন্ধানের জন্য জাত গবেষণা করার! তাদের এই উদ্যোগের সাথে সাথী হয়েছে বারসিক।

সনটি ২০১২। চারদিকে তীব্র শীত। বোরো মৌসুম আসন্ন। পানিহীন বরেন্দা গ্রামের মানুষেরা গ্রামের সূতিহার দীঘির পাড়ে সভা ডাকলেন। পানিনির্ভর বোরো মৌসুমে উফশী ধান চাষের পরিবর্তে কম পানিনির্ভর শস্য, ফসল চাষের সিদ্ধান্ত নিলেন। আর সেখান থেকেই বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সুরক্ষার এক গ্রামীণ উদ্যোগের সূচনা হয়। এতে সফলতাও পেয়েছেন সেই এলাকার কৃষকরা। সেই সফলতার উদাহরণ দিয়ে বারসিকের সমন্বয়ে নাচোল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএমডিএর উদ্যোগে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক শস্য, ফসল চাষে কৃষকদের নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ সভাও আয়োজিত হয়। যার ফলে নাচোল উপজেলায় এখন ধান ফসলের পরিবর্তে শস্য, ফসলের চাষ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কিছুটা কমেছে বরেন্দায়। বরেন্দার এই উদাহরণ পুরো বরেন্দ্রভূমির জন্য আর্শীবাদ হিসেবে দেখা দিতে পারে; বিশেষ করে শস্য-ফসল উৎপাদনে। কেননা পানি সঙ্কট তীব্রতার কারণে কৃষি শস্য-ফসল উৎপাদনে কৃষকরা সমস্যাগ্রস্ত!

বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়েই কম পানি নির্ভর শস্য-ফমল আবাদে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বরেন্দা গ্রামের জনসংগঠনের সভাপ্রতি মো. আব্দুল কাদের বলেন, “আমরা আমাদের গ্রামে পানি নির্ভর ধান ফসল বাদ দিয়ে কম পানি লাগে এমন শস্য, ফসল চাষ করছি। এতে করে আমরা লাভবান হয়েছি। তবে এই উদ্যোগ শুধু একটি গ্রাম বা শুধু নাচোল উপজেলায় নিলে হবে না। বরেন্দ্র অঞ্চলের সকল এলাকায় এটি বিস্তার ঘটাতে হবে। এই জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কৃষকদের জন্য বরেন্দ্র উপযোগী শস্য, ফসলের বীজসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা দিতে হবে। ”

বরেন্দা গ্রামের কৃষকদের এই চলমান গবেষণায় দেখা গেছে, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে যেখানে ১০ থেকে ১২টি সেচের প্রয়োজন হয় সেখানে কম পানিনির্ভর শস্য, ফসলের ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে ২টি সেচই যথেষ্ট। গবেষকদের তথ্য মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্তমানে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১১০ ফুট নিচে অবস্থান করছে। এ অঞ্চলে সমতল থেকে ১৩০ ফুট নিচে যে পাথর অবস্থান করছে সেখান থেকে মাত্র ১৫ ফুট উপরে পানির স্তর অবস্থান করছে। সুতরাং ভূ-গর্ভস্থের পানির ওপর চাপ কমানোর জন্য কম পানি লাগে এমন শস্য, ফসল আবাদ করা যেমন জরুরি তেমনি জরুরি পানির প্রাকৃতিক জলাধারগুলো তথা নদী, খাল-খাড়ি, নালা, বিল, পুকুরসহ সকল সংরক্ষণ ও রক্ষা করার। এছাড়া পানির অপচয়রোধে প্রত্যেকেই সচেতন হতে হবে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: